• শনিবার, ০৯ মে ২০২৬, ০৮:৪৪ অপরাহ্ন
Headline
মুক্তাগাছায় নিখোঁজ মাদরাসা ছাত্রের বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার টিকার সংকট এবং হামে শিশুমৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত শুরু: স্বাস্থ্যসচিব পুলিশ সপ্তাহ শুরু রবিবার, ১০৭ জনকে পদক দেবেন প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির বিদেশযাত্রা ও দেশে ফেরার রাষ্ট্রাচারে পরিবর্তন রাজধানীতে ফের বেড়েছে মশার উপদ্রব, ডেঙ্গুর ভয় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দেশের রাজনৈতিক ইকোসিস্টেমের প্রতিফলন: ড. ইফতেখারুজ্জামান জিডিপির ৫ শতাংশ শিক্ষাখাতে বরাদ্দের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে নির্বাচনের আগে দেয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হবে: তারেক রহমান বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর বানানো ‘স্মার্ট কারে’ চড়লেন প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার: মাহাদী আমিন

বৈদেশিক ঋণসহায়তার সুদের বাড়িয়েছে জাপান, বিপাকে বাংলাদেশ

Reporter Name / ৭ Time View
Update : শনিবার, ৯ মে, ২০২৬

প্রভাত অর্থনীতি: জাপান বৈদেশিক ঋণসহায়তার ক্ষেত্রে সুদের হার আরও বাড়িয়েছে। সস্তায় ঋণ দিতে সুপরিচিত দেশটি সুদের হার বাড়ানোয় বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ঋণের বড় একটি উৎস জাপান। এখন দেশটি থেকে বাংলাদেশকে ঋণ নিতে হলে বাড়তি সুদ দিতে হবে।
ঢাকায় জাপানের দূতাবাস থেকে গত ২৯ মার্চ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠি দেয়া হয়। এতে বলা হয়, জাপান সরকার বৈদেশিক সহায়তা বা অফিশিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্সের পর্যালোচনা করেছে। এটি নিয়মিত পর্যালোচনার অংশ। নতুন সুদের হার ও শর্তাবলি ১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে।
চিঠির সঙ্গে মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশের জন্য সুদের হার ও শর্তাবলি যুক্ত করা হয়েছে। সেই তালিকা বিশ্লেষণ করে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেছেন, বিশেষ প্রকল্পের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এবং সাধারণ—এই তিন শ্রেণিতে জাপান ঋণ দেয়। কোনো ঋণের সুদের হার স্থির এবং কোনোটির পরিবর্তনশীল।
ঢাকায় জাপানের দূতাবাস থেকে গত ২৯ মার্চ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠি দেয়া হয়। এতে বলা হয়, জাপান সরকার বৈদেশিক সহায়তা বা অফিশিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্সের পর্যালোচনা করেছে। এটি নিয়মিত পর্যালোচনার অংশ। নতুন সুদের হার ও শর্তাবলি ১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে।
সাধারণ জাপানি ঋণের ক্ষেত্রে গত বছরের অক্টোবরেও সুদের হার (স্থির) ছিল ২ দশমিক ৯ শতাংশ। সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে। অর্থাৎ, সুদের হার বেড়েছে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশীয় বিন্দু। স্থির সুদের হারের ক্ষেত্রে আরও তিনটি বিকল্প রয়েছে। সে ক্ষেত্রে সুদ একই হারে বেড়েছে। তিন বিকল্পের মধ্যে সর্বনিম্ন সুদের হার ২ দশমিক ৭ শতাংশ, যা এত দিন ছিল ২ শতাংশ। আরও বিভিন্ন ধরনের ঋণ ও সুদের হার রয়েছে।
জাপানি নাগরিকদের জন্য পরামর্শক ফি বেড়েছে। তবে ঋণ পরিশোধের সময়কাল ও গ্রেস পিরিয়ড (যে সময়ের জন্য সুদ নেই) সময়সীমা অপরিবর্তিত রয়েছে। সাধারণ ও স্থির সুদহারের ঋণের ক্ষেত্রে পরিশোধের সময়সীমা ১৫ থেকে ৪০ বছর। গ্রেস পিরিয়ড ৫ থেকে ১০ বছর। সুদের হার বাড়ানোর ফলে জাপানের ঋণে প্রস্তাবিত তিনটি প্রকল্প ফেরত পাঠিয়েছে ইআরডি।
প্রকল্প তিনটি হলো উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্প (ইউজিডিপি), হাওর অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উন্নয়ন প্রকল্প। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য তিনটি প্রকল্প নেয়া হয়েছিল।
ইআরডির একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, এত বেশি সুদে ঋণ নিয়ে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন লাভজনক হবে না। তাই তিনটি প্রকল্প সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
ইআরডির অতিরিক্ত সচিব (জাপান অনুবিভাগ) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, জাপান নতুন ঋণের সুদের হার নির্ধারণের পর তাদের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়ে সরকার বেশ সতর্ক। এখন থেকে এমন প্রকল্প নেওয়া হবে, যেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকে বেশি। অর্থনৈতিক সুফলও বেশি থাকে।
জাপান বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন সহযোগী। বিদেশি ঋণ ও সহায়তা বিষয়ে ইআরডির প্রতিবেদন (২০২৪–২৫) বলছে, ২০২৫ সালের ৩০ জুন বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ (স্থিতি) ছিল ৭ হাজার ৭২৮ কোটি মার্কিন ডলার। এর ১৮ শতাংশই দিয়েছে জাপান।
বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ঋণ পেয়েছে বিশ্বব্যাংকের আইডিএ (ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন) থেকে, যা মোট পরিমাণের ২৯ শতাংশ। এরপর রয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), যাদের পরিমাণ ২৩ শতাংশ। তারপরই জাপান, রাশিয়া (১১ শতাংশ), চীন (৭ শতাংশ), ভারত (২ শতাংশ) এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার অবস্থান।
জাপান তাদের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার মাধ্যমে বাংলাদেশের মেট্রোরেল, মহেশখালীর মাতারবাড়ীর বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল, যমুনা নদীর ওপর নির্মিত রেলওয়ে সেতুসহ বিভিন্ন প্রকল্পে সাম্প্রতিক কালে ঋণ দিয়েছে।
জাইকার সঙ্গে গত বছরের ২৭ জুন রেলপথ মন্ত্রণালয় জয়দেবপুর থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণে প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা ঋণের চুক্তি করে। এ ঋণের সুদের হার ছিল ২ শতাংশ। ১০ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ৩০ বছর। পরামর্শক সেবা ছিল শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ।
অবশ্য দুটি প্রকল্প নিয়ে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কিছুটা শীতল যাচ্ছে। প্রকল্প দুটি হলো মেট্রোরেল-১ (কমলাপুর থেকে পূর্বাচল) ও হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে থার্ড টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা। জাইকার শর্তের কারণে মেট্রোরেল প্রকল্পে প্রতিযোগিতার সুযোগ কম। ব্যয় বেশি পড়ছে। অন্যদিকে থার্ড টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা করতে চায় জাপান।
কোন দেশ বা সংস্থার সুদের হার কত, তা একবাক্যে বলা কঠিন। কারণ, প্রকল্প ও ঋণের ধরনের কারণে সুদের হার ও শর্তে পরিবর্তন আসে।
ইআরডি সূত্র বলছে, বিশ্বব্যাংকের আইডিএ ঋণের সুদের হার এখন ১ দশমিক ২৫ শতাংশ। সার্ভিস চার্জ বা সেবা মাশুল আরও দশমিক ৭৫ শতাংশ। সব মিলিয়ে সংস্থাটির ঋণের সুদের হার ২ শতাংশে দাঁড়ায়। ৫ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ২৫ বছরে বিশ্বব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করা হয়। তবে বিশেষ প্রয়োজনে কঠিন শর্তে বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়, যার সুদের হার ৪ শতাংশের বেশি।
এ ছাড়া এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিবি থেকে ২ শতাংশ হারে ঋণ নেয় বাংলাদেশ। ৫ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ২০ বছরে এ ঋণ পরিশোধ করা হয়। এডিবি থেকেও বিশেষ প্রয়োজনে কঠিন শর্তে ঋণ নেয় বাংলাদেশ। তখন সে ঋণের সুদের হার ৪ শতাংশের বেশি হয়।
বাংলাদেশ সাধারণত বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাপান থেকে স্বল্প সুদ ও সহজ শর্তের ঋণ বেশি পায়। চীনা ঋণের শর্ত কঠিন। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে রাশিয়ার ঋণও তুলনামূলক কঠিন শর্তে নিয়ে বাংলাদেশ। এই প্রকল্পে রাশিয়া ১ হাজার ১৩৮ দশমিক ৫ কোটি ডলার ঋণ দিচ্ছে, যার সুদের হার পড়বে ৪ শতাংশের মতো। পরিশোধের সময়কাল ২৮ বছর। গ্রেস পিরিয়ড ১০ বছর।
চীনা ঋণের সুদের হার সাধারণত ২ থেকে সোয়া ২ শতাংশ হয়ে থাকে। তবে পরিশোধের সময়কাল কম, ১৫ বছরের মতো। সুদের হার কম রাখলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পে কেনাকাটা ঋণদাতা দেশ থেকে করতে হয়। তখন পণ্যের দাম বেশি রাখায় খরচ বেড়ে যায়।
দেশের আয়ের ওপর ভিত্তি করে সুদের হার কমবেশি হয়। বিশ্বব্যাংক মধ্যম আয়ের দেশগুলোকে দুটি শ্রেণিতে ভাগ করে—নিম্নমধ্যম আয় ও উচ্চ মধ্যম আয়। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ের শ্রেণিভুক্ত হয়। তখন থেকেই বিভিন্ন সংস্থার সুদের হার বাড়তে থাকে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, সহজ শর্তে ঋণের (কনসেশনাল ফাইন্যান্স) সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে। সবাই এখন বাজারমূল্য অনুযায়ী সুদ নেওয়া শুরু করেছে। এর চাপ এখনই কিছু কিছু পড়তে শুরু করেছে। ভবিষ্যতে চাপ আরও বাড়বে।
জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ২১ এপ্রিল জানান, বাংলাদেশ সরকারের বিদেশি ঋণ এখন ৭ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ সাড়ে ৯ লাখ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২২ টাকা করে)। ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও বৈদেশিক ঋণের দায় ছিল ৬ হাজার ৮০০ কোটি ডলার।
সরকারকে প্রতিবছর বিপুল টাকা ব্যয় করতে হয় ঋণের সুদাসল হিসেবে পরিশোধে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশি ঋণ পরিশোধ করা হয় ৪০০ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান গণমাধ্যমকে বলেন, ভবিষ্যতে যাতে বিদেশি ঋণে ভেবেচিন্তে প্রকল্প নেওয়া হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। যেসব প্রকল্পে কর্মসংস্থান হবে এবং অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, কেবল সেসব প্রকল্প নিতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category