প্রভাত রিপোর্ট: যাত্রীচাহিদা মেটাতে মেট্রোরেল রাত ১০টার পরও চলবে। সকালে চালু হবে আরও আগে; অর্থাৎ সকালে চালু ও রাতে বন্ধের সময় আধঘণ্টা করে বাড়বে। এ ছাড়া এখন দুই ট্রেনের মধ্যে বিরতি আরও দুই মিনিট কমে যাবে। এর অর্থ, ব্যস্ত সময়ে (পিক আওয়ারে) সোয়া ৪ মিনিট পরপর ট্রেন পাওয়া যাবে। বর্তমানে ব্যস্ত সময়ে সর্বনিম্ন ছয় মিনিট পরপর ট্রেন চলাচল করে।
এদিকে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে মেট্রোরেল। দ্রুত ও আরামদায়ক যাতায়াতের জন্য এটি সাধারণ মানুষের অন্যতম ভরসায় পরিণত হয়েছে। তবে স্টেশনগুলোর আশপাশের অব্যবস্থাপনা এখন যাত্রীদের নতুন ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে, মিরপুর-১০ ও ১১, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে ফুটপাত, মূল সড়কে অবৈধ দোকানপাট এবং রিকশার জটলা নিয়মিত যানজট তৈরি করছে। এতে পথচারী ও যাত্রীদের চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, স্টেশনের নিচে ও সিঁড়ির মুখে ভ্রাম্যমাণ দোকান বসানো হয়েছে। চা-কফি থেকে শুরু করে ফাস্টফুড ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিক্রির এসব দোকান ফুটপাতের বড় অংশ দখল করে রেখেছে। হাঁটার জায়গা সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় পথচারীদের মূল সড়কে নামতে হচ্ছে, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
মেট্রোরেল থেকে নেমে গন্তব্যে পৌঁছাতে যাত্রীদের ভরসা রিকশা ও সিএনজি বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। কিন্তু এসব যানবাহন স্টেশনগুলোর নিচে বিশৃঙ্খলভাবে দাঁড়িয়ে থাকায় তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম যানজট। বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত রিকশা বেশি বিশৃঙ্খলা তৈরি করে সড়কে। অনেক সময় মূল সড়কের মাঝখানেই যাত্রী ওঠানামা করানো হয়, এতে চলাচল আরও ব্যাহত হয়।
নতুন এই ব্যবস্থা কার্যকর হবে সপ্তাহ দুই পর। নতুন ব্যবস্থা আয়ত্ত করতে শুক্রবার থেকে পরীক্ষামূলক চলাচল করা হবে। দুই সপ্তাহ পরীক্ষার পর আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন সময়সূচি মেনে মেট্রোরেল চলাচল করবে। তবে পরীক্ষামূলকভাবে চলার সময়ও সকাল ও রাতের বাড়তি সময়ে চলাচলকারী ট্রেনগুলোতে যাত্রী পরিবহন করা হবে; অর্থাৎ খালি ট্রেন চালানো হবে না।
ঢাকায় মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। কোম্পানির সূত্র জানায়, নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে মেট্রোরেলের সক্ষমতার পূর্ণ সদ্ব্যবহারের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। বর্তমানে মেট্রোরেলে দৈনিক যাত্রী যাতায়াত করে গড়ে ৪ লাখ ২০ হাজার। এর মধ্যে গত ৬ আগস্ট সর্বোচ্চ যাত্রী পরিবহন হয়, ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৭৪৬। নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে যাত্রীসংখ্যা পাঁচ লাখ ছাড়াবে বলে কর্তৃপক্ষ মনে করছে।
মেট্রোরেল প্রকল্প নেয়ার সময় উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত দৈনিক পাঁচ লাখ যাত্রী পরিবহন করার কথা বলা হয়েছিল। মেট্রোরেল কমলাপুর পর্যন্ত চালু হলে দৈনিক যাত্রীসংখ্যা ৬ লাখ ৭৭ হাজারে উন্নীত হওয়ার কথা।
ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফারুক আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, যাত্রীচাহিদা মেটাতে ট্রেনের সংখ্যা ও সময় বাড়ানোর চিন্তা অনেক দিন ধরেই ছিল, কিন্তু লোকবলের কারণে করা যাচ্ছিল না। এখন তারা প্রস্তুত। নতুন সূচিতে শিগগিরই যাত্রী নিয়ে মেট্রোরেল চলাচল করবে। এতে যাত্রীর সংখ্যা ও আয়—দুটিই বাড়বে। সাধারণ মানুষের ট্রেনের জন্য বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে না। সড়কের ওপরও চাপ কমবে।
বর্তমানে সপ্তাহে (শনি থেকে বৃহস্পতিবার) উত্তরা থেকে প্রথম ট্রেন ছাড়ে সকাল ৭টা ১০ মিনিটে। দুই সপ্তাহ পর নতুন সূচিতে চলাচল শুরু হলে উত্তরা থেকে প্রথম ট্রেন ছাড়বে ভোর ৬টা ৪০ মিনিটে। বর্তমানে উত্তরা থেকে সর্বশেষ ট্রেন ছাড়ে রাত ৯টায়। নতুন সূচি অনুযায়ী, উত্তরা থেকে সর্বশেষ ট্রেন ছাড়বে রাত সাড়ে ৯টায়। অন্যদিকে মতিঝিল থেকে সকালে প্রথম ট্রেন ছাড়ে সকাল সাড়ে ৭টায়। নতুন সূচিতে মতিঝিল থেকে প্রথম ট্রেন ছাড়বে সকাল ৭টায়। এ ছাড়া রাতে মতিঝিল থেকে সর্বশেষ ট্রেন ছাড়ে রাত ৯টা ৪০ মিনিটে। নতুন সূচি অনুসারে, মতিঝিল থেকে সর্বশেষ ট্রেন ছাড়বে রাত ১০টা ১০ মিনিটে। মতিঝিল থেকে ছাড়া সর্বশেষ ট্রেনটি এখন উত্তরা উত্তর স্টেশনে পৌঁছায় রাত ১০টার পর। এখন শেষ যাত্রী নামবে পৌনে ১১টার দিকে। এ ছাড়া শুক্রবার বেলা ৩টা থেকে মেট্রোরেলের চলাচল শুরু হয়। নতুন সূচিতে শুক্রবার বেলা আড়াইটায় মেট্রোরেল চলাচল শুরু হবে। রাতেও আধা ঘণ্টা চলাচলের সময় বাড়বে।
মেট্রোরেলের সময়সূচিতে ব্যস্ত সময় (পিক আওয়ার) এবং কম ব্যস্ত সময় (অফ পিক আওয়ার) কয়েক ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এ ছাড়া শনিবার এবং অন্যান্য সরকারি বন্ধের দিনও পিক ও অফ পিক আওয়ারের সময়ের হেরফের আছে। তবে এখন সর্বনিম্ন ছয় মিনিট পর ট্রেন চলাচল করে। নতুন সূচি চালু হলে পিক আওয়ারে সর্বনিম্ন ৪ মিনিট ১৫ সেকেন্ড পরপর ট্রেন চলাচল করবে। এর বাইরে ৮ ও ১০ মিনিটের ব্যবধানে যে সময় ট্রেন চলাচল করত, সেই সময়গুলোতেও দুই মিনিট করে কমে আসবে। মেট্রোরেলের প্রকল্প নেয়ার সময় বলা হয়েছিল, পিক আওয়ারে সর্বনিম্ন সাড়ে ৩ মিনিট পরপর মেট্রোরেল চলবে।
ডিএমটিসিএল সূত্র বলছে, মেট্রোরেলের লাইন-৬; অর্থাৎ উত্তরা থেকে মতিঝিল পথের জন্য ২৪ সেট ট্রেন রয়েছে। তবে সার্বক্ষণিক লাইনে চলাচল করে ১৩ সেট ট্রেন। তিন সেট ট্রেন বিশেষ প্রয়োজনে লাগতে পারে, এই বিবেচনায় প্রস্তুত রাখা হয়। লাইন ও সংকেত ব্যবস্থা পুরোপুরি ঠিক আছে কি না, তা যাচাই করার জন্য সকালে একটি ট্রেন যাত্রী ছাড়াই চলে। বাকি সাত সেট ট্রেন অব্যবহৃত থাকে। নতুন সময়সূচি কার্যকর হলে ২০ সেট ট্রেন ব্যবহৃত হবে, এতে ট্রেন অলস পড়ে থাকা কমবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে দিনে ২৩৭ বার ট্রেন চলাচল (ট্রিপ) করে। নতুন সূচিতে প্রতিটি ট্রেনের মধ্যে সময়ের ব্যবধান গড়ে দুই মিনিট করে কমে যাবে। এতে ট্রেন চলাচলের সংখ্যা আরও বাড়বে।
অব্যবহৃত মেট্রোরেলের সেটের ব্যবহার কীভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছিল ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ। প্রথমে অব্যবহৃত ট্রেনের সেট থেকে দুটি কোচ এনে জোড়া দিয়ে চালানোর পরিকল্পনা করা হয়। বর্তমানে প্রতিটি সেটে ছয়টি কোচ রয়েছে। প্রকল্প নেওয়ার সময় দুই কোচ বাড়ানো যাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কারিগরিভাবে দুরূহ এবং নতুন করে বাড়তি বিনিয়োগ করতে হবে। ফলে এই চিন্তা থেকে সরে আসে কর্তৃপক্ষ। এর বদলে ট্রেন চলাচলের সময় এবং দুই ট্রেনের মধ্যে সময়ের ব্যবধান কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়। এর জন্য বাড়তি লোকবলের দরকার। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে লোকবল নিয়োগ এবং তাঁদের প্রশিক্ষণও দিয়েছে।
২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রথম মেট্রোরেল চালু হয়। শুরুতে চলাচল করত উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত। পর্যায়ক্রমে স্টেশনের সংখ্যা বেড়েছে। মতিঝিল পর্যন্ত সব স্টেশনে যাত্রী ওঠা-নামা শুরু হয় ২০২৩ সালের শেষ দিনে। এখন কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল সম্প্রসারণের কাজ চলছে। ২০১২ সালে অনুমোদনের সময় মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় ছিল ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। জাপানের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার কাছ থেকে ১৯ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা ঋণ নেয়া হয়েছে।
যাত্রীরা দাবি করেছেন, মেট্রোরেল চালুর ফলে ঢাকার গণপরিবহনে স্বস্তি ফিরেছে। তবে স্টেশনগুলোর আশপাশে প্রশাসনের উদাসীনতায় অবৈধ দোকান ও রিকশার জটলা যাত্রী ভোগান্তির বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিশৃঙ্খলার পেছনে প্রধান কারণ কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা। নিয়মিত যানবাহনের জটলা হলেও সিটি করপোরেশন বা ট্রাফিক পুলিশের কার্যকর উদ্যোগ নেই। মাঝে মধ্যে অভিযান চালানো হলেও এতে স্থায়ী সমাধান হয়নি।
ভুক্তভোগী যাত্রীদের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষ কেবল লোক দেখানো অভিযান চালায়। অভিযান শেষ হলে রিকশা ও সিএনজি আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে। এতে সমস্যা থেকেই যাচ্ছে।
এদিকে স্টেশনের আশপাশে যাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো পার্কিং বা অপেক্ষার স্থান নেই। ফলে রিকশা ও সিএনজিগুলো ফুটপাতে বা রাস্তার ওপর ভিড় জমাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ট্রাফিকের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা। তারা জানিয়েছেন, কর্তৃপক্ষ বিকল্প পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করতে পারলে এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান সম্ভব।
মেট্রোরেলের নিচে অব্যবস্থাপনা নিয়ে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) পরিচালক (প্রশাসন) এ কে এম খায়রুল আলম বলেন, ‘আমাদের বর্তমানে চারজন ম্যাজিস্ট্রেট আছেন। ইতিমধ্যেই বিজয়স্মরণী, শাহবাগ, বিশ্ববিদ্যালয়, উত্তরা উত্তর ও উত্তরা সেন্টার স্টেশনে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু উচ্ছেদ করে আসতে না আসতেই আবার লোকজন বসে যায়।’