প্রভাত বিনোদন : গত ৫ ডিসেম্বর মুক্তির পর থেকেই বক্স অফিসে ঝড় তুলেছে আদিত্য ধরের সিনেমা ‘ধুরন্ধর’। এ পর্যন্ত আয় করেছে হাজার কোটি রুপির বেশি। তবে বাণিজ্যিক সাফল্য পেলেও সিনেমাটি নিয়ে ভারত ও পাকিস্তান—দুই দেশেই চলছে প্রবল বিতর্ক।
সিনেমার কাহিনি: সাড়ে তিন ঘণ্টার বেশি দৈর্ঘ্যের ‘ধুরন্ধর’ সিনেমাটি তৈরি হয়েছে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র–এর পাকিস্তানে চালানো এক অপারেশনকে কেন্দ্র করে। গত ডিসেম্বরে এটি মুক্তি পেয়েছে এমন সময়, যখন কয়েক মাস আগে পেহেলগাম (কাশ্মীর) অঞ্চলে বিদ্রোহী হামলার পর ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছিল। ভারত হামলার দায় পাকিস্তানের ওপর চাপিয়েছিল, কিন্তু ইসলামাবাদ এটি অস্বীকার করেছে। ‘ধুরন্ধর’ সিনেমায় অভিনয় করেছেন রণবীর সিং, সঞ্জয় দত্ত, অক্ষয় খান্না, আর মাধবন, অর্জুন রামপালের মতো তারকারা।
পাকিস্তানে বিতর্ক: ভারত-পাকিস্তানের দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তেজনার পরও, পাকিস্তানে বলিউড সিনেমা এখনো জনপ্রিয়। তবে ‘ধুরন্ধর’-এ পাকিস্তানকে চরম শত্রু হিসেবে দেখানো হয়েছে, বিশেষ করে করাচি শহরের লিয়ারি অঞ্চলের ছবি নিয়ে সমালোচনা হয়েছে।
লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেসের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক নিদা কিরমানি বলেন, ‘সিনেমায় করাচিকে দেখানো হয়েছে সম্পূর্ণ কল্পনার ওপর ভিত্তি করে। এটি শহরটিকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করে না। লিয়ারিতে ঘটে যাওয়া আংশিক সহিংসতা পৃথিবীর অন্য মেগাসিটির মতোই ছিল, কিন্তু পুরো শহরকে শুধুই সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত করা ভুল।’
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর ছবি এবং নেতাদের ‘সন্ত্রাসী সমর্থক’ হিসেবে দেখানো নিয়ে পাকিস্তান পিপলস পার্টির একজন সদস্য আদালতে মামলা করেছেন।
কিরমানি আরও বলেন, ‘সিনেমার নির্মাতারা ইতিহাসের চরিত্রগুলোকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করেছেন, ভারতীয় জাতীয়তাবাদী ন্যারেটিভে ফ্রেম করার জন্য।’
মুম্বাইভিত্তিক চলচ্চিত্র সমালোচক মায়াংক শেখর বলেন, ‘সিনেমাটি এমনভাবে তৈরি হয়েছে, যাঁরা কখনো করাচিতে যাননি, হয়তো কখনো যাবেনও না। পুরো শহর যেন ধুলাবালুর মধ্যে, অপ্রশস্ত, বিস্ফোরিত এবং পরিত্যক্ত। এটি হলো হলিউডের স্টাইল, যেমন “এক্সট্রাকশন” সিনেমা ঢাকা শহরকে দেখায়।’
‘ধুরন্ধর’ ভারতে বাণিজ্যিকভাবে বড় সফলতা পেয়েছে, ভারতীয় প্রবাসী দর্শকদের মধ্যে জনপ্রিয়। তবে সমালোচনা এড়ায়নি।
ভারতীয় সেনা অফিসার মেজর মোহিত শর্মার পরিবার দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন করেছে, তাদের অভিযোগ—সিনেমাটি তাঁর জীবন ও কাজের অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করেছে। নির্মাতারা দাবি করেছেন, এটি সম্পূর্ণ কল্পকাহিনি। কিন্তু সিনেমার গল্পে বাস্তব হামলার অডিও রেকর্ডিং ও নিউজ ফুটেজ ব্যবহৃত হয়েছে, যা আরও বাস্তবতার ছোঁয়া যোগ করেছে।
বলিউডের নতুন ধারা? শেখর বলেন, ‘সুপারহিরোর মতো অতি পুরুষতান্ত্রিক নায়ক—বলিউডে নতুন নয়। ১৯৭০-এর দশকের “অ্যাংরি ইয়াং ম্যান”-এর ধারা মনে পড়ে।’
সম্প্রতি বলিউডের প্রধান প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো এমন গল্পপটকে মনোযোগ দিচ্ছে, যা সংখ্যালঘুদের নেতিবাচকভাবে দেখায় এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী নীতির সঙ্গে মিলে যায়। কিরমানি বলেন, ‘সীমান্তের মুসলিমরা এবং ভারতীয় মুসলিমরা প্রায়ই “সন্ত্রাসী” হিসেবে উপস্থাপিত হয়, যা তাদের সাংস্কৃতিকভাবে আরও প্রান্তিক করে।’
প্রধানমন্ত্রী মোদিও সম্প্রতি একটি সিনেমা ‘আর্টিকেল ৩৭০’-কে প্রশংসা করেছেন। সমালোচকেরা বলছেন, সিনেমাটি প্রচারণামূলক। অন্য একটি সিনেমা ‘কেরালা স্টোরি’ ২০২৩ সালে মুক্তি পেয়েছিল, যা সমালোচকদের মতে তথ্য বিকৃত করেছে।
‘ধুরন্ধর’ সমালোচকেরা অনলাইনে হেনস্তার সম্মুখীন হয়েছেন। অনুপমা চোপড়ার একটি রিভিউ ইউটিউব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভারতের ফিল্ম ক্রিটিকস গিল্ড এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘সমালোচকদের ওপর সমন্বিত আক্রমণ, ব্যক্তিগত হেনস্তা এবং তাঁদের পেশাগত সততা ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা হচ্ছে। আরও উদ্বেগজনকভাবে রিভিউতে হস্তক্ষেপ এবং সম্পাদকীয় অবস্থান প্রভাবিত করার চেষ্টা হচ্ছে।’ ছবিটি মুক্তির পর নানা বিতর্ক হলেও এখন পর্যন্ত নির্মাতা বা প্রধান অভিনয়শিল্পীরা মুখ খোলেননি।
আল–জাজিরা অবলম্বনে