• শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৫৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম
ঢাকা বাইক শো-তে সিএফএমওটিও নিয়ে এলো ‘জিহো’ এবং নতুন মোটরসাইকেল লাইনআপ রাজশাহী ব্যাংকার্স ক্লাব ক্রিকেট টুর্নামেন্টের হ্যাট্রিক চ্যাম্পিয়ন এনআরবিসি ব্যাংক চট্টগ্রাম নগরে এক দিনে তিন স্থানে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা ইসহাক সরকার যোগ দিলেন এনসিপিতে শরণখোলায় জমি নিয়ে বিরোধে বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ, এলাকায় উত্তেজনা ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের জন্য লম্বা লাইন ছোট হয়ে আসছে শূন্যে নামবে সেশনজট, অনেক কলেজে বন্ধ হতে পারে স্নাতক-স্নাতকোত্তর কোর্স তীব্র গরমে পুড়ছে দেশ, অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে বিচার বিভাগের দুর্নীতির সব শিকড় তুলে আনতে চাই: আইনমন্ত্রী বাংলাদেশ এখন হামের উচ্চ ঝুঁকিতে: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

বিল দিয়েও মিলছে না পাইপলাইনের গ্যাস, কষ্টে আছেন গ্রাহকরা

প্রভাত রিপোর্ট / ৭৫ বার
আপডেট : সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬

প্রভাত রিপোর্ট: রাজধানীর ডেমরা থানার ৬৬ নং ওয়ার্ডের আইডিয়েল রোডের বাসিন্দা গৃহিণী সিদ্দিীকা বোসরা ও গৃহিণী মাকসুদা আক্তার, গৃহিণী লিপি আক্তার ও রিভা অভিযোগ করে জানালেন, তাদের বাসায় পাইপলাইন গ্যাসের সংযোগ থাকলেও বছরখানেক হলো চুলায় গ্যাসের চাপ নেই। কিন্তু প্রতিমাসে সরকারকে ১ হাজার ৮০ টাকা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা হচ্ছে। এনিয়ে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে বারবার অভিযোগ দেয়া হলেও তারা কোন কর্ণপাত করছেন না। তাদের অভিযোগ, অনেক আগে রাত ১-২টার পর সামান্য গ্যাস এলেও তাতে ঠিকভাবে রান্না করা সম্ভব হয় না। বাধ্য হয়ে এলপিজি সিলিন্ডার বা ইলেক্ট্রিক চুলা কিনতে হয়েছে। এতে একদিকে সরকারি গ্যাসের বিল, অন্যদিকে এলপিজির অতিরিক্ত খরচ দুটোই বহন করতে হচ্ছে। একই এলাকার সাবেক ব্যাংকার ফজলুল হক বললেন, পাইপলাইনের গ্যাস সারাবছরই পর্যাপ্ত পাওয়া যায় না, শীতে তো একেবারেই থাকে না। অথচ নিয়মিত বিল দিতে হচ্ছে। আগে মাঝরাতে কিছুটা গ্যাস এলে তখনই রান্নার কাজ সেরে নিতে হয়। সেটাও যথেষ্ট নয়। বাধ্য হয়ে মাটির চুলা তৈরি করে তাতে রান্না করতে হচ্ছে।
যাত্রাবাড়ী এলাকায় বসবাসরত অটো- টেম্পু ব্যবসায়ি খালেককুজ্জামান জানান, বাসার সরকারি গ্যাস লাইনে একেবারেই গ্যাস নেই। গ্রীষ্মে কিছুটা পাওয়া গেলেও এখন পরিস্থিতি আরও খারাপ। বাধ্য হয়ে এলপিজি সিলিন্ডার কিনেছিলেন, কিন্তু সেটিও এখন বাজারে মিলছে না। মাসের পর মাস বিল পরিশোধ করলেও গ্রাহকরা ন্যূনতম গ্যাস পাচ্ছেন না, অন্যদিকে এলপিজি সংকট ও দামের ঊর্ধ্বগতি তাদের আরও ভোগান্তিতে ফেলেছে। বহু পরিবার বাধ্য হয়ে মাটির চুলা বা ইলেকট্রিক চুলার ওপর নির্ভর করছেন। বর্তমানে বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত দুই চুলার পাইপলাইন গ্যাসের মাসিক বিল ১ হাজার ৮০ টাকা। সরকারি হিসেবে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৩০৬ টাকা। তবে বাস্তবে তা কিনতে হচ্ছে অন্তত ২ হাজার ২০০ টাকায়। একদিকে পাইপলাইন গ্যাসের ঘাটতি, অন্যদিকে এলপিজির বাড়তি দাম গ্রাহকদের দিশেহারা করে তুলেছে।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই দেশজুড়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলপিজি) মিলছে না। সে সময় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন প্রতি সিলিন্ডারের দাম ১,২৫৩ টাকা নির্ধারণ করলেও বাজারে তা বিক্রি হতে থাকে ১,৮০০ টাকায়। জানুয়ারিতে সংকট আরও তীব্র হয়েছে। বর্তমানে সরকারিভাবে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১,৩০৬ টাকা হলেও বাস্তবে তা বিক্রি হচ্ছে ২,২০০ টাকায়।
এলপিজি সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে খাত সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করছেন, ২০ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোর ওপর জ্বালানি সরবরাহ নিষেধাজ্ঞা আর দেশীয় পর্যায়ে এলসি খোলার জটিলতা। আমদানি বৃদ্ধির অনুমতি না পাওয়া ও বড় এলপিজি কোম্পানিগুলো ব্যবসা কমিয়ে দেয়াও সংকট সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
এলপিজি ব্যবসায়ী সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বাজারে ৫ কোটি ৫০ লাখের মতো সিলিন্ডার থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে মাত্র ১ কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডারই রিফিল হচ্ছে। বড় এলপিজি কোম্পানিগুলোর আমদানি বন্ধ থাকার কারণে ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এলপিজি অপারেটরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সহ-সভাপতি হুমায়ুন রশিদ গণমাধ্যমকে বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে এলপিজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। এলসি খোলা থাকলেও জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় পণ্য আসতে পারছে না। এ ছাড়া বর্তমানে ইউরোপেও এলপিজির চাহিদা অনেকটা বেড়ে গেছে। ফলে সার্বিকভাবে বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়েছে। তিন মাস আগে পেট্রোবাংলা দৈনিক ২,৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করলেও চলতি মাসে তা কমে এসেছে ২,৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। এর মধ্যে ৮৩২ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে। দেশে অবস্থিত এলএনজি টার্মিনালের সর্বোচ্চ সক্ষমতা ১,০০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি নয়। বাকি গ্যাস আসে দেশীয় খনি থেকে, তবে তার সরবরাহ ক্রমান্বয়েই কমছে। অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত দেশীয় কূপ থেকে সরবরাহ কমেছে ৪০ মিলিয়ন ঘনফুট।
রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় সরকারি গ্যাস সরবরাহ করে তিতাস গ্যাস। প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, চাহিদা অনুযায়ী তাদের দৈনিক প্রয়োজন ২,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস, কিন্তু তারা পাচ্ছে মাত্র ১,৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
তিতাসের মূল সরবরাহদাতা পেট্রোবাংলার তথ্যেও সংকটের চিত্র স্পষ্ট। তিন মাস আগে পেট্রোবাংলা দৈনিক ২,৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করলেও চলতি মাসে তা কমে এসেছে ২,৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। এর মধ্যে ৮৩২ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে। দেশে অবস্থিত এলএনজি টার্মিনালের সর্বোচ্চ সক্ষমতা ১,০০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি নয়। বাকি গ্যাস আসে দেশীয় খনি থেকে, তবে তার সরবরাহ ক্রমান্বয়েই কমছে। অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত দেশীয় কূপ থেকে সরবরাহ কমেছে ৪০ মিলিয়ন ঘনফুট।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশীয় কূপ থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় এবং এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর আর কোনও উপায় না থাকায় সংকট তৈরি হয়েছে। শীত মৌসুমে স্বাভাবিকভাবেই চাহিদা বেড়ে যায়, কিন্তু সরবরাহে ঘাটতি থাকায় সংকট আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের এই সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। বিগত সরকার গ্যাসকূপ অনুসন্ধান ও খননে যথেষ্ট বিনিয়োগ না করে সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমদানির ওপর নির্ভর করেছিল। আমদানির ওপর নির্ভরতার কারণে জ্বালানি পণ্যের দাম বারবার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সার্বিকভাবে জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর সমাধান না নেওয়ায় বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, সরকার জানে যে দেশে গ্যাসের তীব্র সংকট রয়েছে। ফলে এলপিজির চাহিদা বাড়া স্বাভাবিক। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যারা আছেন, তাদের এই সংকট মোকাবিলার জন্য যথাযথ পরিকল্পনা থাকা উচিত ছিল। নইলে এই পরিস্থিতি তৈরি হতো। এলপিজির স্টোরেজ তৈরি করা সহজ, সরকার চাইলে এটি করতে পারত, কারণ তারা আগেই জানত যে সংকট তৈরি হবে। তিনি বলেন, সরকারি পাইপলাইনে গ্যাস না থাকাকে একটি ‘সিগন্যাল’ হিসেবে নেওয়া উচিত, যার মানে হলো ভবিষ্যতে সরকার আবাসিক খাতে গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে না। তাই এখনই গৃহস্থালি পর্যায়ের এলপিজি সরবরাহে সরকারকে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে হবে। অর্থাৎ, প্রতিটি ঘরে এলপিজি পৌঁছে দেয়াটা নিশ্চিত করতে হবে। পাইপলাইন গ্যাসের সমস্যা কবে সমাধান হবে, তা কেউ স্পষ্টভাবে বলতে পারছে না, কারণ সংকট আরও তীব্র হতে পারে। সরকারের উচিত দ্রুত একটি নীতি প্রণয়ন করা।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) মো. রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, সম্প্রতি তুরাগ নদীর নিচের পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত এবং গণভবনের সামনে গ্যাস লাইনের ভালভ ফেটে যাওয়ায় রাজধানীর গ্যাসের চাপ কমে সংকট দেখা দিয়েছিল। তবে দুর্ঘটনার বাইরে আরও কিছু কারণ রয়েছে। আমাদের গ্যাসকূপ থেকে উৎপাদন কমে গেছে। শীতকালে পাইপলাইনে জমে যাওয়ার কারণে চাপ কমে যায়। এছাড়া অবৈধ গ্যাস সংযোগ অনেক বেড়ে গেছে। এসব সংযোগ না থাকলে বৈধ গ্রাহকরা গ্যাস পেত। তিনি বলেন, গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। নতুন কূপ খনন করা হচ্ছে, বাপেক্স এখানে কাজ করছে। এছাড়া নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যাতে আমদানি বাড়িয়ে সরবরাহ বৃদ্ধি করা যায়। পাশাপাশি অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিরুদ্ধে নিয়মিত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও