প্রভাত সংবাদদাতা, জামালপুর: জামালপুরে টানা দাবদাহ ও অসহনীয় ভ্যাপসা গরমে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। কাগজে-কলমে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেও বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে পারদ ৪৬ ডিগ্রির মতো অনুভূত হচ্ছে। বুধবার (৩ জুন) সকাল থেকেই তীব্র রোদ, গুমোট আবহাওয়া এবং তপ্ত বাতাসে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে জেলার লাখো মানুষ। দুপুর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরের ব্যস্ত সড়ক ও হাট-বাজারে লোকসমাগম কমে যায়।
জানা গেছে, এ আবহাওয়ায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক ও রিকশাচালকরা। তীব্র গরমের কারণে দীর্ঘ সময় কাজ করতে না পেরে নিম্নআয়ের খেটে খাওয়া মানুষ চরম আয়সংকটে পড়েছেন। হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে জ্বর, ডায়রিয়া, পানিশূন্যতাসহ গরমজনিত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। গ্রামীণ জনপদে তীব্র রোদের পাশাপাশি ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে দুর্ভোগ আরও দ্বিগুণ হয়েছে।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, ফ্যান চললেও ঘরের ভেতরে যেন আগুনের উত্তাপ। বিদ্যুৎ থাকলেও স্বস্তি মিলছে না। অনেকেই বারবার গোসল করেও গরম থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না। শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে অস্বস্তি আরও বেশি দেখা দিয়েছে। হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে জ্বর, ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা ও গরমজনিত বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বাড়তে শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
শহরের বাসিন্দা সনেট মিয়া বলেন, এমন গরম আগে খুব কমই দেখছি। বাতাসে আর্দ্রতা এতো বেশি যে নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। ঘরের ভেতরে থাকলেও শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে। মনে হয় যেন চারপাশে আগুন জ্বলছে।
রিকশাচালক বজলুর রশিদ বলেন, ‘সকালে কিছুটা কাজ করা গেলেও দুপুরের পর রিকশা চালানো খুবই কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। ঈদের পর ভাবছিলাম একটু বেশি আয় করমু। কিন্তু মানুষই বের হচ্ছে না। কয়েক মিনিট পরপর পানি খাইতে হয়। তারপরও মাথা ঘুরায়, শরীর দুর্বল লাগে।’
মার্কেটিং অফিসার শাহরিয়ার উল্লাস বলেন, প্রতিদিন কাজের জন্য বিভিন্ন এলাকায় যেতে হয়। কিন্তু এই গরমে কয়েক মিনিট বাইরে থাকলেই শরীর ঘামে ভিজে যায়। অফিসের কাজের গতি কমে গেছে। আর্দ্রতার কারণে গরমটা আরও বেশি কষ্টদায়ক হয়ে উঠেছে।
শুধু শহর নয়, জেলার গ্রামীণ জনপদেও একই চিত্র। মাঠে কাজ করতে গিয়ে অনেক কৃষিশ্রমিককে ঘন ঘন বিরতি নিতে হচ্ছে। ধান কাটা, জমি পরিচর্যা ও অন্যান্য কৃষিকাজে শ্রমিক সংকটও দেখা দিচ্ছে। অনেকেই জানিয়েছেন, দুপুরের পর মাঠে দাঁড়িয়ে কাজ করাই প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
ইসলামপুর কুলকান্দি এলাকার কৃষক আব্দুল করিম বলেন, সকালে কিছুক্ষণ মাঠে কাজ করা গেলেও দুপুরের পর আর টিকতে পারি না। রোদের তাপে শরীর পুড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়। ধান কাটতে গেলেই ঘামে পুরো শরীর ভিজে যায়, বারবার বিশ্রাম নিতে হচ্ছে। কিন্তু কাজ বন্ধ রাখারও উপায় নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রার পাশাপাশি বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বেশি থাকলে শরীর থেকে ঘাম দ্রুত শুকাতে পারে না। ফলে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি হয় এবং মানুষ প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি গরম অনুভব করে। এর ফলে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা, মাথা ঘোরা, ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্টের মতো ঝুঁকি বেড়ে যায়।
জামালপুরের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আজিজুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বর্তমান আবহাওয়ায় হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও গরমজনিত বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও শ্রমজীবী মানুষদের বেশি সতর্ক থাকতে হবে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া দুপুরের সময় বাইরে না যাওয়াই ভালো। বাইরে গেলে ছাতা ব্যবহার করতে হবে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি ও খাবার স্যালাইন পান করতে হবে।’
এদিকে জামালপুরের বর্তমান আবহাওয়া পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ডিউটি অফিসার বলেন, ‘জামালপুরে আগামী ৪ জুন পর্যন্ত এমন গরম ও ভ্যাপসা আবহাওয়া বিরাজ করতে পারে। তবে এরপর ধীরে ধীরে তাপমাত্রা কমতে শুরু করবে এবং আবহাওয়ার অবস্থারও উন্নতি হতে পারে।’