প্রভাত রিপোর্ট: রাজধানীর ইডেন মহিলা কলেজে গভীর রাতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। একদল শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। তাদের অভিযোগ, অতীতে ছাত্ররাজনীতির কারণে শিক্ষার্থীদের দুর্বিষহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে; মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি যৌন হয়রানির ঘটনাও ঘটেছে। তবে অন্য একটি পক্ষ বলছে, ছাত্ররাজনীতি করা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মৌলিক অধিকার। জুলাই অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী সরকারকে তাড়ানোর অন্যতম কারণ ছিল মত প্রকাশের অধিকার করতে না দেওয়া। তারা ক্যাম্পাসে রাজনীতি করলেও অন্যকেউ সেই সুযোগ পায়নি। এখন সেই পুরোনো কায়দায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের আড়ালে একটি পক্ষ ক্যাম্পাসে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ করার চেষ্টা করছে এবং ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবিকে সেই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ইডেন কলেজে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবিতে আন্দোলন করা ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের একজন শিক্ষার্থী গণমাধ্যমকে বলেন, ইডেন কলেজে স্বাধীন ও ভীতিহীন পরিবেশে পড়াশোনার অধিকার সবার আছে। অতীতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে ক্যাম্পাসে ভয় ও অনিরাপত্তার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। তিনি অভিযোগ করেন, ‘‘অতীতে আবাসিক সিট বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, জোরপূর্বক মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নেওয়ার চাপ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, এমনকি গুম-খুন ও ক্যারিয়ার নষ্টের হুমকির মতো ঘটনাও ঘটেছে। দুঃখজনকভাবে বলতে হয়- তারা ক্যাম্পাসে কমিটি পাওয়ার আগেই পুরোনো সংস্কৃতি আবার ফিরে আসছে। কমিটি পেলে হয়তো এর থেকেও ভয়ঙ্কর রূপ নেবে। তাই আমরা শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ চাই।”
অন্যদিকে, ইডেন কলেজ ছাত্রদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক সুমাইয়া আক্তার গণমাধ্যমকে বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে ‘ছাত্রী সংস্থা’ গুপ্ত রাজনীতির খেলা শুরু করেছে। আমরা জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়েছি মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য। এখন ফল ভোগ করতে চাইছে ওরা। ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ কাউকে রাজনীতি করতে দিতে চাইতো না, ওরা নিজেরাই সবকিছু করতো। এখন দেখছি এরাও তাদের মতো আচরণ করছে। তিনি বলেন, ‘‘ইডেন কলেজের ৬টি আবাসিক হলে ১০ হাজার আবাসিক শিক্ষার্থী আছে। অথচ গুটি কয়েকজন শিক্ষার্থী নিয়ে তারা মব সৃষ্টি করছে। ছাত্রদল করার অভিযোগে আমার কয়েকজন ছোটবোনকে মব করে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। অথচ তারা ক্যাম্পাসের রানিং শিক্ষার্থী। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় ‘গুপ্ত’ লেখা ছিল। সেগুলো মুছে ফেলা হয়েছে। ক্যাম্পাসের বাইরের আমাদের ব্যানারগুলো ছিঁড়ে ফেলেছে। ছাত্রদলের এই নেত্রী আরও বলেন, বন্ধ নয়- দরকার ছাত্র রাজনীতির সংস্কার। রাজনীতি আমার মৌলিক অধিকার। ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি করার অধিকার সবার আছে। যার মন চাইবে সে রাজনীতি করবে, যার চাইবে না সে করবে না। সবার ব্যক্তিগত পছন্দ আছে। তিনি বলেন, আমরা দেখেছি যারা রাজনীতি বন্ধের দাবি জানিয়েছে তারা পরবর্তীতে শিবিরের কমিটিতে আত্মপ্রকাশ করেছে। দুঃখজনক ঘটনা হলো, হিজাব একটা পবিত্র জিনিস। সেই হিজাবকে এখন হেলমেটের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে। ছাত্রী সংস্থার ইন্ধনে পুরো ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করা হচ্ছে।
এদিকে ছাত্রী সংস্থার গুপ্ত কর্মীদের ইন্ধনে ইডেন কলেজে মব সৃষ্টি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির। তিনি বলেন, ইবলিসও লজ্জা পাবে এই সাধারণ শিক্ষার্থী বেশধারী গুপ্ত শিবিরকে দেখলে। নাছির উদ্দিন নাছির বলেন, ছাত্র রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ, ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, রাজনৈতিক মত প্রকাশের স্বাধীনতা একজন শিক্ষার্থীর মৌলিক অধিকার। এর আগে আমরা দেখেছি, বিভিন্ন ক্যাম্পাসে শিবির তাদের গুপ্ত শাখার কর্মীদের দিয়ে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করার জন্য মব সৃষ্টি করেছিল। যারা এই মবের নেতৃত্ব দিয়েছে পরবর্তীকালে তারাই গুপ্ত সংগঠনের শীর্ষ নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। শিবির গুপ্ত রাজনীতি করে ছাত্র রাজনীতিকে দুর্গন্ধময় করে ফেলেছে। তিনি আরও বলেন, “কিছু দিন আগে তিতুমীর কলেজে রাতের বেলায় গেট ভেঙে মব সৃষ্টি করেছিল ছাত্রী সংস্থার কর্মীরা। তারা ছাত্রদলের নেত্রীদের হেনস্তা করেছে। ওই ক্যাম্পাসে পাঁচ আগস্টের পরে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলন করা মুনতাসীর পরবর্তীকালে কলেজ শাখা শিবিরের সেক্রেটারি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ইবলিসও লজ্জা পাবে এই সাধারণ শিক্ষার্থী বেশধারী গুপ্ত শিবিরকে দেখলে।’’
তিনি বলেন, “একইভাবে ছাত্রী সংস্থার গুপ্ত কর্মীদের ইন্ধনে ইডেন কলেজে মব সৃষ্টি করে ছাত্রদলের নেত্রীদের এবং অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের হেনস্তা করা হচ্ছে। ছাত্রীদের হল থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে। গুপ্ত বাহিনী অবিলম্বে এই মব সন্ত্রাস ও ছাত্রদলের নেত্রীদের হয়রানি করা বন্ধ না করলে আমরা সব ধরনের মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলবো।”
অন্যদিকে ইডেন কলেজে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়ে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা ও ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, ছাত্রদলের পুরোনো আমলনামা ইডেনের শিক্ষার্থীদের কাছে আছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ছাত্রদল নিজেদের সংশোধন না করে বরং ঠিক তাদের পুরোনো পন্থায় রাজনীতি করছে। আবারও দেশের নানা জায়গায় সাংগঠনিক স্ট্রাকচার তৈরি করে চাঁদাবাজি করেছে, খুন-ধর্ষণসহ সব ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পুরো ছাত্ররাজনীতিকে কলুষিত করেছে। ফলে ভীতসন্ত্রস্ত শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে রাজনীতির বিরুদ্ধে স্লোগান তুলছে। তিনি ছাত্রদলের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, শিক্ষার্থীদের দাস বানানোর প্রকল্প থেকে সরে আসুন। দলকে নতুন করে সাজান, সাংগঠনিক কর্মসূচিগুলো শিক্ষার্থীদের কল্যাণে নতুনরূপে সাজান। ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হবে কি হবে না এ বিষয়ে ইডেন কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তথ্যসূত্র : বাংলা ট্রিবিউন