প্রভাত স্পোর্টস: জ্যৈষ্ঠের রোদে সবাই হাঁসফাঁস। এর মধ্যে বোরকা পরে মধ্যবয়সী এক নারী জাতীয় স্টেডিয়ামে গ্যালারিতে এক শিশুকে নিয়ে বসে আছেন। তিনি নিশি খাতুনের মা, মাঠে সাইক্লিং করছেন তার মেয়ে।
এক দশক ধরে নিশি জাতীয় সাইক্লিংয়ে অংশগ্রহণ করছেন। বিগত সময়ে একাধিক স্বর্ণ জিতেছেন। দেড় বছর আগে মা হয়েছেন। চার মাস পর সাইক্লিংয়ে ফিরলেও স্বর্ণ পুনরুদ্ধার করতে পারেননি। এবার অবশ্য দুটি স্বর্ণ জেতেছেন। এই স্বর্ণ জয়ের পেছনে কার অবদান রয়েছে, কে তার অনুপ্রেরণা! নিশি বলেন, ‘আমরা বাচ্চা আমার অনুপ্রেরণা। ওর জন্য স্বর্ণ জিততে চেয়েছি। আর এই সাফল্যের পেছনে মায়ের অবদান অনেক। কারণ খেলার জন্য মা বাচ্চাকে দেখাশোনা করে। মাঠেও আসে।’
মেয়ের সাফল্যে খুশি রেনোয়ারা খাতুন। গতকাল জাতীয় স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে বলছিলেন, ‘নিশির বাবা খেলাধূলা খুব পছন্দ করে। বাড়িতে তার অনেক কষ্ট হয় আমি খেলার জন্য বাইরে গেলে। এরপরও সে মেয়ে ও নাতনির জন্য অনেক কষ্ট করে। মেয়ের সফলতাই আমার কষ্টের সার্থকতা।’
খেলাধূলা মূলত তারুণ্য নির্ভর। বাবা-মায়েরা সেভাবে মাঠে আসেন না। পুরো স্টেডিয়ামে এত তরুণ-তরুণীর মধ্যে রেনোয়ারা খাতুনকে কাল একমাত্র অভিভাবক হিসেবে দেখা গেল। এ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের বাড়ি জামালপুর। মেয়ের খেলার জন্য গত বছর চট্টগ্রামে গিয়েছিলাম জাতীয় সাইক্লিংয়ের সময়। এবার ঢাকায় আসলাম। অন্য জায়গার চেয়ে স্টেডিয়ামের পরিবেশ ও উন্মাদনা ভিন্ন। সাইকেলের গতিতে উত্তেজনা থাকে, তবে আমার তো নাতনিকে নিয়েই থাকতে হয়।’
নিশি এখন নিজেই মা। সন্তান ও সাইক্লিং সামলানো নিয়ে বলেন, ‘ইবনাত (মেয়ে) যখন গর্ভে তখনও সাইক্লিং করেছি। সিজার হওয়ায় ইবনাত হওয়ার চার মাস পর আবার সাইকেল ধরেছি। শরীরের ওপর তো ধকল একটু যেতই, এরপরও নিজের পারফরম্যান্স ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। মেয়ে কোলে নেওয়ার পর ক্লান্তি দূর হতো। এবারের প্রথম স্বর্ণটি সন্তানকে উৎসর্গ করছি।’
অল্প বয়সী সন্তানকে নিয়ে মাঠে আসতে অনেক বাবারই বারণ থাকে। আবার মায়েরও এত সহসাই মাঠে আসার অনুমতি মেলে না। তাই নিশি তার স্বামীকেও ধন্যবাদ দিলেন, ‘আমার স্বামী একজন কলেজ শিক্ষক। সে আমাকে যথেষ্ট সহায়তা করে। তার উৎসাহেই আমি মাঠে দ্রুত ফিরতে পেরেছি এবং মেয়েকে নিয়েও সাইক্লিং করে যাচ্ছি।’
বিশ্বের অনেক দেশে সাইক্লিং বেশ জনপ্রিয় ও আকর্ষণীয় খেলা। বাংলাদেশে এই খেলাটি দীর্ঘদিন ধরেই ধুঁকছে। সাইক্লিংয়ের জন্য প্রয়োজন ভেলোড্রাম। যা বাংলাদেশে নেই। কখনো অ্যাথলেটিক্সের ট্র্যাকে, কখনো রাস্তায় হয় প্রতিযোগিতা। ফুটবল, ক্রিকেটের বাইরে অন্য সব খেলোয়াড়দের মতো সাইক্লিস্টরাও আর্থিকভাবে দুর্বল। এরপরও সামান্যতেই তারা খুশি। নিশি বললেন, ‘আমি বিজিবির হয়ে খেলছি। বিজিবির সুযোগ সুবিধাতে আমি সন্তুষ্ট। চেষ্টা করি দলকে সব সময় পদক এনে দিতে। সরকার এখন সকল খেলার জাতীয় খেলোয়াড়দের ভাতার আওতায় আনায় আমরা এখন একটু নিশ্চিন্ত।’
৪৫তম জাতীয় সাইক্লিংয়ে নিশি ৩০ কিলোমিটার রোড টাইম ট্রায়াল এবং এক হাজার মিটার টাইম ট্রায়ালে স্বর্ণ জয় করেন। এই দুই ইভেন্টের দলগত খেলায় রৌপ্য পান। জাতীয় পর্যায়ে সাইক্লিং হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাইক্লিংয়ে তেমন সাফল্য নেই। অংশগ্রহণও খুব কম।