প্রভাত ডেস্ক: কিউবার ওপর ক্রমেই চাপ বাড়াচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রভাবশালী নেতা রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ, নতুন নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক চাপ এবং কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে দেশটিতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, কিউবা আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অভিবাসন ও ভূরাজনৈতিক দিক থেকে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। গত ২০ মে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ মিয়ামিতে রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। অভিযোগে বলা হয়, ১৯৯৬ সালে প্রতিরক্ষামন্ত্রী থাকাকালে তিনি নির্বাসিত সংগঠন ‘ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউ’র দুটি প্লেন গুলি করে ভূপাতিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওই ঘটনায় চারজন নিহত হন।
রাউল কাস্ত্রো ২০২১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতি থেকে অবসর নেন, তবে কিউবার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে এখনো তার প্রভাব রয়েছে বলে দাবি করা হয়। ৯৪ বছর বয়সী এই কমিউনিস্ট নেতার বিরুদ্ধে মামলা এবং দেশটির ওপর মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বৃদ্ধির ফলে ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্রটিতে দীর্ঘ ছয় দশক পর আবারও মার্কিন সামরিক অভিযানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্য থেকে মাত্র ১৪৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কিউবা। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, কিউবার বর্তমান রাজনৈতিক সংকট, রাশিয়া-চীনকে জোরালো সমর্থন এবং অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসী প্রবাহ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি। এর ফলে কিউবার ওপর মার্কিন নজরদারি বিমান চলাচল যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাবিদেরা সীমিত আকারের বিমান হামলা থেকে শুরু করে বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপের বিকল্পগুলো খতিয়ে দেখছেন।
ট্রাম্প ও তার কিউবান-আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। গত ৭ মে মার্কিন প্রশাসন দেশটির অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি এবং কাস্ত্রো পরিবারের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত সামরিক নিয়ন্ত্রিত সংস্থা ‘গায়েসা’-র ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর ঠিক এক সপ্তাহ পর মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) প্রধান জন র‍্যাটক্লিফ আকস্মিকভাবে হাভানায় রাউল কাস্ত্রোর নাতির সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি শাসনব্যবস্থায় ‘মৌলিক পরিবর্তন’ আনার জন্য সময় ফুরিয়ে আসছে বলে সতর্ক করেন এবং ক্যাথলিক চার্চের মাধ্যমে ১০০ মিলিয়ন ডলারের মার্কিন সাহায্য গ্রহণের প্রস্তাব দেন। তবে ওই বৈঠকটি সফল হয়নি। এর পরপরই গত ১৮ মে কিউবার গোয়েন্দা সংস্থাসহ একাধিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যতদিন এই শাসকেরা ক্ষমতায় থাকবে, ততদিন কিউবার বর্তমান গতিপথ পরিবর্তন করা সম্ভব বলে আমি মনে করি না।
মার্কিন সামরিক অভিযানের এই জোরালো আশঙ্কাকে একেবারেই উড়িয়ে দিচ্ছে না হাভানা। দেশটির সাধারণ নাগরিকদের বর্তমানে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে লিফলেট বিতরণ করে জনগণকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে। গত ১৮ মে কিউবান প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কিউবা আক্রমণ করলে তা অকল্পনীয় এক রক্তপাতের জন্ম দেবে। অবশ্য রাউল কাস্ত্রোর ভাই ফিদেল কাস্ত্রোর আমল থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরোধের জেরে যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের পদক্ষেপ নতুন কিছু নয়। এবারের মামলাটি মূলত মিয়ামির কিউবান নির্বাসিত ভোটারদের সন্তুষ্ট করতে এবং আলোচনার টেবিলে হাভানাকে চাপে ফেলতে ট্রাম্প প্রশাসনের একটি বড় কৌশল।
ওয়াশিংটনের কিউবা স্টাডি গ্রুপের রিক হেরেরো বলেন, দেশটির বর্তমান সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট থেকে নিজে নিজে ঘুরে দাঁড়ানো বা সংস্কার করা একেবারেই অসম্ভব।
খাদ্য ও জ্বালানির তীব্র সংকটে থাকা কিউবার পরিস্থিতি দিন দিন আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে। জ্বালানি সংকটে হাভানায় এখন দিনে ২২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। ছোট একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের মালিক ও হাভানার বাসিন্দা ইউলিয়েটা হার্নান্দেজ দিয়াজ বলেন, ‘এখানে জীবনযাপন এখন ডাস্টবিনে থাকার মতো হয়ে গেছে।’এদিকে কিউবায় বিক্ষোভও বেড়েছে। মে মাসে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রতিবাদে রাজধানী হাভানায় বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে রাজনৈতিক বন্দির সংখ্যাও বেড়েছে।
ট্রাম্প বরাবরই কিউবা নীতিতে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তবে এবার আইনি ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপ একসঙ্গে প্রয়োগ করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, কিউবার অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হলে পরিস্থিতির নতুন প্রভাব সামনে আসতে পারে।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট