রবিবার, ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১

পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় ধীরগতি, সংকটে বিএনপি

প্রকাশিত - ০৯ জুন, ২০২৪   ০১:১০ এএম
webnews24

প্রভাত রিপোর্ট : দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পুনর্গঠন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে না পারায় বিএনপিতে শৃঙ্খলা বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে বেড়েছে সন্দেহ, অবিশ্বাস আর বিভাজন। সম্প্রতি হাতেগোনা কয়েকটি কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নেমেছে বিএনপি। কিন্তু তাতে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল হতাশাজনক। তবে বিএনপির দায়িত্বশীলরা বলছেন, দলের পুনর্গঠন চলমান প্রক্রিয়া। এতে বারবার বাধা দিচ্ছে সরকার। তাই সংগঠনকে শক্তিশালী করতে সময় নিয়ে বুঝে শুনেই পুনর্গঠন করা উচিত।

বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর পরপর সম্মেলন (কাউন্সিল) করে জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটি নির্বাচন করার কথা। সর্বশেষ কার্যনির্বাহী কমিটির কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। সেই কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে পাঁচ বছর আগেই। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গত ২১ ফেব্রুয়ারি ঝালকাঠি জেলা বিএনপির সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম জামালকে জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির ধর্মবিষয়ক সম্পাদক পদে নিযুক্ত করা হয়। এরপর ১৯ মার্চ জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদারকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য, কমিটির গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়াকে সাংগঠনিক সম্পাদক (কুমিল্লা বিভাগ) ও সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ রাশেদুল হককে দলের আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদে মনোনীত করা হয়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় কমিটিতে আর কোনো নেতার পদোন্নতি বা পদাবনতি হয়নি।

বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট রফিক সিকদার বলেন, যথাসময়ে পুনর্গঠন হলে যেমন সংগঠন গতিশীল হয় তেমনি সেটা না হলে অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়, সংগঠন দুর্বল হয়। পরিস্থিতির কারণে নিয়মিত কাউন্সিল হচ্ছে না। দলে যেটা হচ্ছে এটা স্বাভাবিকও বলা যাবে না, ধীরগতিও বলা যাবে না। এটা চলমান। তবে এতে কাউন্সিলের যে প্রতিপাদ্য বিষয় সেটা পূরণ করবে না। আমরা চাই দলের নেতৃত্ব বিকশিত হবে। রফিক সিকদার বলেন, বাংলাদেশে সুস্থ ধারার রাজনীতি চলছে না বিধায় শুধু বিএনপি নয় সব রাজনৈতিক দল এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। গণতন্ত্র চর্চা করতে পারছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সহ-সম্পাদক বলেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে কার্যনির্বাহী কমিটির সভার তাগিদ এবং দল পুনর্গঠনের দাবি ছিল হাইকমান্ডের প্রতি। কিন্তু নেতাকর্মীদের সেই দাবির কোনো প্রতিফলন নেই। যে কারণে বিএনপি রাজপথের কর্মসূচিতে ফিরতে পারছে না। দল এবং অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলোর যারা ব্যর্থ হয়েছেন, তারা এখনও বহাল রয়েছেন। এ কারণে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে অবমূল্যায়নের শঙ্কা রয়েছে।

বিএনপি দলীয় সূত্র জানায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাস প্রবল আকার ধারণ করেছে। একটা অংশ মনে করছে, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্থায়ী কমিটির নেতাদের গুরুত্ব না দিয়ে তুলনামূলক জুনিয়র কয়েকজন নেতার মতামতের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এদিকে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তারেক রহমান যে সব জুনিয়র নেতাকে গুরুত্ব দেন বলে প্রচার রয়েছে, তারা আন্দোলনে না থেকে আত্মগোপনে ছিলেন কেন সে নিয়েও দলের একটি অংশের নেতাকর্মীদের মধ্যে বেশ সন্দেহ রয়েছে। দলের সাংগঠনিক সম্পাদকদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অর্থ আত্মসাতের প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও তার আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ দিতে পারেনি বিএনপি।

আন্দোলনের অর্থ আত্মসাৎ প্রসঙ্গে বিএনপির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, এটা একটা অপপ্রচার। বাস্তবতা হলো সরকারের ইন্ধনে এই নিউজগুলো করানো হচ্ছে, যাতে নেতাকর্মীদের মধ্যে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব তৈরি করা যায়। আওয়ামী লীগ গত ১৭ বছর হাজারো চেষ্টা করেও বিএনপিকে ভাঙতে পারেনি। বিএনপি থেকে কোনো লোক তার দলে ফেরাতে পারেনি। এতকিছুর পরেও যখন তারা হতাশ হয়ে যায়, তখন তারা এগুলো করে। শুধু সাংগঠনিক সম্পাদক নন, দেখবেন দলের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে এই কথাগুলো ওঠে। মাঝে মধ্যে শুনবেন সিনিয়র-জুনিয়রদের মধ্যে মতপার্থক্য। এগুলো আসলে বিভিন্ন এজেন্সি করে। সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এ নিউজগুলো তৈরি করে। এখন তো গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই। ফরমায়েশি রিপোর্ট প্রকাশ হয়। গণমাধ্যমও যে স্বেচ্ছায় করে তা নয়, তারাও বাধ্য হয়ে এই রিপোর্টগুলো প্রকাশ করে।

বিএনপি সূত্র জানায়, যথাযথ পুনর্গঠন না হওয়ায় বিএনপিতে হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতি চলছে। গত ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে নয়াপল্টনে সমাবেশ করে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। ১১ মে সমাবেশ করে জাতীয়তাবাদী যুবদল। সেখানে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল হতাশাজনক। সর্বশেষ গত ৩০ মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা ছিল রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে। সেখানে ছিল না কোনো ব্যানার, হলরুমে দেখা যায়নি জিয়াউর রহমানের ছবি। বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন স্বপন কারা মুক্তির তিন মাস পরেও দায়িত্বে ফিরতে পারেননি।

বিএনপির পুনর্গঠন প্রসঙ্গে সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, পুনর্গঠন চলমান প্রক্রিয়া। কাউন্সিলের পরিবেশ থাকলে আমরা এক সপ্তাহের মধ্যে কাউন্সিল করতে পারি কিন্তু সেই পরিবেশ নেই। যে কারণে মৃত্যুজনিত এবং বহিষ্কারজনিত বা অন্য কারণে যে সব পদ শূন্য, সেই শূন্যপদ পূরণের জন্য চেয়ারপারসনকে গঠনতন্ত্র মোতাবেক যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সে অনুযায়ী শূন্যপদ পূরণ করা হচ্ছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান বলেন, সাংগঠনিক পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। এরই মধ্যে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির কিছু শূন্যপদ পূরণ করা হয়েছে। বাকিগুলো যথাসময়ে পূরণ করা হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা এখন আন্দোলনের মধ্যে আছি। তারপরও কাউন্সিল করার চেষ্টা ও ইচ্ছা আমাদের আছে। সেটাও আমরা সময় মতো করব।’
প্রভাত/আসো
 

ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন
ওয়েব নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

আরও পড়ুন