প্রভাত ডেস্ক: দুই দিন আগে স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় হাজার হাজার অভিবাসীর আকস্মিক ঢল নামে। এ ঘটনার পর দেশটির সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নিয়ে ইউরোপজুড়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মরক্কো ও সেউতার মধ্যবর্তী স্থানে সাগরে ভাসমান প্রতিবন্ধক (ফ্লোটিং ব্যারিয়ার) স্থাপন করা হচ্ছে বলে শনিবার জানিয়েছে স্পেনের কর্তৃপক্ষ।
উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের ছিটমহল হিসেবে পরিচিত সেউতা থেকে অধিকাংশ অভিবাসীকে মরক্কোয় ফেরত পাঠানোর পর স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ঘোষণা দিল। তবে যাঁরা এখনো সেউতায় রয়ে গেছেন এবং পুলিশ ও স্থানীয় ক্ষুব্ধ জনতার চোখ ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছেন, তাঁদের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় মরক্কো থেকে আনুমানিক ৫০–৬০ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী সেউতায় প্রবেশ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৪৮ হাজার ৩০০ জনকে গত শুক্রবার শেষ বিকেলের মধ্যে মরক্কোতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া আরও শত শত অভিবাসী সারা রাত ধরে ছিটমহলটি ছেড়ে চলে যান।
সেউতায় নিযুক্ত স্পেন সরকারের একজন গণমাধ্যম কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে শহরটিতে প্রবেশের চেষ্টা করার সময় অন্তত ৬৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
সেউতার এ সংকটের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ২০টির বেশি সদস্যদেশ ইউরোপীয় কমিশনের কাছে চিঠি দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের জরুরি বৈঠক আহ্বানের দাবি জানায়। একই সময় স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও কমিশনকে একটি চিঠি পাঠান। সেখানে তিনি তাঁর সরকারের অভিবাসন নীতির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন এবং স্পেনকে শেনজেন অঞ্চলের মুক্ত চলাচল ব্যবস্থার বাইরে রাখার আহ্বান জানানো ব্যক্তিদের ‘স্বার্থপর’ বলে আখ্যায়িত করেন।
সেউতায় প্রবেশ করা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বেশির ভাগই ছিলেন কাজের সন্ধানে আসা তরুণ মরক্কোর নাগরিক। গতকাল শহরটির উত্তর-পশ্চিমের একটি সৈকতে আফ্রিকার অন্য দেশ থেকে আসা কয়েক শ অভিবাসীকে বিশ্রাম নিতে দেখা যায়। এসব অভিবাসীর অনেকে বলেন, তাঁরা অন্য দেশের নাগরিক হওয়ায় স্পেন তাঁদের মরক্কোয় ফেরত পাঠাতে পারবে না বলে তাঁরা বিশ্বাস করেন। তাঁদের আরও দাবি, বৃহস্পতিবারের পর থেকে তাঁরা কিছু খাননি।
সেউতায় আসা ২৪ বছর বয়সী কামাল ওমর বলেন, ২০২৩ সালে গৃহযুদ্ধের কারণে তিনি সুদান ছেড়েছিলেন। গত বছর মরক্কোতে পৌঁছান। বলেন, ‘আমি মরক্কোতে ফিরতে চাই না। দয়া করে আমাদের সুরক্ষা দিন।’
এ পর্যন্ত স্পেন সরকার মূলত মরক্কোর সঙ্গে সেউতার সীমান্ত আরও শক্তিশালী করার দিকেই নজর দিয়েছে। শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী সানচেজ বলেন, সমুদ্রে ভাসমান বয়া বসিয়ে সীমান্তে অন্তত দৃশ্যমান একটি প্রতিবন্ধক তৈরি করা হবে।
সানচেজ বলেন, নতুন এ বয়া স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক এক রায়ের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। তাঁর মতে, ওই রায়ই এ সপ্তাহে অভিবাসীদের ঢলের একটি কারণ হয়ে থাকতে পারে।
সানচেজের অভিযোগ, মানব পাচারকারীরা ওই রায়ের ভুল ব্যাখ্যা ছড়িয়েছে। রায়ে বলা হয়েছিল, সমুদ্রে আটক হওয়া অভিবাসীরা যদি স্পেনের ভূখণ্ডে পৌঁছাতে গিয়ে কোনো সীমান্তপ্রতিবন্ধক অতিক্রম না করে থাকেন, তবে তাঁদের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নতুন কাঠামোটি ৫০০ মিটার (প্রায় ১ হাজার ৬০০ ফুট) দীর্ঘ এবং স্ফীত করা যায় এমন একটি ভাসমান প্রতিবন্ধক। এটি পানির নিচে সর্বোচ্চ এক মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে। এর বাইরে স্পেনের নৌবাহিনী নোঙর করা বয়ার আরেকটি সারি বসিয়ে এ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করবে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের শরণার্থী ও অভিবাসী অধিকারবিষয়ক বিভাগের কর্মকর্তা জুডিথ সান্ডারল্যান্ড বলেন, স্পেনের এ পরিকল্পনা ‘উদ্বেগের কারণ তৈরি করছে’। সান্ডারল্যান্ড বলেন, ‘প্রতিবন্ধকটি সাঁতরে ঘুরে যাওয়ার চেষ্টা করলে কর্তৃপক্ষ কীভাবে লোকজনকে থামাবে, তা কল্পনা করা কঠিন।’ তিনি ২০১৪ সালের একটি ঘটনার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। তখন সেউতায় সমুদ্রপথে পৌঁছানোর চেষ্টা করা একদল অভিবাসীর দিকে স্পেনের সিভিল গার্ড রাবারের গুলি ছুড়েছিল। সে ঘটনায় অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়।