মীর আব্দুল আলীম
ঈদ এলেই শুরু হয় এক মহাযজ্ঞ। যাকে বলে ঈদযাত্রা। এই যাত্রার আনন্দ যেমন অপার, তেমনি ভোগান্তিও সীমাহীন। ঈদ মানেই খুশি, ঈদ মানেই আনন্দ! কিন্তু এই আনন্দের মূল চাবিকাঠি হলো ঈদযাত্রা। যতক্ষণ না কেউ গাঁয়ের বাড়ির উঠোনে গিয়ে মায়ের হাতে ইফতার খাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ঈদের আনন্দ যেন ‘লোডিং…’ অবস্থায় থাকে! আর সেই লোডিং প্রসেস মানেই ঈদযাত্রা—এক অদ্ভুত মিশন, যেখানে মিলেমিশে থাকে আনন্দ, বেদনা এবং অ্যাডভেঞ্চারের টানটান উত্তেজনা।
যাত্রারর টিকিট যুদ্ধ: ঈদযাত্রার প্রথম ধাপই হলো টিকিট সংগ্রহ। যাকে বলে একেবারে ‘মিশন ইম্পসিবল’! অনলাইনে টিকিট পাওয়া মানে যেন লটারিতে জেতার মতো সৌভাগ্যের ব্যাপার। আর কাউন্টারে গেলে? সেখানে যে লাইনের দৈর্ঘ্য দেখে অনেকেই মনে করেন, যদি এই লাইন ধরে হাঁটেন, তবে হয়তো পদ্মা সেতু না পার হলেও, গাজীপুর পর্যন্ত ঠিকই পৌঁছে যাবেন! যারা আগেভাগে টিকিট পেয়ে যান, তারা নিজেদের বিজয়ী ভাবতে থাকেন। কিন্তু ট্রেন, বাস বা লঞ্চে ওঠার পর বুঝতে পারেন, আসল খেলা এখন শুরু!
গন্তব্যের পথের রোলার কোস্টার: বাসে ওঠা মাত্রই শুরু হয় ‘প্যাকেট’ হওয়ার গল্প। এখানে মানুষ একে অপরের সঙ্গে এতটাই মিশে যায় যে, বায়োলজির ক্লাসে ‘মলিকিউলারের ঘনত্ব’ নিয়ে যা পড়ানো হয়, তা এখানে বাস্তবে অনুভব করা যায়! ড্রাইভার ভাইজানের ড্রাইভিং আবার একেবারে রোমাঞ্চকর। মাঝেমধ্যে মনে হয়, তিনি হয়তো আগের জন্মে ফর্মুলা ওয়ান রেসার ছিলেন! অন্যদিকে ট্রেনের অবস্থা আরও জমজমাট। যারা ভেতরে ঢুকতে পারেন, তারা নিজেদের ‘ভাগ্যবান’ মনে করেন। আর যারা ট্রেনের ছাদে ওঠেন, তারা মনে মনে নিজেকে অ্যাডভেঞ্চার লাভার বলে ভাবেন। কিন্তু বাস্তবে তারা হন একেকজন মানব পতাকা, বাতাসে দোল খেতে খেতে গন্তব্যে পৌঁছানোর অপেক্ষায়।
টাইটানিক সিনড্রোম বিপদের নাম লঞ্চ: লঞ্চের যাত্রীদের জন্য ঈদযাত্রা একেবারে ‘টাইটানিক মুভি’র লাইভ সংস্করণ! ভিড় এত বেশি থাকে যে, একে ‘ভাসমান জনসভার’ সঙ্গে তুলনা করলেও ভুল হবে না। মাঝে মাঝে মনে হয়, লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো যেন এক বিশাল পাবলিক মিটিং করছে, যেখানে সবাই একসঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করছে!
গন্তব্যে পৌঁছে স্বস্তির নিঃশ্বাস: ঈদের আগের দিন রেলস্টেশনে গিয়ে দেখি, ভিড় নয়—এ যেন হাট বসেছে! এত মানুষ কীভাবে এখানে ঢুকল, তা দেখে আমি নিজেই অবাক। ট্রেন যখন প্ল্যাটফর্মে ঢুকল, তখন যা হলো, তাকে যুদ্ধ বললেও কম বলা হবে। সবাই দৌড়াচ্ছে, ঠেলাঠেলি করছে, যেন কোনো যুদ্ধ জয় করতে এসেছে। আমি ঠিক করলাম, ট্রেনের ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করব না, বরং ছাদে উঠে পড়ব। কিন্তু সমস্যাটা হলো, ছাদেও যে জায়গা নেই! এক চাচা আমাকে বললেন, “বাবা, একটু কষ্ট করে আমার ব্যাগের ওপর বসো, সমস্যা হবে না।” আমি ভাবলাম, এর চেয়ে ভালো সুযোগ আর কী হতে পারে! ব্যাগের ওপর বসতেই টের পেলাম, ব্যাগের ভেতরে আসলে কাঁঠাল আছে! কাঁঠালের সুঘ্রাণে আমার ঈদযাত্রা শুরু হলো।
সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে যখন অবশেষে বাড়ির উঠোনে পৌঁছে যাওয়া যায়, তখন মনে হয়, জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ জিতে এসেছি! মায়ের হাতের ইফতার খেয়ে, বাবার সঙ্গে নামাজে গিয়ে, ভাই-বোনদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে বোঝা যায়—এই ভোগান্তির ঈদযাত্রাই আসলে আমাদের ঈদের পূর্ণতা এনে দেয়। তাই যতই কষ্ট হোক, ঈদযাত্রা ছাড়া ঈদের আনন্দ যেন অসম্পূর্ণ! এ যেন বৃষ্টিতে ভিজে স্কুলে যাওয়ার মতো অনুভূতি—কষ্ট হলেও, পরে মনে হয়, আহা! কী সুন্দর একটা অভিজ্ঞতা ছিল!
বাসের ঝুলন্ত ঈদ: ট্রেনে উঠে আধা ঘণ্টা পর বুঝলাম, আমি আর এই রোদে কাঁঠালের গন্ধ সহ্য করতে পারব না। তাই হাল ছেড়ে বাসের দিকে রওনা হলাম। কিন্তু বাসস্ট্যান্ডে গিয়েও বুঝলাম, এখানেও যুদ্ধ চলছে! এক বাসের হেলপার বললেন, “ভাই, ওঠেন, একটু দাঁড়াতে পারবেন তো?” আমি ভাবলাম, দাঁড়িয়ে থাকতে সমস্যা কী! কিন্তু বাসে ওঠার পর দেখলাম, দাঁড়ানোর সুযোগ নেই—আমি পুরোপুরি ঝুলন্ত অবস্থায় আছি!
যাত্রীদের ঠেলাঠেলির মধ্যে এক সময় এক আঙ্কেল আমার কানের কাছে চিৎকার করে বললেন, “ভাই, একটু সরে দাঁড়ান!” আমি কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বললাম, “ভাই, দাঁড়াব কোথায়? আমি তো এখন বাতাসে ভাসছি!”
ঈদের আগের কয়েকটা দিন:
পারিপার্শ্বিক কিছু ঘটনা চোখে জল আসে। বুক ধড়ফড় করে। এক অসহ্য কষ্টে মন ভারী হয়ে ওঠে। না সইবার কষ্টে এমনটা অনেকেরই হয়। ঈদে নিজের জন্য কেনা হয় না কিছুই। স্বজনদের জন্য কিছু নিতে রাজধানীর এক মার্কেটে গেলাম, কিন্তু কেনাকাটার বদলে এক অদ্ভুত বেদনা নিয়ে ফিরে এলাম। মার্কেটের কোলাহলের মাঝে হঠাৎ করেই এক করুণ চিৎকার কানে এলো-এক ছোট্ট মেয়ে শিশু, বয়স বড়জোর পাঁচ কি ছয়। চিৎকার করে কাঁদছে। জামাটা সে নেবেই নেবে। বাবার সাধ্য নেই কি করে কিনবে ওই জামা। চেহারা দেখেই বেশ বুঝতে পারলাম। দূর থেকে তাকিয়ে মনে হলো, কী হবে এই মেয়েটার ঈদ? কী হবে এই বাবার অনুভূতির, যখন নিজের বুকের মানিকের চোখের জল মুছিয়ে দিতে পারছে না? ইচ্ছে হলো এগিয়ে যাই, শুধু ওই একটা নয়, আরও কয়েকটা জামা কিনে তুলে দিই শিশুটির হাতে। যদি ওর মুখে এক চিলতে হাসি ফোটে! কিন্তু ঠিক তখনই থমকে গেলাম—এই বাবার আত্মসম্মানবোধ কী আমার এই সহানুভূতি মেনে নেবে? যদি অপমানবোধে কষ্ট পান? মানুষেরতো আবার আত্মসম্মান আছে। সেদিন চাপা কষ্টে দোকান থেকে বেরিয়ে পড়লাম। ভাবলাম দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে অল্প আয়ের মানুষের ঈদ আনন্দটা যেন নিরানন্দ হয়েই আসে। প্রতিটি বাবা-মা’ই সন্তানদের হাতে ইচ্ছামতো জামাকাপড় তুলে দিয়ে হাসি মুখটা দেখতে চায়। ক’জনের ভাগ্যেই বা সেই হাসি জোটে।
এক বোতল আখের রস, অমূল্য সুখ : সেদিন ইফতারে ছোট ছেলেটা আখের রস খাবে বলতেই বাসা থেকে নিচে নেমে গেলাম। রোদের তাপ তখনো মিলিয়ে যায়নি, কিন্তু সন্তানের ইচ্ছা বলে কথা! জুসবারে দাঁড়িয়ে রস কিনছি, হঠাৎ টেনেটুনে পুরোনো একটা ফ্রক পরা এক শিশু এসে দাঁড়াল সামনে। বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে আখের রসের বোতলের দিকে। পকেট থেকে ২০ টাকা হাতে দিলাম, তবুও দাঁড়িয়ে রইলো। আখের রস দিকে কি তৃপ্তিতে তাকিয়ে আছে মেয়েটা। শিশুটির চোখের ভাষা পড়তে কষ্ট হলো না আমার। হাতে ধরা বোতলটা এগিয়ে দিতেই এক নিমেষে তার মুখজুড়ে ফুটে উঠল এক অভাবনীয় হাসি-যেন চাঁদের আলো গড়িয়ে পড়ল গোধূলির আকাশে! এমন হাসির দাম কি কোনো টাকায় মেলে?
রসের বোতলটা নিয়ে সে আনন্দে দৌড় দিল। কৌতূহল জাগল মনে, পিছু নিলাম। গিয়ে দেখি, পাশের রাস্তায় একটি হুইলচেয়ারে বসা পঙ্গু বাবা, পাশে ছোট ভাইটা দাঁড়িয়ে আছে। শিশু মেয়েটা ছুটে গিয়ে বোতলটা তুলে দিল বাবার হাতে। ছোট ভাইটা বোতলটা দেখে ফোকলা দাঁতে এমন এক তৃপ্তির হাসি দিল-তা কোনো ভাষায় লেখা যায় না! পঙ্গু বাবা, ছোট ভাই আর ছোট্ট মেয়েটার চোখে যে সুখের ঝিলিক দেখলাম, তাতে বুঝলাম-সে শুধু নিজের জন্য রস কিনতে চায়নি, সুখটুকু ভাগ করে নিতেই ছুটে গিয়েছিল! মাত্র ১০০ টাকায় সেদিন আমি এক অমূল্য দৃশ্যের সাক্ষী হলাম। সত্যিই, যাদের সামর্থ্য আছে, তারা চাইলেই এমন ছোট ছোট মুহূর্ত দিয়ে পৃথিবীকে একটু উজ্জ্বল করে তুলতে পারেন!
সেদিন জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে বড় বোনকে দেখব বলে মিরপুরে যাচ্ছিলাম। ট্রাফিক সিগন্যালে পা নেই লাঠি ভর করেই গাড়ির সামনে হাজির ২২/২৩ বছরের এক যুবক। কিছু টাকা হাতে দিতে চেহারাটা যেন জলজল করছে তার। প্রত্যাশার চেয়ে প্রাপ্তিটা হয়তো বেশি ছিল তার, নয়তো তৃপ্তিটা বেশি! ভাবলাম মানুষকে খুশি করতে অনেক বেশি কিছু লাগে না শুধু একটা মন লাগে। মাঝে মাঝেই যদি এমনটা করি আমরা অন্তত জ্বলজ্বলে হাসিমুখ গুলোতো দেখতে পাব।
খুব নিকটাত্মীয়ের গল্পটা এখন বলছি আমি। সেটি ছিল বছর পনের আগের কথা। তখন রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরীতে থাকি আমরা। আমার ওই আত্মীয় বিদেশ থেকে তার সন্তানদের জন্য অনেক সুন্দর সুন্দর জামাকাপড় কিনে আনেন। কোরবনি ঈদের ঠিক দু’দিন আগের কথা। সন্তানদের মাঝে কাপড় বণ্টন করছেন। বাসার কাজের বুয়াটা সেদিন তার সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে কাজে আসেন। শিশুটি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল সেই কাপড়ের দিকে। আত্মীয়ের দিলে ভীষণ চোট লাগে। সঙ্গে সঙ্গেই গায়ে কাপড় চেপে নিচে নেমে গেলেন তিনি। ফুটপাত থেকে একটি লাল গেঞ্জি আর কালো রংয়ের প্যান্ট নিয়ে এলেন। তার হাতে কাপড়গুলো দিতেই সে কি আনন্দ! আমিও উপভোগ করি তার সেদিনের জ্বলজ্বলে সেই মুখখানি। অল্পতে খুশি হওয়া সেই চেহারাটা এখনো আমার চোখে ভাসে। বিদেশ থেকে দামি ব্রান্ডের কাপড় সবটা যে তার সন্তানদের পছন্দ হয়নি এটা আমি সেদিন বুঝতে পেরেছি। সৃষ্টিকর্তা আসলে সত্যিই পারেন। সুখটা কাকে কখন কীভাবে দেবেন, তৃপ্তি কোথায় নিহিত সেটা অত্যন্ত রহস্যময়। কাউকে তিনি অল্পতে অনেক তৃপ্তি আর সুখ দেন আবার অনেক কিছু থেকেও অনেকের সুখ নেই, শান্তি নেই। এটাই হয়তো ভালোলাগার দুনিয়ায় শ্রষ্টার মহান খেলা।
জীবনের সুখ গুলো এমনই। এমন নানা ভালো কাজের শেষে তৃপ্তির ঘুমও আসে। আমাদের প্রত্যাহিত জীবনে ঘুমটা আসলে আল্লাহর বিশাল একটা নেয়ামত। লাখ টাকার পালঙ্কে শুয়ে কারো হয়তো ঘুম হয় না; ছটফট করে রাতটা কষ্টে কাটে। স্বামী হয়তো কোনো ডিস্কো পার্টিতে কিংবা মদের বারে ফুর্তি করছে। রাস্তা কিংবা ফুটপাতে টাঙ্গানো পলিথিনের ভেতরে অনেকে দম্পতির কতই না সুখের সংসার। এই আমরাই দেখি ফুটপাতে শব্দ আর ধুলাবালির মধ্যে কেউ কেউ নাক ডেকে ঘুমায়। আবার দেখি রাস্তার পাশে কোনো খালি জায়গায় ভর রোদে তৃপ্তির ঘুম দিচ্ছে শ্রমজীবী মানুষ। অনেকে এসিতে ঘুমের ওষুধ খেয়েও ঘুমাতে পারে না। দামি গাড়ি, বাড়ি, খাট-পালং আর অর্থ বৈভব দিয়ে সুখ আর তৃপ্তি পাওয়া যায় না। সুখটা অন্য এক রকম। অনেক অর্থের মধ্যে থেকেও মানুষ সুখী নয়; আবার অল্প অর্থে খুব সুন্দর সুখী জীবনযাপন করছেন অনেকে।
অনেকে ফুটপাত থেকে জামা কিনে তৃপ্ত। গায়ে জড়িয়ে ভাবেন কতইনা সুন্দর লাগছে তাকে। আবার একই জামা গায়ে চেপে চুলকানি বেড়ে যায়! ফুটপাত থেকে কেনা জামা ভেবে কুটকুট করছে গায়। চিত্তে শান্তি নেই। ভাবে এত কম দামি জামা কী ভাবছেই না জানি লোকে। ওই যে বলছিলাম, নিজ ভাবনাটার মধ্যেই সুখ অন্তর্নিহিত। সুখী হতে নিজেকে সুখী ভাবতে হয়। সুখ পেতে হয় নিজের কাছেই।
আমার বাবা-মাকে আমি কখনো শুধু আমাদের জন্য জীবন কাটাতে দেখিনি, তারা ছিলেন সবার জন্য। মানবিকতার এক জীবন্ত প্রতিমূর্তি ছিলেন তারা। মানুষের দুঃখ-কষ্ট ভাগ করে নেওয়া ছিল তাদের স্বভাবসিদ্ধ গুণ। বাবা বলতেন, “টাকায় সুখ কেনা যায় না, তবে অভাবী মানুষকে সহায়তা করে যে আনন্দ পাওয়া যায়, তা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুখ।” সত্যিই, এই উপলব্ধি তার জীবনকেই শুধু সমৃদ্ধ করেনি, আমাদের মধ্যেও সেই মহান শিক্ষার বীজ বুনে দিয়েছেন।
আমাদের ঈদ আনন্দ কখনো শুধু আমাদের পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাবা-মা সবসময় চেষ্টা করতেন আশপাশের অভাবী মানুষদের সাথে আনন্দ ভাগ করে নিতে। আমাদের ঘর ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত-চেনা-অচেনা অনেকেই আসতেন, সবাইকে স্নেহ-ভালোবাসায় আপন করে নিতেন তারা। নতুন জামা, মিষ্টি, ঈদের উপহার—এসব শুধু আমাদের জন্য নয়, যারা হয়তো স্বপ্নেও এসব কল্পনা করতে পারেনি, তাদের জন্যও ছিল সমানভাবে বরাদ্দ। বাবা-মা বিশ্বাস করতেন, ঈদের প্রকৃত আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। আমার বাবাকে আমি সবসময়ই দেখেছি ন্যায়-নীতির এক অবিচল পথিক হিসেবে। তার কাছে সত্য ছিল অমোঘ, ন্যায়বিচার ছিল জীবনের মূলমন্ত্র। পারিবারিক বা সামাজিক যে কোনো বিষয়ে তিনি ছিলেন নিরপেক্ষ এক বিচারক, যেখানে আবেগ নয়, ন্যায়ই ছিল তার একমাত্র বিবেচ্য বিষয়। বাবা-মা শুধু আমাদের শাসক ছিলেন না, ছিলেন পথপ্রদর্শকও। তারা শিখিয়েছেন, বড় হওয়া মানে শুধু বিত্তবান হওয়া নয়, বড় হওয়া মানে মানবিক হওয়া, উদার হওয়া, অন্যের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করা।
আমাদের পাঁচ ভাইবোন ছিলাম তাদের স্নেহের ছায়ায় শীতল, নির্ভার। মনে হতো, বাবা-মায়ের ভালোবাসার আলোয় আমাদের জীবনে কোনো অন্ধকার আসবে না। কিন্তু বিধির বিধান বদলায় না। বাবা চলে গেছেন, মা-ও হয়তো একদিন চলে যাবেন, কিন্তু তাদের দেখানো পথ, তাদের শিক্ষাগুলো আজও আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, এগিয়ে চলার শক্তি দেয়। সময় খুব বেশি হয়নি, তবুও মনে হয়, শত বছর পেরিয়ে গেছে বাবাকে দেখি না। আমাদের চারপাশে সব আছে, কিন্তু এক অপার শূন্যতা যেন আমাদের ঘিরে রেখেছে। তবু আমরা জানি, বাবা-মা আমাদের মাঝে আছেন, তাদের মূল্যবোধ, শিক্ষা আর ভালোবাসার মধ্যে। আমরা সেই আলোতেই পথ চলছি, আগামীতেও চলব…
সত্যিই, জীবনের আনন্দ ও সুখ আমাদের আশেপাশেই ছড়িয়ে আছে, শুধু খুঁজে নেওয়ার দৃষ্টিটা থাকতে হয়। অল্পতে সুখী হওয়ার আর সবাইকে নিয়ে সুখী হওয়ার অভ্যাসটাই পারে জীবনকে সুন্দর ও পরিপূর্ণ করে তুলতে। আসুন আমরা সবাইকে নিয়ে ঈদ আনন্দ উপভোগ করি। ঈদ মোবারক!
লেখক : মীর আব্দুল আলীম, সাংবাদিক, সমাজ গবেষক, মহাসচিব-কলামিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ।