ইসলাম ডেস্ক: মিসরের অত্যাচারী শাসক ফেরাউন একটি ভবিষ্যৎবাণী শুনে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল—তার সিংহাসন নাকি বনি ইসরাইলের এক পুত্রসন্তানের হাতে ধ্বংস হবে। এই আশঙ্কায় সে রাজকীয় বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিল যেন বনি ইসরাইল পরিবারে জন্ম নেওয়া প্রতিটি সদ্যজাত ছেলেকে হত্যা করা হয়।
এমন এক আতঙ্কজনক পরিবেশে মুসা (আ.) জন্মগ্রহণ করলেন। তাঁর মা নবজাতককে নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছিলেন। চতুর্দিকে যখন মৃত্যুর পদধ্বনি, রক্ষা পাওয়ার আপাত কোনো উপায়ই চোখ পড়ে না, ঠিক তখনই করুণাময় আল্লাহ তাঁর অসহায় মায়ের পাশে এসে দাঁড়ালেন।
আল্লাহ–তাআলা তাঁর মাকে এক অদ্ভুত ও অকল্পনীয় নির্দেশ দিলেন, মানববুদ্ধি দিয়ে যা চিন্তা করাও কঠিন।
কোরআনে আল্লাহ সেই ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, “আমি মুসার মায়ের হৃদয়ে নির্দেশ পাঠালাম যে তুমি তাকে দুধ পান করাও; অতঃপর যখন তুমি তার নিরাপত্তার ব্যাপারে আশঙ্কাবোধ করবে, তখন তাকে নদীতে (নীলনদে) ভাসিয়ে দাও। তুমি ভয় পেয়ো না এবং শোকাচ্ছন্নও হয়ো না; নিশ্চয়ই আমি তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে রাসুলদের অন্তর্ভুক্ত করব।” (সুরা কাসাস, আয়াত: ৭)
সদ্যজাত নরম তুলতুলে সন্তানকে একটি কাঠের সিন্দুকে পুরে উন্মুক্ত নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া কি সহজ কথা? লোকচক্ষুর অন্তরালে সন্তানকে নিজের ঘরে লুকিয়ে রাখাটাই তো যুক্তিযুক্ত মনে হয়। কিন্তু সেই মা পার্থিব যুক্তি বা নিজের শক্তির ওপর ভরসা না করে স্বয়ং আল্লাহর বাণীর ওপর শতভাগ আস্থা রাখলেন।
আল্লাহর প্রতিশ্রতি যেমন সত্য, তেমনি তাঁর কৌশলও প্রজ্ঞাপূর্ণ। নদীর স্রোত সেই কাঠের সিন্দুককে ভাসিয়ে নিয়ে গেল ঠিক ফেরাউনের প্রাসাদের ঘাটে। যে শত্রু শিশুকে হত্যা করতে সারা রাজ্যে রক্তপাত চালাচ্ছিলেন, আল্লাহ সেই শত্রুর হাতেই শিশুকে তুলে দিলেন, তবে এক অলৌকিক উপায়ে।
কোরআনে বলা হয়েছে, “ফেরাউনের পরিবার তাকে কুড়িয়ে নিল, যেন সে পরে তাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হয়। নিশ্চয়ই ফেরাউন, হামান ও তাদের বাহিনী ছিল চরম অপরাধী।
ফেরাউনের স্ত্রী বলল, ‘এ শিশু আমার ও তোমার চোখের শীতলতা; তাকে মেরো না। হতে পারে সে আমাদের উপকারে আসবে কিংবা আমরা তাকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করতে পারি।’ আসলে তারা পরিণাম বুঝতে পারেনি।” (সুরা কাসাস, আয়াত: ৮-৯)
পবিত্র কোরআনে এই বিস্ময়কর ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ বলেন, “যখন আমি তোমার মায়ের অন্তরে নির্দেশ পাঠালাম যে তুমি তাকে সিন্দুকে রাখো, অতঃপর তা নদীতে ভাসিয়ে দাও, নদীর তরঙ্গ তাকে তীরে নিক্ষেপ করবে; তাকে কুড়িয়ে নেবে এমন একজন, যে আমারও শত্রু এবং তারও শত্রু।” (সুরা তহা, আয়াত: ৩৮-৩৯)
এর চেয়ে বড় শিক্ষা আর কী হতে পারে? যে ফেরাউন পুরো মিশর চষে বেড়িয়েছে একটি শিশুকে মারার জন্য, নিজের রাজপ্রাসাদেই সেই শিশুকে পরম স্নেহে লালন-পালন করার ব্যবস্থা করে দেন আল্লাহ।
নবী মুসার স্নেহময়ী মা যদি শুধু নিজের বুদ্ধি, ঘরের চার দেয়াল বা জাগতিক সুরক্ষার ওপর ভরসা করতেন, তবে সৈন্যরা শিশুকে একদিন খুঁজে পেয়ে ঠিকই হত্যা করত। কিন্তু তিনি নিজের বুদ্ধি ও শঙ্কাকে প্রতিপালকের কাছে সমর্পণ করে আল্লাহ–ভরসার পথ বেছে নিয়েছিলেন। আর আল্লাহ কখনো তাঁর ওয়াদা খেলাফ করেন না। তিনি দুধপানের মাধ্যমে অলৌকিক উপায়ে আবার সেই শিশুকে তাঁর গর্ভধারিণী মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিলেন।
কোরআনে এসেছে, “এভাবেই আমি তাকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিলাম, যাতে তার মায়ের চোখ জুড়ায়, সে যেন শোকাচ্ছন্ন না হয় এবং সে যেন জানতে পারে যে আল্লাহর ওয়াদা সত্য; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।” (সুরা কাসাস, আয়াত: ১৩)
ইসলামি জীবনদর্শনে ‘তাওয়াক্কুল’ মানে হাত-পা গুটিয়ে অলস বসে থাকা নয়; বরং সাধ্যমতো চেষ্টা করার পর ফলাফলের জন্য পুরোপুরি আল্লাহর ওপর নির্ভর করা।
মহানবী (সা.) বলেছেন, “তোমরা যদি আল্লাহর ওপর প্রকৃত ভরসা করতে পারতে, তবে তিনি পাখিদের মতো তোমাদের রিজিক দান করতেন—যারা সকালে খালি পেটে বের হয় আর সন্ধ্যায় পেট ভরে নীড়ে ফেরে।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৪)