প্রভাত স্পোর্টস: চা বিরতিতে গেলেন নামের পাশে ৯০ রান নিয়ে। ফেরার পর মোহাম্মদ আব্বাসকে চার মেরে সেঞ্চুরি পূর্ণ করতে তার লাগলো ২৩ ডেলিভারি। বল সীমানার দিকে যেতেই মুশফিক বুঝে যান— অপেক্ষার অবসান হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে দুই হাত উঁচু হয়ে ওঠে আকাশের দিকে। তারপর এমন এক উদযাপন, যেখানে ছিল স্বস্তি, আবেগ, তৃপ্তি আর বহু বছরের ক্লান্তিহীন শ্রমের বহিঃপ্রকাশ।
নন-স্ট্রাইকে থাকা তাইজুল ইসলামকে জড়িয়ে ধরেন। এরপর সৃষ্টিকর্তাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে সেজদাহ। হয়ে গেলো বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ টেস্ট সেঞ্চুরির উদযাপন। নিজের মনকে তৃপ্তি এনে দেওয়া ইনিংসের পর মুশফিকের এমন বুনো উল্লাস অনেকের কাছেই একদম অপরিচিত নয়।
এই সেঞ্চুরিগুলোই মুশফিককে আলাদা করে। কারণ বয়স ৩৯ ছুঁলেও তিনি এখনও নিজেকে উজাড় করে দিয়ে খেলেন। এখনও প্রতিটি রান তার কাছে শ্রমসাধ্য, প্রতিটি ইনিংস একেকটি ব্যক্তিগত পরীক্ষা। সেই কারণেই শতকের মুহূর্তগুলোতেও তার আবেগ এত নির্মল লাগে। মনে হয়, ক্রিকেট এখনও তার কাছে পেশা নয়, ভালোবাসার সবচেয়ে গভীর রূপ।
সিলেট টেস্টের দ্বিতীয় দিনের শেষ বলে আউট হন মুমিনুল হক। এরপর আজ সোমবার তৃতীয় দিনের সকালে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তকে নিয়ে কঠিন সময় পাড়ি দেন মুশফিক। তবে শান্ত বেশিক্ষণ টেকেননি, এরপর লিটনকে নিয়ে শুরু হয় মুশফিকের নতুন পথচলা। যেখানে ১২৩ রানের জুটিতে মুশফিক ছিলেন একইসঙ্গে ধৈর্যশীল ও প্রজ্ঞাবান। লিটন দাস যখন নিজের স্ট্রোকপ্লের শিল্পে ম্যাচকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন মুশফিক ছিলেন দৃঢ়, সংযত এবং সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত।
লিটন আউট হওয়ার পরও ইনিংসের গতি থামতে দেননি মুুুুুশফিক। পরিস্থিতির দাবি বুঝে তখন নিজের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। মেহেদী হাসান মিরাজকে নিয়ে এগিয়ে নেন ইনিংস। পরে তাইজুল ইসলামের সঙ্গে তার অবিচ্ছিন্ন জুটিও পেরিয়ে যায় পঞ্চাশ। ৮২ বলে আসে সেই ফিফটি পার্টনারশিপ। প্রতিটি রান তখন পাকিস্তানকে আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছিল ম্যাচ থেকে।
মুশফিকের এই ইনিংসের সৌন্দর্য ছিল তার নিয়ন্ত্রিত আগ্রাসনে। তিনি কখন ধীর হবেন, কখন গতি বাড়াবেন, কখন ঝুঁকি নেবেন— সবকিছু যেন পরিস্থিতির প্রয়োজন মেপে ঠিক করেছেন। ১৭৮ বলে পৌঁছান তিন অঙ্কে। তখন তার ইনিংসে ছিল ৯টি চার ও একটি ছক্কা। অপরপ্রান্তে তাইজুল ইসলাম ছিলেন ৩২ বলে ১১ রানে। স্কোরবোর্ড বলছিল শতকের গল্প, কিন্তু ম্যাচের ভেতরের গল্প বলছিল এক অভিজ্ঞ ব্যাটারের ক্রিকেটবোধের কথা।
এই শতকের মধ্য দিয়ে মুমিনুল হককে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের হয়ে টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ১৪ সেঞ্চুরির মালিক এখন মুশফিকুর রহিম। চলতি সিরিজের প্রথম টেস্টে মুমিনুলের সামনে সুযোগ ছিল তাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার। কিন্তু ৯১ রানে আউট হয়ে সেই সুযোগ হাতছাড়া করেন তিনি। মুশফিক সেই ভুল করেননি।
৯৯ থেকে সেই এক বাউন্ডারিতে এককভাবে উঠে যান বাংলাদেশের টেস্ট সেঞ্চুরির শীর্ষে। তিন সংস্করণ মিলিয়ে মুশফিকের এটা ২৩তম সেঞ্চুরি। তার চেয়ে বেশি সেঞ্চুরি আছে কেবল তামিম ইকবালের ২৫টি। তবে এই ইনিংসকে কেবল সেঞ্চুরি দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। কারণ একইসঙ্গে আরেকটি ইতিহাসও গড়েছেন তিনি। বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটার হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৬ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন মুশফিকুর রহিম।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ইতিহাসেও নতুন এক অধ্যায় লিখেছেন মুশফিক। ৩৯ বছর ৭ দিন বয়সে শতক করে তিনি এখন ডব্লিউটিসির সবচেয়ে বয়স্ক সেঞ্চুরিয়ান। ক্রিকেটের ভাষায় যাদের বলা হয় “ওল্ড গার্ড”, তারা এখনও মঞ্চ ছেড়ে যায়নি— মুশফিক যেন আবারও সেটিই মনে করিয়ে দিলেন।
এই ইনিংসকে আরও বড় করে তোলে তার ক্যারিয়ারের প্রেক্ষাপট। ২১ বছর ধরে টেস্ট খেলছেন তিনি। ম্যাচ সংখ্যা মাত্র ১০২। তুলনায় বিরাট কোহলি ১৪ বছরে খেলেছেন ১২৩ টেস্ট, অ্যালিস্টার কুক ১২ বছরে ১৬১। এমনও সময় গেছে, বাংলাদেশ বছরে পাঁচ-ছয়টির বেশি টেস্টই খেলেনি। দীর্ঘ আট মাস টেস্টবিহীন থেকেছে দল। মুশফিক নিজেও ক্যারিয়ারে বছরে গড়ে পাঁচটির কম টেস্ট খেলেছেন। সেই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে তার ৭৩০০-এর বেশি রান আরও বিস্ময়কর হয়ে ওঠে।
কারণ ক্যারিয়ারের শুরুতে বাংলাদেশও টেস্ট ক্রিকেটের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না, মুশফিক নিজেও না। একসময় যার গড় ছিল বিশের আশেপাশে, সেই মুশফিক আজ প্রায় চল্লিশ গড়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা টেস্ট ব্যাটার। এই ধারাবাহিকতার পেছনে প্রতিভার চেয়ে বড় ছিল তার ডেডিকেশন। ফিটনেসের প্রতি নিষ্ঠা। নিজেকে বদলে নেওয়ার ক্ষমতা। এই ইনিংসেই যেমন বিভিন্ন পার্টনারশিপ মিলিয়ে প্রায় ৪০০ বল ধরে উইকেটে ছিলেন তিনি। ৩৯ বছর বয়সেও যে ক্ষুধা, যে মনোযোগ, যে শ্রম তিনি দেখান, সেটিই তাকে আলাদা করে দেয়।
তাই আফসোসও জন্ম নেয়। যদি বাংলাদেশ আরও বেশি টেস্ট খেলত? যদি ক্যারিয়ারের শুরুর বছরগুলোতে এই দল আরও প্রস্তুত থাকত? যদি বছরে দশ-বারোটি টেস্ট খেলার সুযোগ পেতেন? তাহলে হয়তো আজ মুশফিক ১০ হাজার রানের ক্লাবের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকতেন। সেই ক্লাব, যার দরজা খুলেছিলেন সুনীল গাভাস্কার। পরে যেখানে যোগ দিয়েছেন অ্যালান বোর্ডার, স্টিভ ওয়াহ, শচীন টেন্ডুলকার, ব্রায়ান লারা, শিবনারায়ণ চন্দরপল, রিকি পন্টিংদের মতো মহারথীরা।
স্বপ্নটি এখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। কারণ মুশফিকের শরীরের চেয়েও তার ইচ্ছাশক্তি যেন বেশি তরুণ। আরও তিন বছর যদি খেলতে পারেন, কে জানে— হয়তো একদিন সত্যিই ১০ হাজারি ক্লাবের দিকেও হাঁটবেন তিনি।
বাংলাদেশি ক্রিকেটে বহু প্রতিভাবান ব্যাটার এসেছে, বহু স্টাইলিশ ইনিংসও দেখা গেছে। কিন্তু নির্ভরতার সংজ্ঞা লিখতে গেলে যে নামটি সবচেয়ে আগে আসে, তিনি মুশফিকুর রহিম। এই বয়সেও যিনি দলকে বাঁচানোর জন্য, এগিয়ে নেওয়ার জন্য, ইতিহাস লেখার জন্য নিজেকে নিংড়ে দিতে জানেন। সেই কারণেই তার নামের পাশে এতদিন পরও একই অভিধা মানিয়ে যায় সবচেয়ে বেশি— মিস্টার ডিপেন্ডেবল।