প্রভাত অর্থনীতি: এবছরের গ্রীষ্মকালে সম্ভাব্য লোডশেডিং এড়াতে এবং পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর বড় অংকের আর্থিক বোঝা চাপিয়ে না দিতে, অন্তর্বর্তী সরকার বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অপরিশোধিত ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি বকেয়া বিল পরিশোধের উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, বকেয়া পরিশোধের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সোমবারও বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া নিষ্পত্তি নিয়ে অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে একটি বৈঠক হয়েছে।
উপদেষ্টা জানান, বিদ্যুৎ খাতে জমে থাকা দায় দ্রুত পরিশোধের লক্ষ্যেই কাজ করছে বর্তমান সরকার, যাতে নির্বাচিত সরকারকে শুরুতেই এই চাপ মোকাবিলা করতে না হয়। তবে খাতসংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলছেন, ভর্তুকির সীমাবদ্ধতা ও আর্থিক চাপের কারণে দীর্ঘদিনের অর্থ পরিশোধ বিলম্বিত হওয়ায় বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জ্বালানি আমদানির সক্ষমতা ইতোমধ্যেই সংকুচিত হয়ে পড়েছে, যা সরবরাহ মার্জিন কম থাকা অবস্থায় বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
এই ঝুঁকি সবচেয়ে তীব্র হয়ে উঠেছে এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এস এস আই পাওয়ার লিমিটেডে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। প্রতিষ্ঠানটি সতর্ক করেছে, বকেয়া পরিশোধ না হলে কয়েক দিনের মধ্যেই তারা বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রাখতে পারে।
গত ১ জানুয়ারি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি) পাঠানো এক চিঠিতে এস এস পাওয়ার জানায়, তাদের অনাদায়ী বিল ৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, তাই বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি অনুযায়ী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে এসব বকেয়া পরিশোধ না হলে তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করার অধিকার রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এস এস পাওয়ার একক কোনো ঘটনা নয়। বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সংগঠন—বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের কাছে বিপিডিবির মোট বকেয়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা।
নাম না প্রকাশের শর্তে, বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা বলেন, “দীর্ঘদিনের অর্থ পরিশোধে বিলম্ব আসন্ন রমজান ও গ্রীষ্মের পিক মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে। শিগগিরই একটি নতুন সরকার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে, আর এ ধরনের বিপুল বকেয়া তাদের জন্য প্রথম বড় ইকোনমিক ও গভর্ন্যান্সের চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।”
বিপিডিবির কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, বড় কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র আংশিকভাবে বন্ধ হলেও তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হবে, বিশেষত যখন গ্যাস-সংকটের কারণে অনেক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও সক্ষমতার অনেক নিচে চলছে। তারা সতর্ক করে বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বেসলোড উৎপাদন হারালে সামনের মাসগুলোতে লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে, কারণ বিকল্প উৎসগুলো ইতোমধ্যেই চাপের মধ্যে রয়েছে। তাছাড়া সিস্টেমের ‘ফ্লেক্সিবিলিটি’ও কম।
বিপিডিবির সদস্য মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, “এখনই যদি এস এস পাওয়ার উৎপাদন বন্ধ করে দেয়, তাহলে প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হবে,”—যার তাৎক্ষণিক প্রভাব দেখা দিবে, এবং এটা সামাল দেওয়াও কঠিন।
বিপিডিবির অর্থবিষয়ক সদস্য অঞ্জনা মজলিশ খান বলেন, আশা করি এস এস পাওয়ার উৎপাদন বন্ধের পথে যাবে না, কারণ আগেও এমন অচলাবস্থা তৈরি হলেও শেষপর্যন্ত সমাধান হয়েছে। তিনি বলেন, “আগেও তারা বন্ধের নোটিশ দিয়েছিল। তখন বিপিডিবি বকেয়া পরিশোধ করে উৎপাদন চালু রাখতে রাজি করিয়েছিল। এবারও সরকার সমাধানের পথ বের করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।”
অন্য বেসরকারি উৎপাদকদের বকেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অর্থ পরিশোধে দেরি একটি ‘সাইকেলিক্যাল’ বিষয়, এটি কাঠামোগত ভাঙনের ইঙ্গিত এমন না।”বেসরকারি কেন্দ্রগুলো বিল জমা দেয়। সেগুলো আমরা যাচাই করে এরপর পরিশোধ করি। এতে কখনো কখনো বকেয়া জমে যার, আবার কখনো পরিশোধ করা হলে—তা কমেও যায়।” বিল পরিশোধে বিলম্ব এস এস পাওয়ারের কার্যক্রমে চাপ বাড়াচ্ছে
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে পাঠানো চিঠিতে এস এস পাওয়ার আই লিমিটেড (এসএসপিআইএল) জানায়, ডিসেম্বরে ১,৫০০ কোটি টাকা পাওয়ার পরও তাদের অনাদায়ী বিল ৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানায়, অর্থ পরিশোধে বিলম্বের কারণে কয়লা, যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহে সমস্যা হচ্ছে। নিজস্ব আর্থিক দায় পরিশোধেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।
এসএসপিআইএল আগেই সতর্ক করেছিল যে, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে তাদের একটি ইউনিট বন্ধ করতে হবে। তবে জনস্বার্থে ও গ্রিডের স্থিতিশীলতার কথা আমলে নিয়ে শর্তসাপেক্ষে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত বন্ধের সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখার কথা বলা হয়েছে। এই স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকবে, যদি বিপিডিবি ঠিকাদার ও সরবরাহকারীদের বকেয়া পরিশোধ এবং নিরবচ্ছিন্ন কয়লা সরবরাহ নিশ্চিত করতে ৮ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ টাকা ছাড় করে।
চিঠিতে বলা হয়, “উল্লিখিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ না হলে, এসএসপিআইএলের অন্তত একটি ইউনিট এবং অপারেশনাল প্রয়োজন অনুযায়ী আরও ইউনিট বন্ধ করা ছাড়া কোনো বিকল্প থাকবে না।”
এস এস পাওয়ার আরও জানায়, ডিসেম্বরে পাওয়া অর্থ বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি অনুযায়ী কোনো প্রতিকার হিসেবে গণ্য হয় না এবং অর্থ পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে উৎপাদন কমানো হলে, সেটিকে যেন কোম্পানির দায় হিসেবে বিবেচনা বা শাস্তির আওতায় না আনা হয়—সে বিষয়ে লিখিত নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে।
উৎপাদন স্থগিতের নোটিশের বিষয়টি নিশ্চিত করে এস এস পাওয়ারের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) এবাদত হোসেন বলেন, নভেম্বর পর্যন্ত আমাদের বকেয়া ছিল প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ডিসেম্বরের বিল যোগ হয়ে সেটা ৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। আমরা ১০ ডিসেম্বর এবং আবার ২৮ ডিসেম্বর বিপিডিবিকে অর্থ পরিশোধের অনুরোধ জানিয়ে লিখেছি। অনুরোধ প্রত্যাখ্যাত হলে ২৯ ডিসেম্বর স্থগিতাদেশের নোটিশ দিই। তিনি বলেন, পরদিন বিপিডিবি নোটিশ প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে অর্থ পরিশোধের আশ্বাস দেয়। সেই অনুরোধ বিবেচনায় নিয়ে আমরা স্থগিতাদেশ পিছিয়েছি, তবে তাদের জানানো হয়েছে যে, ১৫ জানুয়ারির মধ্যে অর্থ পরিশোধ না হলে আংশিক বা পুরো উৎপাদন বন্ধ হতে পারে। তিনি আরও বলেন, পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ হাজার টন কয়লা প্রয়োজন। “আমাদের খরচগুলো মেটাতে না পারলে প্ল্যান্ট চালু রাখা সম্ভব নয়,”—যোগ করেন তিনি।
বিপিডিবির কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, শীতকালে বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকলেও এস এস পাওয়ার বন্ধ হলে তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হবে।
জহুরুল ইসলাম বলেন, শীতকালে চাহিদা কম থাকার কারণে যেসব কেন্দ্র বন্ধ রাখা হয়েছে, সেগুলো পুনরায় চালু করে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে, তবে এতেও সময় লাগবে। তিনি বলেন, ঘাটতি পূরণে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র চালু করতে হবে। কিন্তু শীতকালেও গ্যাস সরবরাহ সীমিত, এতে আরও বেশি এলএনজি আমদানির প্রয়োজন হবে।
বিপিডিবির চট্টগ্রাম পূর্ব জোনের সুপারইনটেনডেন্ট প্রকৌশলী একেএম জাশিম উদ্দিন বলেন, বর্তমানে চাহিদা কম থাকায় কোনো লোডশেডিং নেই। তিনি বলেন, “গ্রীষ্মকালে চাহিদা থাকে ১৫ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে। শীতে তা নেমে আসে ৮ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াটে।” তিনি সতর্ক করে বলেন, বকেয়া নিয়ে এই বিরোধ যদি পিক চাহিদার মৌসুম পর্যন্ত গড়ায়, তাহলে পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক কম এবং সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও কমেছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ৪ জানুয়ারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ করা হয়েছে দৈনিক ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস (এমএমসিএফডি), যেখানে চাহিদা ছিল ২,৫২৫ এমএমসিএফডি। ৩ জানুয়ারি সরবরাহ নেমে আসে ৬৬২ এমএমসিএফডিতে, যা প্রয়োজনের মাত্র এক-চতুর্থাংশ।
বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ১৫২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, পাশাপাশি ভারত ও নেপাল থেকেও বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়। বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ৫ জানুয়ারি বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১০ হাজার ৫৪২ মেগাওয়াট, আর আমদানিসহ মোট উৎপাদন ছিল ১০ হাজার ৬৮ মেগাওয়াট।
বিপিডিবি নিয়মিত দৈনিক উৎপাদন ও লোডশেডিংয়ের তথ্য প্রকাশ করলেও ২৮ ডিসেম্বরের পর থেকে আর কোনো লোডশেডিংয়ের তথ্য আপলোড করা হয়নি। ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ৩৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ ছিল। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, লোডশেডিংয়ের কোনো আনুষ্ঠানিক ইঙ্গিত নেই।
ফাওজুল কবির খান বলেন, “বিদ্যুৎ সরবরাহে সাময়িক একটা বিঘ্ন মানেই লোডশেডিং নয়। মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্বল্প সময়ের বন্ধ রাখা—গ্রীষ্মে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্যই দরকার, এটাকে লোডশেডিং বলা উচিত নয়।”