প্রভাত রিপোর্ট: দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারও শক্ত অবস্থানে পৌঁছাতে শুরু করেছে। দীর্ঘ সময়ের চাপ ও অনিশ্চয়তার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (৭ মে) পর্যন্ত দেশের মোট বা গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার। আর আইএমএফের নির্ধারিত বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দেশের রিজার্ভ এখন ৩১ বিলিয়ন ডলারের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, রফতানি আয় স্থিতিশীল থাকা এবং আমদানি ব্যয়ে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আসার কারণে রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এর ফলে বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপ কমছে এবং ডলারের বাজারেও ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, প্রবাসী আয় বর্তমানে রিজার্ভ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহও বেড়েছে। একইসঙ্গে রফতানি আয়ও ইতিবাচক ধারায় রয়েছে।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের রফতানি প্রবৃদ্ধি, প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ এবং বৈদেশিক ঋণ ও উন্নয়ন সহযোগিতার অর্থ ছাড় পাওয়ার কারণে রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অন্যদিকে, অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসপণ্যের আমদানি কমে যাওয়ায় ডলারের ওপর চাপও আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাজারে অতিরিক্ত ডলার বিক্রি করতে হচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, রিজার্ভ বাড়ার অর্থ হলো দেশের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা শক্তিশালী হওয়া। বর্তমানে যে পরিমাণ রিজার্ভ রয়েছে, তা দিয়ে কয়েক মাসের আমদানি ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হবে। রিজার্ভ শক্তিশালী থাকলে আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থা ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও ইতিবাচক বার্তা যায়। এতে বৈদেশিক লেনদেনে আস্থা বাড়ে এবং দেশের ক্রেডিট সক্ষমতাও উন্নত হয়।
এছাড়া রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতির ফলে ডলারের বাজারে অস্থিরতা কমতে পারে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। কারণ ডলারের দাম বেড়ে গেলে আমদানিনির্ভর পণ্যের দামও বাড়ে। এখন রিজার্ভ বাড়ার কারণে সেই চাপ কিছুটা কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
২০২১ সালে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, উচ্চ আমদানি ব্যয় এবং ডলারের অস্বাভাবিক চাহিদার কারণে পরবর্তী সময়ে রিজার্ভ দ্রুত কমতে থাকে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে ডলার বিক্রি করে বাজার স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করে। একইসঙ্গে আমদানি নিয়ন্ত্রণ, বৈধ পথে রেমিট্যান্স বাড়ানো এবং বৈদেশিক ঋণ সহায়তা নিশ্চিত করার নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে সেই পদক্ষেপগুলোর ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণত দুটি ধরনের রিজার্ভ হিসাব প্রকাশ করে। গ্রস রিজার্ভ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট বৈদেশিক মুদ্রা ও সম্পদের হিসাব। এতে বিভিন্ন তহবিল ও স্বল্পমেয়াদি দায়ও অন্তর্ভুক্ত থাকে। অন্যদিকে, বিপিএম-৬ রিজার্ভ হচ্ছে আইএমএফের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ। এতে এমন অর্থ বাদ দেওয়া হয়, যা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব নয়।
বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে বিপিএম-৬ হিসাবকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেই হিসাবে বাংলাদেশের রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছানোকে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

রিজার্ভ কীসের ভিত্তিতে নির্ধারণ করে আইএমএফ

য়ই আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে “গ্রস রিজার্ভ” ও “বিপিএম৬ রিজার্ভ”— এই দুই ধরনের হিসাব সামনে আসার পর অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল- আইএমএফ আসলে কোন ভিত্তিতে একটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হিসাব করে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আইএমএফ শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে কত ডলার আছে, সেটি দেখে রিজার্ভ নির্ধারণ করে না। বরং সেই অর্থের কতটা বাস্তবে ব্যবহার করা যাবে, আন্তর্জাতিক লেনদেন বা সংকটের সময় কত দ্রুত কাজে লাগানো সম্ভব— এসব বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেয় সংস্থাটি।এ জন্য আইএমএফ একটি আন্তর্জাতিক হিসাব পদ্ধতি অনুসরণ করে, যাকে বলা হয় বিপিএম৬ (ব্যালেন্স অব পেমেন্টস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল পজিশিন ম্যানুয়াল, সিক্স এডিশন)।
আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, একটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে মূলত এমন সম্পদ রাখা হয়, যেগুলো প্রয়োজন হলে দ্রুত ব্যবহার করা সম্ভব। এর মধ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে থাকা ডলার, ইউরো, পাউন্ড, ইয়েনসহ বিভিন্ন বৈদেশিক মুদ্রা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বা ঋণ পরিশোধে যেসব অর্থ দ্রুত ব্যবহার করা যায়, সেগুলোই রিজার্ভ হিসেবে ধরা হয়। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণের মজুতও রিজার্ভের অংশ। কারণ প্রয়োজনে এই স্বর্ণ বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করা যায়।
আইএমএফ সদস্য দেশগুলোকে যে বিশেষ সংরক্ষণ সম্পদ দেয়, যাকে এসডিআর বলা হয়, সেটিও রিজার্ভের মধ্যে গণনা করা হয়। পাশাপাশি আইএমএফে কোনও দেশের সংরক্ষিত আর্থিক অংশ বা রিজার্ভ পজিশনও এতে যোগ হয়।
আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে সব ধরনের ডলার রিজার্ভ হিসেবে ধরা হয় না। যেসব অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে থাকলেও তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করা যায় না, সেগুলো বাদ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রফতানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে দেওয়া ঋণ, ব্যাংকগুলোকে দেওয়া ডলার সহায়তা, আমদানি দায়ের বিপরীতে আটকে থাকা অর্থ কিংবা বিভিন্ন শর্তযুক্ত বৈদেশিক অর্থ বিপিএম৬ হিসাব থেকে বাদ পড়ে। এ কারণেই “গ্রস রিজার্ভ” ও “বিপিএম৬ রিজার্ভ”-এর মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু বড় অঙ্কের রিজার্ভ থাকলেই হবে না, সেই অর্থ সংকটের সময় ব্যবহার করা যায় কিনা সেটিই আসল বিষয়। কারণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিয়ে একটি দেশকে আমদানি ব্যয় মেটাতে হয়, বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা ধরে রাখতে হয়। আইএমএফ মনে করে, ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের পরিমাণই একটি দেশের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতার প্রতিফলন।
বাংলাদেশ আগে মূলত “গ্রস রিজার্ভ” প্রকাশ করতো। তবে আইএমএফের ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার পর বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ হিসাব প্রকাশ শুরু হয়।ফলে এখন বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণত দুটি তথ্য প্রকাশ করে—একটি মোট বা গ্রস রিজার্ভ, অন্যটি আইএমএফের মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্য বিপিএম৬ রিজার্ভ।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (৭ মে) দেশের গ্রস রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি হলেও বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ প্রায় ৩১ বিলিয়ন ডলারের মতো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পার্থক্যই বোঝায়— বর্তমানে শুধু কত ডলার আছে, সেটি নয়, বরং সেই ডলার কতটা ব্যবহারযোগ্য, সেটিই আন্তর্জাতিকভাবে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।