………নজরুল ইসলাম……………

শিক্ষক জাতির বিবেক, সমাজ নির্মাণের কারিগর। একটি প্রজন্মকে জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিকতার আলোয় আলোকিত করার দায়িত্ব যাঁদের কাঁধে, কর্মজীবনের শেষপ্রান্তে এসে তাঁদের যদি প্রাপ্য বেসরকারি শিক্ষকদের অবসরভাতা ও অন্যান্য সুবিধার জন্য দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হয়, তাহলে তা শুধু দুর্ভাগ্যজনক নয়, প্রশাসনিক ব্যবস্থারও একটি বড় দুর্বলতার প্রকাশ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, অবসর ভাতার জন্য শিক্ষকদের আর অফিসে-অফিসে ঘুরতে হবে না—এই ঘোষণা তাই নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক ও সময়োপযোগী।

একজন শিক্ষক তাঁর কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় শিক্ষার্থীদের পেছনে ব্যয় করেন। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠন, সামাজিক মূল্যবোধ সৃষ্টি এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তাঁরা। অথচ চাকরিজীবন শেষে যখন তাঁদের নিজের প্রাপ্য অর্থ ও অবসরকালীন সুবিধা পাওয়ার জন্য বিভিন্ন দপ্তরের দ্বারে দ্বারে যেতে হয়, তখন সেই ব্যবস্থার মানবিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অবসরপ্রাপ্ত একজন শিক্ষককে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করানো তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য তৎকালিন বিএন পি সরকার বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দানের লক্ষ্যে ২০০৫ সনে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০৫ এর ৩ ধারা এর আলোকে এ কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
তাই বর্তমান বিএনপি সরকারের কাছে বেসরকারি শিক্ষক দের প্রত্যাশা একটুবেশী।
প্রশাসনিক জটিলতা, কাগজপত্রের দীর্ঘসূত্রতা, এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ফাইল স্থানান্তর, প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ এবং অনুমোদনের নানা ধাপ—সব মিলিয়ে অবসরভাতা প্রাপ্তির প্রক্রিয়া অনেক সময় শিক্ষকদের জন্য দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে প্রবীণ ও শারীরিকভাবে দুর্বল শিক্ষকদের পক্ষে বারবার দূরের অফিসে যাতায়াত করা অত্যন্ত কষ্টকর। এতে শুধু সময় ও অর্থের অপচয় হয় না, তাঁদের মানসিক ভোগান্তিও বাড়ে।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার মূল তাৎপর্য এখানেই—সেবা পেতে নাগরিককে নয়, বরং সেবাকেই নাগরিকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এটাই সুশাসনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন, অনলাইন আবেদন, ডিজিটাল নথি ব্যবস্থাপনা এবং আন্তঃদপ্তর সমন্বয়ের মাধ্যমে অবসরভাতা প্রদানের প্রক্রিয়া সহজ করা সম্ভব। একজন শিক্ষক অবসরে যাওয়ার আগেই তাঁর প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি যাচাই সম্পন্ন করে অবসর-পরবর্তী সুবিধা নির্ধারিত সময়ে নিশ্চিত করা গেলে ভোগান্তির বড় অংশই দূর হবে।

ঘোষণার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। কোন দপ্তরের কী দায়িত্ব, কত দিনের মধ্যে কোন কাজ সম্পন্ন হবে এবং কোনো পর্যায়ে বিলম্ব হলে তার জবাবদিহি কী—এসব বিষয় সুস্পষ্ট করতে হবে। একই সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।

২০২৬ সালের আগস্ট মাসে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের বকেয়া পরিশোধের আওতায় মোট ১,২৩,০০০ জন (১ লাখ ২৩ হাজার) সুবিধাভোগী অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে অবসর সুবিধা বোর্ডের অধীনে ৭০,১৯৯ জন এবং কল্যাণ ট্রাস্টের অধীনে ৫৩,৪৭৭ জন শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছে বলে, ইন্টারনেট ঘেটে জানা গেছে।

একজন শিক্ষক যখন অবসরে যান, তখন তিনি শুধু একটি চাকরি থেকে অবসর নেন; কিন্তু সমাজের প্রতি তাঁর অবদান কখনো অবসর নেয় না। তাই তাঁদের প্রাপ্য সম্মান, আর্থিক নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। শিক্ষকদের অবসরকাল যেন হয় স্বস্তির, মর্যাদার ও নিরাপদ—এটাই সময়ের প্রত্যাশা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই মহান ঘোষণার দ্রুত বাস্তবায়ন হলে তা শিক্ষক সমাজের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি লাঘবের পাশাপাশি প্রশাসনিক সংস্কারেরও একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। শিক্ষককে সম্মান দেখানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় শুধু বক্তব্যে নয়, তাঁর প্রাপ্য অধিকার সময়মতো নিশ্চিত করা। অবসর ভাতার জন্য শিক্ষকদের আর যেন কোনো অফিসের দরজায় দাঁড়াতে না হয়—এই প্রত্যাশা, শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার সকল কারিগরদের।

লেখকঃ – গণমাধ্যমকর্মী ও সমাজমনস্ক
nazrulnews1970@gmail.com

(এই বিভাগের প্রতিটি লেখা লেখকের বাক স্বাধীনতার প্রতিফলন। এ লেখার দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব। এর জন্য পত্রিকা কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়। )