প্রভাত রিপোর্ট:
২০১৬ সালের ১ জুলাই; দিনটি ছিল শুক্রবার। দিনের আলো নিভতেই গুলশানের কূটনৈতিক এলাকার ৭৯ নম্বর রোডের রেস্তোরাঁ ‘হলি আর্টিজান বেকারি’ রূপ নিয়েছিল এক বিভীষিকাময় রক্তাক্ত উপাখ্যানে। রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে রেস্তোরাঁটিতে সশস্ত্র হামলা চালায় জঙ্গিরা, যা স্তব্ধ করে দিয়েছিল পুরো বাংলাদেশকে। সেই রাতে ১৭ জন বিদেশিসহ মোট ২২ জন নিরীহ মানুষের নির্মম মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জঙ্গি হামলার ঘটনাটি ঘটে।
আজ প্রায় এক দশক পর, সেই ভয়াবহ স্মৃতি যখন মানুষের মনে এখনও দগদগে, ঠিক তখনই জনমনে নতুন প্রশ্ন— দেশে আবারও জঙ্গি তৎপরতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে কি না?
গত কয়েক মাস আগে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় ‘সম্ভাব্য জঙ্গি হামলা’র আশঙ্কা জানিয়ে সতর্কতামূলক চিঠি পাঠানোর পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও দীর্ঘদিন বড় ধরনের কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি, তবুও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি, দেশে জঙ্গিবাদ পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। উগ্রবাদী কিছু সংগঠন নীরবে পুনর্গঠিত হয়ে অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তারা ছোট ছোট সেল গঠন এবং লো-প্রোফাইল কার্যক্রমের মাধ্যমে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।
বিশেষ করে কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায় একটি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে একাধিক বিস্ফোরণ এবং পরবর্তীতে জঙ্গি সংশ্লিষ্ট অভিযোগে ১৭ জনের গ্রেপ্তারের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আবারও সতর্ক অবস্থানে নিয়ে আসে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক একটি জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে দেশীয় কয়েকজনের সম্পৃক্ততার লিংক এবং দেশীয় জঙ্গি সংগঠন ‘নব্য জেএমবি’র তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তদন্তে শুধু স্থানীয় নেটওয়ার্ক নয়, বরং পাকিস্তানভিত্তিক নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন ‘তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান’-এর (টিটিপি) সঙ্গে কিছু ব্যক্তির পরোক্ষ যোগাযোগ বা অনলাইন লিংকের তথ্যও উঠে এসেছে।

জঙ্গি দমনে বিশেষায়িত ইউনিটের বর্তমান সক্ষমতা ও চ্যালেঞ্জ

বর্তমান নিরাপত্তা সতর্কতার মুখে উগ্রবাদ দমনে গড়ে ওঠা বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠছে। পুলিশের জঙ্গিবিরোধী দুই বিশেষায়িত ইউনিট— কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ও অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের (এটিইউ) ভূমিকা এখন বিভিন্ন মহলে সমালোচিত। অভিযোগ রয়েছে, উগ্রবাদ মোকাবিলার জন্য তৈরি এই দুই ইউনিট বর্তমানে মাদক-কারবারি, ছিনতাইকারী, রাজনৈতিক মামলার আসামি এবং প্রচলিত অপরাধ দমনের কাজেই বেশি ব্যস্ত সময় পার করছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত সিটিটিসি মোট ১৫২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এর মধ্যে মাত্র ১১ জনের বিরুদ্ধে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। বাকি ১৪১ জনই মাদক-কারবারি, ছিনতাইকারী, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামিসহ বিভিন্ন প্রচলিত অপরাধে অভিযুক্ত। একইভাবে অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ) ৫০ থেকে ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করলেও তাদের অধিকাংশই প্রচলিত অপরাধী। জঙ্গিবাদ বা উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো বড় অভিযান বা তৎপরতা এই ইউনিটের পক্ষ থেকে চোখে পড়ছে না।
বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় যখন জঙ্গি হামলার সতর্কতা জারি করা হয়েছে, তখন এই বিশেষায়িত ইউনিটগুলো কেন প্রচলিত অপরাধ দমনে ব্যস্ত?
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বলা হয়, দেশে জঙ্গিবাদ পরিস্থিতি আগের তুলনায় ভিন্ন এবং অনেক ঘটনায় অতীতের তুলনায় ভিন্ন ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে। এরপর থেকেই সিটিটিসি ও এটিইউ’র জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমে কিছুটা শিথিলতা দেখা যায়। পরবর্তীতে ইউনিট দুটি মূলত প্রচলিত অপরাধ দমনের দিকেই বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠে, যার মধ্যে মাদক, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্ট অভিযান বেশি দেখা যায়।
তবে, সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবলের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, আগে সিটিটিসিতে জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ বিষয়ে দক্ষ এবং দীর্ঘদিন কাজ করা বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হতো। তবে, ৫ আগস্টের পর থেকে ইউনিটটিকে অনেকটাই ‘ডাম্পিং পোস্টিং’-এ পরিণত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন জঙ্গিবাদ নিয়ে কাজ করা অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের অনেককে বিভিন্ন ইউনিটে বদলি করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ জুলাই-আগস্টের হত্যা মামলার আসামি হওয়ায় আত্মগোপনে রয়েছেন। ফলে বর্তমানে সিটিটিসিতে জঙ্গিবাদ নিয়ে গভীরভাবে কাজ করার মতো অভিজ্ঞ কর্মকর্তার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যারা বর্তমানে দায়িত্বে রয়েছেন, তারা চেষ্টা করলেও জঙ্গিবাদসংক্রান্ত অপরাধের ধরন অন্য সব অপরাধের চেয়ে ভিন্ন হওয়ায় বিষয়গুলো আয়ত্ত করতে সময় লাগছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিটিটিসি’র এক কর্মকর্তা বলেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে ইউনিটটির জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছিল। আগের অনেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তার বদলি ও বিভিন্ন কারণে ইউনিটটিতে একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এখন আবার নতুন করে টিম গঠন ও কার্যক্রমকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কাজ চলছে। তবে, পুরো সক্ষমতা ফিরে পেতে কিছুটা সময় লাগবে।
একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে এটিইউতেও। ৫ আগস্টের পর কিছু কর্মকর্তা সক্রিয়ভাবে কাজ করার উদ্যোগ নিলেও বিভিন্ন ধরনের চাপ ও বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এটিইউর এক কর্মকর্তা বলেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ইউনিটটি জঙ্গিবিরোধী কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করেছিল। তবে, ওইসব অভিযানের পর বিভিন্ন ধরনের চাপ ও সমালোচনার মুখে পড়তে হয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। একপর্যায়ে অনেক কর্মকর্তা নিজেদের পেশাগত ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযান পরিচালনায় অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করেন। ফলে পরবর্তীতে ইউনিটটির তৎপরতা মূলত প্রচলিত অপরাধ দমন কার্যক্রমের দিকেই বেশি।
পূর্বে জঙ্গি দমনে কাজ করা, নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অতীতে দেশের জঙ্গিবিরোধী বিশেষায়িত ইউনিটগুলো সফলভাবেই একাধিক বড় অভিযান পরিচালনা করেছে এবং উগ্রবাদ দমনে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। গোয়েন্দা নজরদারি, অনলাইন মনিটরিং, তথ্য বিশ্লেষণ ও মাঠপর্যায়ের অভিযান নিয়মিত ছিল। কিন্তু এখন সেই ধারাবাহিকতা অনেকটাই কমে যাওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশে যদি আবার উগ্রবাদী তৎপরতার শঙ্কা তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর মূল ফোকাসও সেদিকেই থাকা উচিত।’
এ বিষয়ে গত ২৫ এপ্রিল ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিটিটিসি ইউনিটের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন বলেন, ‘আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই, আমরা কাজ করছি, ইনশাআল্লাহ আমরা এটা ফেস করতে পারব। দেশে জঙ্গি বা উগ্রবাদী আছে কি নেই— এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট মন্তব্য করার মতো অবস্থায় এখনই যাওয়া সম্ভব নয় এবং বিষয়টি নিয়ে তদন্ত ও নজরদারি চলমান রয়েছে।’ তবে, এসব বিষয়ে সার্বিক তথ্য এবং বাংলাদেশের উগ্রবাদের সার্বিক পরিস্থিতি কেমন— জানতে সিটিটিসি ও এটিইউ প্রধানকে ফোন করা হলেও তারা ফোন ধরেননি। যদিও সিটিটিসি প্রধান সরকারি যে নম্বরটি ব্যবহার করেন তা অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকে। হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার এক দশক পূর্তি উপলক্ষ্যে সিটিটিসির একজন যুগ্ম কমিশনারকেও একাধিকবার ফোন করা হয়, কিন্তু তিনিও কল রিসিভ করেননি।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের উদ্বেগ

নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ কখনও পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় ছিল না; বরং ভিন্ন ভিন্ন কৌশল ও আড়ালে বিভিন্ন সময়ে তাদের তৎপরতা চলমান ছিল। বিশেষ করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে এবং বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর কার্যক্রমে শিথিলতা তৈরি হওয়ায় ভবিষ্যতে এ হুমকি আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে।
এ বিষয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্সের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দেশে উগ্রবাদ নতুন করে তৈরি হয়নি, বরং বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন রূপে সক্রিয় ছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও এসব গোষ্ঠীর কার্যক্রম ছিল। তারা তখন অন্য ফর্মে কাজ করেছে এবং নিজেদের অনেক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নও করতে পেরেছে। তবে, এখন রাজনৈতিক সরকার আসায় সেই উদ্দেশ্যগুলো আগের মতো সহজে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জঙ্গিবাদকে গুরুত্ব না দিয়ে বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়েছে। জঙ্গিদের অনেককে ঢালাওভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, বিষয়টিকে ইগনোর করা হয়েছে। ফলে তারা আবার সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। অন্য সব অপরাধ মোকাবিলার জন্য পুলিশের সাধারণ ইউনিট তো আছেই। বিশেষায়িত ইউনিটগুলো গঠন করা হয়েছে বিশেষ ধরনের হুমকি মোকাবিলার জন্য। তারা যদি সেই কাজই না করে, তাহলে বুঝতে হবে রাষ্ট্র বাস্তব পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না, কিংবা অস্বীকার করছে। সিটিটিসি ও এটিইউ যদি সক্রিয়ভাবে উগ্রবাদ দমনে কাজ না করে, তাহলে ভবিষ্যতে এর দৃশ্যমান প্রভাব দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে দেখা যেতে পারে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত সপ্তাহে পুলিশ সদর দপ্তরে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ক্রাইম কনফারেন্সে জঙ্গিবাদ ইস্যুতে বিশেষ আলোচনা হয়। সেখানে উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর ওপর নজরদারি আরও জোরদার করার পাশাপাশি জঙ্গি সংগঠনের নামে যেকোনো ধরনের ‘সাদা পতাকা মিছিল’ কোনোভাবেই সহ্য না করার স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের উগ্র ও সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আইজিপি।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার মতে, ধারাবাহিক অভিযানের ফলে জঙ্গি সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামো অনেকটাই ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে, তাদের সেই বিপজ্জনক নেটওয়ার্ক এখনও পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়নি বলে মনে করছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। ইউনিটের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্তত পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় হামলার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া, র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক ও মুখপাত্র এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরীও জানান, সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনায় উগ্রবাদী তৎপরতার আলামত পাওয়া গেছে। কোথাও এ ধরনের কর্মকাণ্ডের তথ্য-প্রমাণ মিললে র‍্যাব তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে এবং যেকোনো ধরনের নাশকতামূলক তৎপরতা প্রতিরোধে বাহিনীটি সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন সতর্ক ও তৎপর অবস্থানের বিপরীত চিত্র দেখা গেছে সরকারের নীতিগত পর্যায়ে। দেশে জঙ্গি তৎপরতার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি মন্তব্য করেন যে, দেশে বর্তমানে ‘কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই’। তিনি আরও জানান, উগ্রপন্থার ক্ষেত্রে তিনি নিজে ‘জঙ্গি’ শব্দটিকে স্বীকৃতি (রিকগনাইজ) দিতে রাজি নন। তার মতে, কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠী বা মতাদর্শের মানুষ প্রায় সব দেশেই কম-বেশি থাকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, ‘ফ্যাসিবাদী আমলে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে এই গোষ্ঠীগুলোকে এক ধরনের কৃত্রিম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে বাংলাদেশে সেগুলোর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই।’
সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের এমন স্পষ্ট ও ভিন্ন অবস্থানের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটও বর্তমানে মাঠপর্যায়ে প্রকাশ্যে বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক ও বুঝেশুনে পদক্ষেপ নিচ্ছে।

ফিরে দেখা: এক দশক আগের সেই বিভীষিকাময় রাত

আজ থেকে এক দশক আগে, ২০১৬ সালের ১ জুলাই দিনটি ছিল শুক্রবার। দিনের আলো নিভতেই গুলশানের কূটনৈতিক এলাকার ৭৯ নম্বর রোডের রেস্তোরাঁ ‘হলি আর্টিজান বেকারি’ বিভীষিকাময় রূপ নিয়েছিল। রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে হলি আর্টিজান বেকারিতে সশস্ত্র হামলা চালায় জঙ্গিরা। সেই রাতে ১৭ জন বিদেশিসহ মোট ২২ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান জঙ্গিদের হাতে। রাতভর চলা সেই জিম্মি পরিস্থিতির অবসান ঘটে পরদিন সকালে, সেনাবাহিনী পরিচালিত ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’-এর মাধ্যমে। ওই অভিযানে হামলাকারী পাঁচ জঙ্গি নিহত হয় এবং জীবিত উদ্ধার করা হয় ১৩ জন জিম্মিকে।
হামলার দায় স্বীকার করে ওই রাতেই বিবৃতি দিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)। তৎকালীন সরকার আইএসের এই দাবি নাকচ করে দিয়ে বলেছিল, দেশীয় জঙ্গি সংগঠন ‘নব্য জেএমবি’ এই হামলার জন্য দায়ী।
জঙ্গি হামলায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ইতালির নাগরিক ছিলেন নয়জন, জাপানের সাতজন, ভারতের একজন ও বাংলাদেশি তিনজন। সেই রাতে জিম্মিদের মুক্ত করতে অভিযান চালাতে গিয়ে জঙ্গিদের বোমা হামলায় নিহত হন পুলিশের দুই কর্মকর্তা। ভয়াবহ এই জঙ্গি হামলায় সেই রাতে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল পুরো দেশ।
‘স্যার আমি আপনার পেছনে’, ওসি সালাউদ্দিনের কথা এখনও কানে বাজে
নৃশংস সেই হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় করা মামলাটি বিচারিক প্রক্রিয়ায় দুটি ধাপ পেরিয়েছে। এ মামলায় বিচারিক আদালতের পর হাইকোর্টে রায় হয়েছে। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করেছেন দণ্ডিত আসামিরা, যা এখন শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
সেই বিভীষিকাময় রাতের বর্ণনা দিয়ে ওই সময়ে রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী সাইদুর রহমান বলেন, ‘সাংবাদিকতায় পড়াশোনার তাগিদে সংবাদ দেখা ও শোনার আগ্রহ ছিল অনেক। ওই দিন রাত প্রায় ৯টা ছুঁইছুঁই, তখন টিভির স্ক্রলে লেখা আসলো— গুলশানের একটি রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলা হয়েছে। দেশি-বিদেশি অনেক মানুষ সেখানে আটকে পড়েছে এবং অনেক গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। হাতে থাকা স্মার্ট মোবাইল থেকে বিষয়টি বিস্তারিত দেখতে ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করি, কিন্তু তখনও জঙ্গি হামলার ঘটনার কোনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না।’
তিনি বলেন, “তখন দেখি মিরপুর-১ এর সি ব্লকের আকবর মসজিদের পাশের একটি দোকান থেকে বের হয়ে রাকিব নামে এক যুবক তার বোনের কাছে ফোন দিচ্ছেন। আগ্রহবশত জানতে চাই— আপনাদের কেউ সেখানে আটকে পড়েছে কি না? উত্তরে তিনি জানিয়েছিলেন, ওই রেস্তোরাঁর পাশের একটি ভবনে ভাড়া থাকেন তার বড় বোন। বড় বোনের ভাষ্যে বিভীষিকাময় রাতের বর্ণনাটা ছিল এমন— ‘আমাকে আমার ড্রাইভার বললেন, আপা আপনি এখন বেরোবেন না, নিচে গোলাগুলি চলছে। তারপর দেখি আমার ড্রয়িং রুমের জানালার কাচ ফেটে গেল। এরপর থেকে অনবরত গুলির শব্দ শুনতে পাই। আমার মেয়ে কান্নাকাটি শুরু করে এবং আমরা সবাই কান্নাকাটি শুরু করি। কারণ, খুবই আতঙ্কজনক একটা পরিস্থিতি চলছিল।’”
ঘটনার ব্যাপ্তি আরও বাড়তে থাকে। দেশ থেকে বিদেশ, সবার চোখ হোলি আর্টিজান বেকারি রেস্তোরাঁর জঙ্গি হামলার দিকে। কত জন জিম্মি করেছে, কত জনকে মেরে ফেলা হয়েছে— এই প্রশ্ন যেন ওই রাতে সবার মুখে মুখে। এর মধ্যে খবর আসল জঙ্গিদের গুলিতে পুলিশের দুই সদস্য মারা গেছেন। তখন আতঙ্ক আরও বাড়তে শুরু করে; স্পষ্ট হয় যে জঙ্গিদের সংখ্যা অনেক এবং তারা বেশ শক্তিশালী।
এদিকে, ঘটনার দিন রাত ১০টায় ঢাকার উত্তর সিটি কর্পোরেশনের তৎকালীন মেয়র আনিসুল হকের স্ত্রী রুবানা হক এক টুইটে (এক্স) লিখেন— ‘পুলিশ ইজ সারাউন্ডিং দ্য এরিয়া, গানফায়ার স্টিল অন’।

পরদিন সকালেই কমান্ডো অভিযান

রাতভর গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁ সংলগ্ন এলাকা ঘিরে রাখার পর ২ জুলাই সকাল সাড়ে ৭টায় যৌথ সেনা, নৌ, পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবির সমন্বয়ে যৌথ কমান্ডো দল অভিযানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়। ৭টা ৪৫ মিনিটে কমান্ডো বাহিনী মূল অভিযান শুরু করে। অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত দলের সদস্যরা রেস্তোরাঁর ভেতরে প্রবেশ করলে তীব্র গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়।
সকাল সোয়া ৮টায় রেস্তোরাঁ থেকে প্রথম দফায় নারী ও শিশুসহ ছয়জন বেরিয়ে আসেন। ৮টা ৫৫ মিনিটে ভবনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয় অভিযানকারীরা। এরপর গোয়েন্দা দল ভবনের ভেতরে বিস্ফোরকের জন্য তল্লাশি এবং আলামত সংগ্রহের কাজ শুরু করে। ৯টা ১৫ মিনিটে অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়।
‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’-এর মধ্য দিয়ে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে প্রায় ১২ ঘণ্টার রক্তাক্ত জিম্মি সংকটের অবসান হয়।
সকাল ১০টায় চারজন বিদেশিসহ ১৩ জন জীবিত উদ্ধারের খবর জানানো হয়। রেস্তোরাঁটির ভেতরে অজ্ঞাত পাঁচজনের মৃতদেহ পাওয়ার কথা জানায় পুলিশ। এরপর বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে এক বিবৃতিতে অভিযানে জঙ্গিদের ছয়জন নিহত এবং একজন ধরা পড়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়।