প্রভাত ডেস্ক: বিশ্বজুড়ে তীব্র খরা ও ভয়াবহ দাবানলের ঝুঁকি বাড়িয়ে ধেয়ে আসছে জলবায়ুর চরম রূপ এল নিনো। আগামী কয়েক সপ্তাহ ও মাসের মধ্যে বিশ্বজুড়ে এর কারণে চরম আবহাওয়ার সৃষ্টি হতে পারে বলে জরুরি সতর্কবার্তা জারি করেছে জাতিসংঘের আবহাওয়া বিষয়ক সংস্থা বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে বাড়তে পারে খাদ্যের দাম। মঙ্গলবার (২ জুন) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ডব্লিউএমও জানায়, আগামী জুন থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরে এই এল নিনো সক্রিয় হওয়ার শঙ্কা ৮০ শতাংশ। আর আগামী নভেম্বরের মধ্যে এটি পূর্ণরূপে গঠন হওয়ার আশঙ্কা প্রায় ৯০ শতাংশ।
ডব্লিউএমওর তথ্যমতে, মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার এই প্রক্রিয়াটি (এল নিনো) বিশ্বজুড়ে বাতাস, বায়ুচাপ এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় ধরনের ওলটপালট ঘটায়। এটি সাধারণত নয় থেকে ১২ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
সংস্থাটি সতর্ক করেছে, এর প্রভাবে অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশে তীব্র খরা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে, দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চল, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অংশ, হর্ন অব আফ্রিকা এবং মধ্য এশিয়ায় বৃষ্টিপাত অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন এবং ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন নেটওয়ার্কের জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, এই আবহাওয়াজনিত পরিবর্তনের কারণে চলতি বছরে তীব্র দাবানল সৃষ্টি হতে পারে। এই ভয়ংকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগেভাগেই নজিরবিহীন প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। সাইপ্রাস, গ্রিস, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন এবং পর্তুগালের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে রেকর্ড সংখ্যক অগ্নিনির্বাপক কর্মী ও বিশেষ বিমান মোতায়েনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে ইইউ।
ডব্লিউএমওর মহাসচিব চেলেস্তে সাউলো জানান, এর আগে ২০২৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়া বিগত এল নিনো পরিস্থিতিটি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। সেই চরম আবহাওয়ার কারণেই ২০২৪ সালকে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম বছর হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছিল। তিনি আরও সতর্ক করেন, তীব্র তাপদাহ ও খরার পাশাপাশি মশা ও অন্যান্য বাহকনির্ভর রোগের বিস্তার বাড়তে পারে। একই সঙ্গে, কমে যেতে পারে খাদ্য ও পানির সরবরাহ। ফলে সংকটে থাকা দরিদ্র দেশগুলো আরও চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলেল সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের প্রভাবে সারা বিশ্ব যখন তীব্র মূল্যস্ফীতির সংকটে রয়েছে, তার মধ্যে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ সাধারণ মানুষের ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে যাচ্ছে। বিরূপ আবহাওয়ার কারণে বিশ্বজুড়ে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কোকো প্রক্রিয়াজাতকরণ কোম্পানি ‘ব্যারি ক্যালবট’-এর প্রধান নির্বাহী হাইন শুমাখার সতর্ক করে বলেন, বৈশ্বিক কোকো উৎপাদনের ৬০ শতাংশ আসে ইকুয়েডর ও পশ্চিম আফ্রিকা থেকে। এল নিনোর প্রভাবে খরা দেখা দিলে এসব অঞ্চলে উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যাবে। ফলে বিশ্ববাজারে প্রতি টন কোকোর দাম কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা সাধারণ পণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দেবে। এই জলবায়ু সংকট থেকে উত্তরণের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি ত্যাগ করে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়ার তাগিদ দিয়েছেন জাতিসংঘ প্রধান। আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, এল নিনো পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকা পৃথিবীর আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করবে।

সূত্র: আল-জাজিরা