প্রভাত ডেস্ক
সিরিয়ায় ডিসেম্বরে শাসক বাশার আল আসাদ পালিয়ে যাওয়ার পর নতুন করে সংঘাত শুরু হয়েছে। যদিও এ সময় দেশটিতে উত্তেজনা শুরু হওয়া কাঙ্ক্ষিত নয়। তবে বিষয়টি যে একেবারে অপ্রত্যাশিত ছিল তাও বলা যাচ্ছে না। আসাদ ও তার ঘনিষ্ঠজনদের অনেকেই রাশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে পালিয়ে গেলেও তার বহু অস্ত্রধারী সমর্থক এখনো দেশটিতে রয়ে গেছে। তারা সিরিয়ার পশ্চিমে সমুদ্রের তীরবর্তী এলাকায় সংঘটিত হওয়ার চেষ্টা করছে। উপকূলীয় শহর লাতাকিয়া বরাবরই আলাভি শিয়াদের শক্ত ঘাঁটি। আসাদ পরিবার মূলত এই শিয়াদের প্রতিনিধিত্ব করত। যদিও শিয়াদের এই গ্রুপটি সিরিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। হাফিজ আল আসাদ ১৯৭০ এর দশকের গোড়ার দিকে ক্ষমতা দখলের পর এরাই সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। তারা আহমেদ আল শারা’র নেতৃত্বাধীন হায়াত তাহরির আশশামের (এইচটিএস) বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হচ্ছে। হঠাৎ ঘোলাটে পরিস্থিতি তৈরির পেছনে ইরানের হাত থাকতে পারে বলে অনুমান করা যায়। কারণ ইরান আসাদের অন্যতম আঞ্চলিক মিত্র ছিল। আসাদের পতন তেহরানের জন্য একটি বড় ক্ষতি। তবে ইরান আসলেই কিছু করছে কি না, সেটা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। আসাদপন্থিদের হামলা মোকাবিলায় শারা এইচটিএসের সহযোগী মিলিশিয়াদের দেশের বিভিন্ন জায়গায় সতর্ক অবস্থানে রেখেছেন। তাদের মোকাবিলায় প্রস্তুত আছে সিরিয়ান ন্যাশনাল আর্মির মতো অন্য মিলিশিয়া গ্রুপগুলোও। এরা আসাদবিরোধী। আসাদের অনুগত সশস্ত্র ব্যক্তিদের হাতে যথেষ্ট পরিমাণ গোলাবারুদ আছে। তারা নিরীহ বেসামরিক লোকজনের ওপর নির্বিচার আক্রমণ চালিয়ে ত্রাসের রাজত্ব তৈরিতে সচেষ্ট।
আসাদ পরিবারের পাঁচ দশকের শাসন টিকে থাকতে যারা ভূমিকা রাখে তাদের মধ্যে সশস্ত্র বিভিন্ন মিলিশিয়া গ্রুপ ছিল। খুন, গুম, নির্যাতন থেকে শুরু করে এমনকি রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ পর্যন্ত রয়েছে। বলা অনাবশ্যক, এরা অত্যন্ত অজনপ্রিয়। এদের প্রতি বেশিরভাগ মানুষের কোনো সমর্থন নাই। ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী শহর তারতুসে চলতি মাসের ৭-৮ তারিখে আসাদপন্থি ও এইচটিএসের মধ্যে সংঘর্ষে ৭০০ বেসামরিক মানুষসহ ১ হাজারের বেশি নিহত হয়েছে। শহরের রাস্তাঘাট তখন যুদ্ধের রূপ নিয়েছিল। রাজধানী দামেস্ক থেকে ঐ জায়গার দূরত্ব ২০০ কিলোমিটার। এই ঘটনার জন্য এইচটিএস সমর্থক মিলিশিয়াদের দায়ী করা হচ্ছে। তবে এর আগে আসাদের অনুগত মিলিশিয়ারা ৬ মার্চ সরকারি বাহিনীর ওপর অ্যামবুশ করে সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটায়। আসাদের পতনের পর দেশটিতে এটিই সবচেয়ে বড় সংঘর্ষের ঘটনা, যেখানে এতগুলো মানুষ প্রাণ হারায়। নিহতদের মধ্যে খ্রিষ্টানসহ অনেক সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর মানুষ ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, যদিও এটি বড় একটি রক্তপাতের ঘটনা কিন্তু এ থেকে সিরিয়ায় নতুন করে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে না। কারণ আগেই বলা হয়েছে, আসাদপন্থিদের উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন নাই। তাদের সমর্থনে মনে হয় না মানুষ এখন রাস্তায় নেমে এসে লড়াই করবে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন এইচটিএস একটি আলকায়েদার দলছুট অংশ। তাছাড়া শারা নিজেও একসময় ইসলামপন্থি জঙ্গি নেতা হিসেবে পশ্চিমাদের কাছে পরিচিত ছিলেন। তিনি এখন অবশ্য নিজেকে একজন মধ্যপন্থি হিসেবে পরিচয় দেন। তার প্রশাসনের এই সময়ে অর্থনৈতিক অবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার প্রতি অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করা উচিত। তাছাড়া আলকায়েদার সঙ্গে এককালে সম্পর্ক থাকার জেরে মানবাধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুর মতো বিষয়গুলোর দিকেও পশ্চিমারা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ সিরিয়ার ওপর থেকে এখনো সবগুলো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেনি।
আশার কথা, শারা এই বিষয়টি অবগত আছেন। তিনি শান্তির পথকে এখনো পর্যন্ত প্রাধান্য দিচ্ছেন, প্রয়োজন ছাড়া কোনো সংঘর্ষে যাচ্ছেন না। তিনি চান পশ্চিমারা তার দেশের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিক বা শিথিল করুক। যেন তারা প্রায় ১৫ বছরের যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটি পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করতে পারে। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের ফলে সিরিয়ার অর্থনীতি ৮০ শতাংশের বেশি সঙ্কুচিত হয়েছে। ইরান সিরিয়ার অভ্যন্তরে নাক গলাচ্ছে এমন ধারা প্রচলিত থাকলেও এর কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে আসাদের আরেক মিত্র রাশিয়া চায় যে, শারা ব্যর্থ হোক। সিরিয়া ইস্যুতে আরেক গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক দেশ তুরস্ক চায় শারা টিকে থাকুক। যদিও আঙ্কারার সাথে বেইজিং ও মস্কোর সুসম্পর্ক আছে, কিন্তু শারার পতন ঘটলে তার অন্যতম ভুক্তভোগী হবে তুরস্ক। এজন্য শারার প্রশাসনকে রিসেপ তাইপ এরদোগান সমর্থন দিচ্ছেন। মিশর, জর্দান, সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের মতো অন্য প্রতিবেশীরা যে বিষয়টি খুব ভালোভাবে দেখছে তা হয়তো বলা যাবে না। কারণ ইসলামপন্থিদের নিয়ে এই দেশগুলোরও যথেষ্ট অস্বস্তি আছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ৭-৮ মার্চের রক্তপাতের ঘটনায় সিরিয়ার বর্তমান অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সমালোচনা করলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে দূরত্ব বজায় রাখার নীতি মেনে চলছে।