প্রভাত অর্থনীতি: চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অর্থ ব্যয় হয়েছে ৬৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা, যা বরাদ্দের মাত্র ২৪.৭ শতাংশ কম। গত এক দশকের বেশি সময়ে আর কোনো অর্থবছরে এত কম এডিপি বাস্তবায়ন হতে দেখা যায়নি। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে উন্নয়ন ব্যয় গত অর্থবছরের তুলনায় ১৮ হাজার ৪৯ কোটি টাকা কম হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এডিপিতে ব্যয় হয়েছিল ৮৫ হাজার ৬০২.৫৯ কোটি টাকা, যা ওই অর্থবছরের মোট এডিপি বরাদ্দের ৩১.১৭ শতাংশ। আইএমইডির ওয়েবসাইটে ২০১১-১২ অর্থবছর পর্যন্ত তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে আর কোনো অর্থবছরের এত কম এডিপি বাস্তবায়ন হয়নি।
আইএমইডির কর্মকর্তারা বলেন, জুলাই অভ্যুত্থা- পরবর্তী সময়ে এডিপি বাস্তবায়ন করা যায়নি। এছাড়া প্রশাসনের সবক্ষেত্রে অস্থিরতা বিরাজ করছে, যা এখনও স্বাভাবিক হয়নি। এ কারণে চলতি অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নে এখনও গতি আসেনি। আগের সরকারের সময়ে নেওয়া চলমান সব প্রকল্পই সরকার পর্যালোচনা করেছে। অগুরুত্বপূর্ণ ও রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া অনেক প্রকল্প বা স্কিম বাদ যাচ্ছে। এর প্রভাবও বাস্তবায়নে পড়েছে।
এছাড়া জুলাই অভ্যুত্থানের পরে অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক চলে গেছেন। অনেক প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে মালনা হয়েছে। ফলে এডিপি বাস্তবায়ন হারও কমে গেছে। অনেক দেশীয় ঠিকাদারও প্রকল্প এলাকায় এখনও ফিরে আসেনি। একইভাবে বৈদেশিক অর্থায়নের অনেক প্রকল্পে বিদেশি ঠিকাদার অনুপস্থিত রয়েছে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নেও গতি কমেছে।
আইএমইডির কর্মকর্তা বলেন, সরকার অনেক প্রকল্পে কম অর্থছাড় করছে বলেও বাস্তবায়ন কম হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে সবক্ষেত্রে অস্থিরতা বিজার করছে। পরিস্থতি স্বাভাবিক নয়। এ কারণে চলতি অর্থবছরের এডিপি বাস্তবায়ন হার গত এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। আবার পরিস্থিতির কবে উন্নতি হবে, তা-ও বলা যাচ্ছে না। ফলে চলতি অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নে খুব বেশি সময় পাওয়া যাবে না। তবে শেষ প্রান্তিকে বা অর্থবছরের শেষের দিকে গিয়ে অন্যান্য অর্থবছরের মতো তাড়াহুড়া করে অর্থ ব্যয় করা ঠিক হবে না বলে মত দেন ইন্সটিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সরকার পরিবর্তনের কারণে চলতি অর্থবছরের সব ক্ষেত্রে অস্থিতিরতা বিজার করছে। প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলনায় অস্থিরতা এখনও রয়ে গেছে। কাজেই স্বাভাবিক কারণে এডিপি বাস্তবায়ন কম হবে। তবে শেষের দিকে যেনতেনভাবে অর্থ খরচের উৎসব করা হলে এতে সরকারি অর্থের অপচয় হবে। কারণ তাড়াহুড়া করে মানসম্মতভাবে বাস্তবায়ন করা যায় না। অনেকসময় বাস্তবায়ন বেশি দেখানোর জন্য ঠিকাদারকে অগ্রিম বিলও দেওয়া হয়। এটা বন্ধ করতে হবে। তাড়াহুড়া করে অর্থ ব্যয়ের সুযোগে যাতে দুর্নীতি না হয়, সেদিকে নজদারি বাড়াতে হবে।’
আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে সরকারি তহবিল থেকে খরচ হয়েছে ৩৪ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২১ শতাংশ। কিন্ত গত অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ৪৯ হাজার ৮০৪ কোটি টাকা, মোট বরাদ্দের ২৯.৪৭ শতাংশ।
আলোচ্য সময়ে বৈদেশিত তহবিল থেকে ব্যয় হয় ২৭ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা, বা বরাদ্দের ২৭.৪৭ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে সরকারি তহবিলের ব্যয় ছিল ২১ হাজার ১০৫ কোটি টাকা বা ৩৪ শতাংশ। এছাড়া চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে বাস্তবায়ন সংস্থাগুলোর নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ২২৪ কোটি টাকা। ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে চলতি অর্থবছরের এডিপির ৭৬.৬৫ শতাংশ বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। মূলত এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ওপর এডিপি বাস্তবায়নের হার নির্ভর করে। সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া ১৫ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে বেশ কয়েকটির এডিপি বাস্তবায়ন হার খুবই কম। এর মধ্যে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ খরচে করেছে বরাদ্দের ০.৪১ শতাংশ। আর স্বাস্থ্য বিভাগ ব্যয় করেছে বরাদ্দের ৫.৪৮ শতাংশ।
কর্মকর্তারা জানান, এমনিতেই সক্ষমতার অভাবে স্বাস্থ্য খাতে অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয় না। তার ওপরে এবার পাঁচ বছর মেয়াদি পঞ্চম স্বাস্থ্য পুষ্টি ও জনসংখ্যা কর্মসূচি এখানও অনুমোদন পায়নি। এই কর্মসূচি গত জুলাই থেকে বাস্তবায়নে যাওয়ার কথা ছিল। এর ফলেও স্বাস্থ্য খাতে এডিপির বরাদ্দ ব্যয় করা যাচ্ছে না।
সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় ব্যয় করেছে ১৪ শতাংশ। এছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ১৭.৯৮ শতাংশ, বেসামরিক বিমান পরিবহন পর্যটন মন্ত্রণালয় ১৮.৩৫ শতাংশ, সেতু বিভাগ ১৮.৮৮ শতাংশ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ১৯.৩৬ শতাংশ, রেলপথ মন্ত্রণালয় ২২ শতাংশ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ২৬.৮০ শতাংশ এবং কৃষি মন্ত্রণালয় ২৯.৫৪ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন করেছে।
সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাস্তবায়ন করেছে তিনটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এর মধ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ৩৬.৯৬ শতাংশ, বিদ্যুৎ বিভাগ ৩৬.৫২ শতাংশ এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ ৩৪.৮২ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে। এছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ৩৬.৫৫ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ বিভাগ ৩৩.৬৪ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন করেছে প্রথম আট মাসে।