প্রভাত ডেস্ক: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ তাঁর আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতির মধ্য দিয়ে শুরুটা হচ্ছে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ও তাঁর স্ত্রীকে শনিবার শেষ রাতে তাঁদের সুরক্ষিত প্রাসাদ থেকে তুলে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁকে বন্দী করে এবং তাঁর বিরুদ্ধে কথিত অভিযোগে মামলার বিচার শুরুর মাধ্যমে ট্রাম্প তাঁর আগের দেওয়া হুমকির বাস্তবায়ন করেছেন।
এই অভিযানের বর্ণনা দিতে গিয়ে ট্রাম্প ১৮২৩ সালের পুরোনো ‘মনরো ডকট্রিন’ বা পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের নীতিকে নতুন করে সামনে এনেছেন। নতুন করে এর নাম দিয়েছেন ‘ডনরো ডকট্রিন’।
যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালানোর পর ট্রাম্প একের পর এক দেশকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর আক্রমণাত্মক আচরণ থেকে নতুন করে আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে, আবার তিনি কোন দেশে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তিনি যেসব দেশকে হুমকি দিয়েছেন, সেটা নিয়ে আলোচনা করা যাক।
গ্রিনল্যান্ড: ইউরোপের দেশ ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের আগে থেকেই একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এখন ট্রাম্প পুরো দ্বীপই দখল করতে চান। সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আমাদের গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন।’ কারণ হিসেবে তিনি দাবি করেন, ওই অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের জাহাজ সব জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।
ডেনমার্কের অধীন থাকা বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপটি বিরল খনিজ সম্পদে ভরপুর, যা স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও সামরিক সরঞ্জাম তৈরির জন্য অপরিহার্য। বর্তমানে এই সম্পদের বাজারে চীনের আধিপত্য বেশি।
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই পরিকল্পনাকে একটি ‘কল্পনা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেনও স্পষ্ট করে বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে চায় না। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ন্যাটোর কোনো সদস্যদেশে সামরিক হামলা চালায়, তবে সব সম্পর্ক ছিন্ন হবে।
কলম্বিয়া: ভেনেজুয়েলায় বিতর্কিত অভিযান চালিয়ে নিকোলা মাদুরোকে তুলে নেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর ডোনাল্ড ট্রাম্প কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে হুমকি দিয়ে বলেছেন, তিনি যেন নিজের দিকে খেয়াল রাখেন।
কলম্বিয়া বিপুল তেল ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এবং এটি কোকেন ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র। গত সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে আসছে, তারা ক্যারিবিয়ান সাগরে মাদকের নৌযান আটকাচ্ছে। ট্রাম্পের অভিযোগ, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট পেত্রো মাদক কারবারিদের বাড়বাড়ন্তে সাহায্য করছেন।
ট্রাম্প কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট পেত্রোকে একজন ‘অসুস্থ মানুষ’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, কলম্বিয়াতেও ভেনেজুয়েলার মতো সামরিক অভিযান চালানো হতে পারে। অথচ ঐতিহাসিকভাবে কলম্বিয়া মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের অব্যাহত হুমকির মুখে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো প্রয়োজনে আবারও অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক দীর্ঘ বার্তায় পেত্রো বলেন, ‘আমি শপথ নিয়েছিলাম আর কখনো অস্ত্র ছুঁয়ে দেখব না…কিন্তু মাতৃভূমির প্রয়োজনে আমি আবারও অস্ত্র হাতে তুলে নেব।’
ইরান: ইরানে বর্তমানে সরকারবিরোধী বড় ধরনের বিক্ষোভ চলছে। ট্রাম্প ইরান সরকারকে হুমকি দিয়ে বলেছেন, সরকার যদি বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালিয়ে আরও আন্দোলনকারীদের হত্যা করে, তবে ইরানকে ‘কড়া আঘাত’ করবে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও ইরান ট্রাম্পের নতুন ‘ডনরো ডকট্রিন’-এর ভৌগোলিক সীমানার বাইরে, তবু গত বছর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর ট্রাম্প আরও পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়ে রেখেছেন।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় ইসরায়েলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে ২০২৬ সালে ইরানে নতুন করে হামলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
মেক্সিকো: ট্রাম্পের রাজনীতি শুরুই হয়েছিল মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তৈরির ঘোষণা দিয়ে। ২০২৫ সালে আবার ক্ষমতায় ফেরার প্রথম দিনেই তিনি একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন, যার মাধ্যমে ‘মেক্সিকো উপসাগর’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘আমেরিকা উপসাগর’ রাখা হয়।
ট্রাম্প মনে করেন, মেক্সিকো মাদক ও অবৈধ অভিবাসীদের ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে। তিনি বলেছেন, মেক্সিকোর মাদক কারবারিরা অনেক শক্তিশালী এবং তাদের বিরুদ্ধে কিছু একটা করতেই হবে। তবে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেনাবাউম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা নিজেদের মাটিতে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করবেন না।
কিউবা: ফ্লোরিডা থেকে মাত্র ৯০ মাইল দূরে অবস্থিত কিউবা দীর্ঘকাল ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আছে। দেশটি ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলা মাদুরোর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। ট্রাম্প মনে করেন, কিউবায় সামরিক অভিযানের কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, দেশটি এমনিতেই পতনের মুখে। কিউবা তাদের তেলের প্রায় ৩০ শতাংশ ভেনেজুয়েলা থেকে পেত। এখন মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় কিউবার জ্বালানি সরবরাহ এবং অর্থনীতি ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কিউবান বংশোদ্ভূত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট যখন কিছু বলেন, তখন সেটা গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া উচিত।’