আরাফাত দাড়িয়া
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশে অনেক আগে থেকে। পরিবর্তনের ফলে অর্থনৈতিকভাবে যেমন বিপর্যস্থ হচ্ছে, তেমনি খাদ্যে, নিরাপত্তায়, বাসস্থান, সঠিক কর্মসংস্থানও হারাচ্ছে দেশের মানুষ। জলবায়ু সম্মেলন এলে প্রতিবছর নড়েচড়ে বসে সংশ্লিষ্টরা কিন্তু সম্মেলন শেষে বাংলাদেশের মতো নিম্ন মধ্যবিত্ত দেশগুলোর কোন প্রতিকার পায়না। মৌসুমী বায়ুর চাপে বাংলাদেশের আবহাওয়াও পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে গ্রাম থেকে সরে যাচ্ছে মানুষ। কর্মসংস্থান খুঁজছে ইট পাথরের ঢাকা শহরে।
গ্রামের মানুষ শহরে আসার কারণে ব্যঘাত ঘটছে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসের। যেমন খাদ্যে ঘাটতি, কর্মসংস্থানের আকাল, পর্যাপ্ত বাসস্থানের অভাব, আর ব্যহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবন যাত্রার মানও। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, শহরে বাড়ছে জনগন। জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু পরিবেশের সংকট নয়; এটি মানুষের জীবিকা বদলে দিচ্ছে, গ্রাম থেকে শহরে মানুষের গ্রোত বাড়াচ্ছে এবং শহরগুলোর ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে। পরিবেশবীদরা বলছেন, জলবায়ুর কারণে গ্রাম থেকে হাজার হাজার মানুষ শহরে আসছে ঠিকই কিন্তু এদেরকে গ্রহন করার সক্ষমতা কি আছে শহরগুলোর।
বিশ্বব্যাংকের গ্রাউন্ডসওয়েল প্রতিবেদনের পূর্বাভাস বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৯৯ লাখ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের ভেতরেই স্থানান্তরিত হতে পারে। এদিক থেকে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসীর দেশগুলোর একটি। আবার বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) ২০২৫ সালের যৌথ মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত হয়ে বসবাস করছেন। প্রশ্ন হচ্ছে মানুষ কেন ঘর ছাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কি কি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন তারা। জলবায়ুর প্রভাবের কারণে মানুষ কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পারিবারিক সম্পর্ক সব মিলিয়েই নতুন জায়গায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাই কাউকে শুধু ‘জলবায়ু অভিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করাও সহজ নয়।
অনেক পরিবার অনানুষ্ঠানিক বসতিতে থাকতে বাধ্য হয়। সেখানে পর্যাপ্ত বাসস্থান, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা শিক্ষার সুযোগ সীমিত। আবার অনেকে অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ পান, যেখানে আয় অনিশ্চিত এবং সামাজিক নিরাপত্তা প্রায় নেই। অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ২০২১ সালে জাতীয় কৌশল গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচিও চলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ করে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে এসব উদ্যোগের বাস্থবায়ন এখনো দুর্বল অবস্থায় আছে। বেশিরভাগ পৌরসভার অর্থ ও জনবল সীমিত। এরই মধ্যে অবকাঠামো ও জনসেবার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া দ্বিতীয় সারির শহরগুলো ভবিষ্যতের এই জনস্রোত সামাল দিতে হিমশিম খেতে পারে বাংলাদেশ সরকার। আগামী জলবায়ু সম্মেলনের আগে দেশের মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, খাদ্যে সয়ংসসম্পূর্ণ করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ প্রাসঙ্গিক সববিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে। তবেই এবারের সম্মেলনে বাংলাদেশ আলোর মুখ দেখবে বলে আশাবাদী বিশেষজ্ঞরা।