• শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:১৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম
বিশ্বকাপ খেলতে ইরানকে নতুন শর্ত যুক্তরাষ্ট্রের কর্ণফুলী বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৪টি ইউনিট বন্ধ বিরোধীরা অরাজকতা করলে রাজপথে মোকাবিলার হুঁশিয়ারি বিএনপির রাজশাহীতে কলেজে ঢুকে নারী শিক্ষককে মারধরের ঘটনায় বিএনপি নেতা বহিষ্কার যারা দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়, তারা যে–ই হোক ছাড় দেয়া হবে না: অর্থমন্ত্রী উত্তরায় বারে পুলিশের অভিযান, আটক অন্তত ১৪০ জন ঢাবিতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, অভিযোগ ছাত্রদলের বিরুদ্ধে, গ্রেপ্তার দাবি দুঃখপ্রকাশ করে যা বললেন ছাত্রদল সভাপতি রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর পার হলেও বিচার শেষ হয়নি হাজার শ্রমিক হত্যার রাজশাহীতে কলেজে ঢুকে শিক্ষিকাকে জুতাপেটা করলেন নেতা

বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের প্রধান গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র

প্রভাত রিপোর্ট / ৮০৩ বার
আপডেট : শনিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৫

প্রভাত রিপোর্ট: দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের প্রধান গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। কোনো কোনো বছর জার্মানি শীর্ষস্থানে ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের গত অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮৬৯ কোটি ডলার, যা দেশের মোট রপ্তানির ১৮ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরের চেয়ে রপ্তানি বাড়ে ১৪ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৭৬০ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি তালিকায় প্রধান পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাকের ওভেন, অর্থাৎ শার্ট-প্যান্ট জাতীয় পোশাক। ওভেন পোশাকের রপ্তানি ছিল ৪৯৫ কোটি ডলার। দেশটিতে বাংলাদেশের মোট রপ্তানিতে ওভেনের অংশ ২৭ শতাংশ। তৈরি পোশাকের নিট ক্যাটেগরির পণ্য অর্থাৎ গেঞ্জি ও সোয়েটার জাতীয় পণ্যের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৬০ কোটি ডলার। নিটওয়্যারে অংশ ১২ শতাংশ। অন্য পণ্যের মধ্যে ক্যাপ বা টুপি জাতীয় পণ্য গেছে ২৬ কোটি ডলারের। হোমটেক্সটাইল রপ্তানি হয় ১৭ কোটি ১৬ লাখ ডলারের।
২৭ জাতির জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশ জার্মানি বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের দ্বিতীয় প্রধান গন্তব্য। গত অর্থবছর দেশটিতে ৫২৯ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়, যা বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ১০ দশমিক ৯৬ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের মতো জার্মানিতে ওভেন প্রধান পণ্য নয়। দেশটিতে নিট পোশাক বেশি যায়। গত অর্থবছর নিট পণ্যের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩০৬ কোটি ডলার। ওভেন পোশাকের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৮৯ কোটি ডলার। জার্মানিতে অন্য বড় পণ্যের তালিকায় রয়েছে হোমটেক্সটাইল, ক্যাপ ইত্যাদি। সব মিলিয়ে গত অর্থবছর রপ্তানি বেশি হয় আগের অর্থবছরের চেয়ে ৯ দশমিক ১১ শতাংশ।
বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের তৃতীয় প্রধান গন্তব্য যুক্তরাজ্য। ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি ইইউ জোট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বের হয়ে যায় যুক্তরাজ্য, যাকে ব্রেক্সিট বলা হয়। একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের তৃতীয় প্রধান রপ্তানি বাজার যুক্তরাজ্যে গত অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪৬২ কোটি ২৭ লাখ ডলার। এতে রপ্তানিতে দেশটির হিস্যা দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ। অন্যান্য দেশের মতো সে দেশে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক। পোশাকের নিট ক্যাটেগরির রপ্তানির পরিমাণ ২৬৬ কোটি ডলারের মতো। ওভেনের পরিমাণ ১৬৯ কোটি ডলার। পোশাকবহির্ভূত অন্য পণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বাইসাইকেল, হোমটেক্সটাইল ইত্যাদি। গত বছর দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি আগের অর্থবছরের চেয়ে ৩ দশমিক ২৩ শতাংশ বেড়েছে। আগের অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৪৮ কোটি ডলার।
বাংলাদেশের পণ্যের চতুর্থ শীর্ষ রপ্তানি বাজার স্পেন। গত অর্থবছর দেশটিতে রপ্তানি আয়ের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৫৫ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের কিছু বেশি। এই আয় বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ। স্পেনেও নিটওয়্যার পণ্যের চাহিদা বেশি। গত অর্থবছর নিট পণ্যের রপ্তানি আয় ছিল ১৯৫ কোটি ডলারের মতো। ওভেনের ছিল ১৪৫ কোটি ডলার। হোমটেক্সটাইল রপ্তানি হয় ৪ কোটি ডলার। চামড়া ও চামড়া পণ্য এবং পাদুকা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রপ্তানি হয়ে থাকে। আগের অর্থবছরের চেয়ে গত অর্থবছর রপ্তানি বেড়েছে ২ দশমিক ৩২ শতাংশ। ওই অর্থবছর রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩৪৭ কোটি ডলার।
ইইউ জোটের অপর দেশ ফ্রান্স বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের পঞ্চম শীর্ষ বাজার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৪২ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি হয় দেশটিতে, যা মোট রপ্তানি আয়ের ৫ শতাংশ। ফ্রান্সে বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান পণ্য হলো নিটওয়্যার। গত অর্থবছর নিট পোশাকের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৩২ কোটি ডলারের কিছু বেশি। ওভেন পণ্যে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪৩ কোটি ৪৯ লাখ ডলার। পোশাকবহির্ভূত অন্য পণ্যের মধ্যে হোমটেক্সটাইল রপ্তানি হয় ৯ কোটি ডলারের মতো। ফুটওয়্যার বা পাদুকা রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ১২ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের চেয়ে গত অর্থবছর দেশটিতে রপ্তানি বেড়েছে ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছর রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২২৮ কোটি ডলার।
নেদারল্যান্ডস বাংলাদেশের ষষ্ঠ প্রধান রপ্তানি বাজার। গত অর্থবছর দেশটিতে ২৩৫ কোটি ৪২ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়, যা ওই অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এই আয় আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৯৩ কোটি ৪১ লাখ ডলার। নেদারল্যান্ডসে রপ্তানি হওয়া প্রধান প্রধান পণ্যের মধ্যে নিট পোশাক, ওভেন পোশাক, হোমটেক্সটাইল, ফুটওয়্যার উল্লেখযোগ্য।
ইতালি বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের সপ্তম প্রধান আমদানিকারক দেশ। গত অর্থবছর দেশটিতে যায় ১৬৬ কোটি ৪৫ লাখ ডলারের বিভিন্ন পণ্য। এই আয় বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ। রপ্তানি পণ্যের মধ্যে প্রধান হলো নিটওয়্যার। রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৯৬ কোটি ডলার। অন্যদিকে ওভেন পোশাকের রপ্তানির পরিমাণ ৫৮ কোটি ডলার। উল্লেখযোগ্য অন্য পণ্যের মধ্যে রয়েছে হোমটেক্সটাইল, চামড়া-চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা । আগের অর্থবছরের চেয়ে রপ্তানি বেশি হয়েছে ৪ দশমিক ৩২ শতাংশ।
বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের প্রচলিত বাজার কানাডা। রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে দেশটির অবস্থান অষ্টম। গত অর্থবছর বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৩ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ এসেছে কানাডা থেকে। পরিমাণ ছিল ১৪৬ কোটি ৩৭ লাখ ডলার। এই আয় আগের অর্থবছরের চেয়ে ১১ দশমিক ২৬ শতাংশ বেশি। ওই অর্থবছর রপ্তানির মোট পরিমাণ ছিল ১৩২ কোটি ডলারের মতো। রপ্তানি তালিকার প্রধান পণ্যের মধ্যে রয়েছে নিট পোশাক, ওভেন গার্মেন্টস, হোমটেক্সটাইল ইত্যাদি।
জাপান বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের নবম প্রধান বাজার। এশিয়ার মধ্যে প্রথম। গত অর্থবছর জাপানে রপ্তানির মোট পরিমাণ ছিল ১৪১ কোটি ডলারের কিছু বেশি, যা ওই অর্থবছর বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ২ দশমিক ৯২ শতাংশ। আগের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের চেয়ে রপ্তানি বেশি হয়েছে ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। ইউরোপের দেশের মতো জাপানেও প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাকের নিট ও ওভেন। এরপরে চামড়া পণ্য, পাদুকা ইত্যাদি।
ইইউ জোটভুক্ত দেশ বেলজিয়াম বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের দশম রপ্তানি বাজার। গত অর্থবছর দেশটিতে রপ্তানি হয় ৭৩ কোটি ডলারের পণ্য। এই আয় বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ১ দশমিক ৫১ শতাংশ। আগের অর্থবছরের চেয়ে বেলজিয়ামে রপ্তানি বেশি হয়েছে ১১ শতাংশের মতো। ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো বেলজিয়ামেও রপ্তানি তালিকার প্রধান প্রধান পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাকের নিট পণ্য, ওভেন হোমটেক্সটাইল পণ্য। এর বাইরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয় দেশটিতে।
রপ্তানি বাণিজ্যে কিছু দেশের ওপর অতিনির্ভরতা দীর্ঘদিন ধরে। এ কারণে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের রপ্তানি খাত। কেননা বড় দু-একটি বাজারে কোনো কারণে সংকট তৈরি হলে সার্বিকভাবে রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে উদ্বেগ তার বড় প্রমাণ।
তথ্য-উপাত্ত বলছে, বাজার বৈচিত্র্যের আলোচনা বছরের পর বছর চললেও নির্দিষ্ট বাজারনির্ভরতা কমছে না, বরং বাড়ছেই। ঘুরেফিরে যুক্তরাষ্ট্র এবং ২৭ জাতির জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) নিরঙ্কুশ নির্ভরতা রয়েই গেছে। রপ্তানি আয়ের বিবেচনায় একক রাষ্ট্র হিসেবে বরাবরের মতো যুক্তরাষ্ট্রই রয়েছে শীর্ষে। একক দেশ হিসেবে ইইউর ছয়টি দেশ এবং যুক্তরাজ্য রয়েছে শীর্ষ ১০ রপ্তানি বাজারের তালিকায়। ইউরোপ, আমেরিকার বাইরে আছে কানাডা এবং এশিয়ার বড় অর্থনীতি জাপান। যদিও বিশ্বের দেড় শতাধিক দেশে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি হয়ে থাকে। এসব দেশ থেকে মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে। অন্যদিকে সব দেশেই প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক।
ঐতিহাসিক প্রবণতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ বেশি উৎপাদন করে এমন পণ্যের চাহিদা যেসব দেশে বেশি, সেখানে রপ্তানি বাড়ছে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট পণ্য নির্ভরতার কারণে বাজারেও বৈচিত্র্য আনা সম্ভব হচ্ছে না। ইউরোপ-আমেরিকায় রপ্তানি বেড়ে চলার যা প্রধান কারণ। অন্য কারণের মধ্যে রয়েছে রপ্তানিকারকদের অভ্যস্ততা। যেসব দেশের ব্র্যান্ড-ক্রেতাদের সঙ্গে একটা ভালো বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে সরে আসতে চান না তারা। বিজিএমইএর একজন সাবেক সভাপতির কারখানা প্রতিষ্ঠার পর থেকে ৫০ বছর ধরে শুধু ব্রিটিশ একটি ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠানের পোশাক সরবরাহ করে আসছে। এ রকম উদাহরণ অসংখ্য।
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো দেশের বাজারে অতি নির্ভরতা থাকলে এক ধরনের দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। কোনো কারণে সে দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সমস্যা হলে রপ্তানিতে কমে যেতে পারে, এমনকি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আবার কোনো দেশের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলেও একই পরিণতি হতে পারে। আমদানিকারক দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অর্থনৈতিক মন্দার কারণেও রপ্তানি কমে যেতে পারে। অতিমারি করোনা সাম্প্রতিককালের এ ধরনের বড় উদাহরণ। করোনার অভিঘাত হিসেবে ইউরোপ, আমেরিকায় অর্থনৈতিক মন্দা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে স্থানীয়দের ভোগক্ষমতা কমে যাওয়ার উদাহরণও খুব বেশি দিন আগের নয়। এসব কারণে বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে পণ্য এবং বাজার বৈচিত্র্য সৃষ্টির তাগিদ দিচ্ছেন।


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও