প্রভাত রিপোর্ট: কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, সদ্য সমাপ্ত আমন মৌসুমে ১ কোটি ৮০ লাখ টন চাল উৎপন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও ১ কোটি ৬৫ লাখ টন চাল উৎপন্ন হয়েছিল। অর্থাৎ এবারে ১৫ লাখ টন চাল উৎপাদন বেশি হওয়ার পরও আমদানির পাঁয়তারা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের হাতে রেকর্ড পরিমাণ খাদ্যশস্যের মজুদ রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবেও সরবরাহ ভালো। বাজারে কেন দাম বাড়ছে তা নজরদারি করা উচিত। সরবরাহ থাকার পরও কোনোভাবেই যেন চালের দামে অরাজকতা তৈরির সুযোগ না পায় ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, এই সময় যদি বেসরকারি খাতে আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়, তবে এর প্রভাব পড়বে বোরোর উৎপাদনকারীদের ওপর। কারণ তখন এর প্রভাবে ধানের দাম কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। জানা গেছে, সরকারিভাবেই এ বছর ৫ লাখ টনের বেশি চাল আমদানির প্রক্রিয়া চলমান। বেসরকারিভাবে ইতিমধ্যে ৪ লাখ ৮৩ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে।
গত এক-দেড় সপ্তাহে চিকন চাল হিসেবে পরিচিত জিরাশাইল ও শম্পা কাটারির দাম বেড়েছে কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, পাইকারিতে জিরাশাইলের দাম দেড় শতাংশ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে খুচরায় ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ বেড়েছে। শম্পা কাটারির দাম পাইকারিতে ১ দশমিক ১৯ শতাংশ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে খুচরায় বেড়েছে ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
এদিকে, মিলমালিক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই দুটি জাতের ধানের উৎপাদন হয় বোরো মৌসুমে। যে কারণে সরবরাহ কমে গেছে, দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে দাম বৃদ্ধির কোনো প্রভাব মোটা বা মাঝারি মানের যত চিকন চাল রয়েছে তার ওপর পড়েনি। কারণ, সদ্য শেষ হওয়া আমন মৌসুমের চালের ব্যাপক সরবরাহ রয়েছে বাজারে। এই অবস্থায় চাল আমদানির সিদ্ধান্ত আসলে কার স্বার্থে নেওয়া হচ্ছে সে প্রশ্নটা জোরালো হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, সরকার ইতিমধ্যেই আমন মৌসুম থেকে রেকর্ড পরিমাণ চাল সংগ্রহ করেছে। প্রতি বছর ৫ থেকে ৬ লাখ টন চাল সংগ্রহ করলেও এবার তা ১০ লাখ টনে পৌঁছেছে। এ ছাড়া এবার বোরো মৌসুমেও ১৭ লাখ টন চাল কিনেছিল সরকার। মিলমালিকরা বলছেন, সরকার যদি আরও ১০ লাখ টন চাল কিনতে চায় তাতেও বাজারে কোনো প্রভাব পড়বে না।
সদ্য শেষ হওয়া আমন মৌসুম থেকে চালের ভালো জোগান পাওয়া গেছে। বাজারে নতুন চালের সরবরাহও আছে। সরকারের কাছে আছে চালের রেকর্ড মজুদ। তারপরও সরবরাহ সংকটের অজুহাতে চাল ব্যবসায়ীরা শুরু করেছেন নতুন চালবাজি। অভিযোগ আছে, ‘মন্ত্রণালয়ে ম্যানেজ করে’ ইতিমধ্যে সুনির্দিষ্ট ‘দুটি’ জাতের চালের দাম বাড়িয়েছেন তারা। কিন্তু সরকার এ বিষয়ে যৌক্তিক কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে ‘উল্টো পথে হাঁটতে’ শুরু করেছে। মাত্র দুটি জাতের চালের দাম বৃদ্ধি ঠেকাতে সরবরাহ বাড়ানোর নাম করে বেসরকারি খাতে চাল আমদানির সুযোগ দেওয়ার পাঁয়তারা হচ্ছে খোদ খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে। মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, একটি পক্ষ খাদ্য উপদেষ্টাকে চাল আমদানির জন্য রাজি করাতে উঠে পড়ে লেগেছে। আলোচনায় এখনো আমদানির পরিমাণ নির্ধারণ হয়নি।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, ব্যবসায়ীরা চালের কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে প্রথমে দাম বাড়ানো এবং পরে আমদানির সুযোগ নেওয়ার ‘চাল চেলেছেন’ কি না? তাদের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কি না? নাকি, এটা আসলে খাদ্য ব্যবস্থাপনারই দুর্বলতা?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন চাল আমদানি করলে বোরো মৌসুমের কৃষকের উৎপাদিত ধানের দামে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ, এই মুহূর্তে সরকারের কাছে রয়েছে বড় মজুদ এবং আমন থেকে পাওয়া ভালো সরবরাহ। অথচ খাদ্য মন্ত্রণালয়ে আলোচনা রয়েছে, চালের বাজার সামাল দিতে আমদানি দরকার। আমদানি না করলে চালের বাজার সামাল দেওয়া মুশকিল হবে।
জানতে চাইলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফিরোজ সরকার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘চাল আমদানির বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে আলোচনা হচ্ছে। কোনো সিদ্ধান্ত হলে সেটা সবাইকে জানানো হবে।’
নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘জিরাশাইল ও শম্পা কাটারির উৎপাদন হয় বোরো মৌসুমে। ফলে এর সরবরাহ কমে গেছে। যে কারণে দুটি চালের দাম বেড়েছে। তাও সেটা মিলগেটে দুই টাকার বেশি না।’ তিনি বলেন, যে চালের দাম বেড়েছে সেগুলো সাধারণত ধনী মানুষরা কিনে থাকেন। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের যে চাল তার ব্যাপক সরবরাহ রয়েছে। এগুলোর দাম তো বাড়েইনি, উল্টো মোটা চালের দাম খানিকটা কমেছে। কারণ, সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে। এবার আমন মৌসুমে সরকার যেকোনো বছরের চেয়ে বেশি চাল সংগ্রহ করেছে। সরকার যদি চায় মিলাররা আরও ১০ লাখ টন চালের সরবরাহ দিতে পারবে। তাতে করেও বাজারে কোনো ধরনের সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হবে না।
একদিকে যেমন বাজারে সরবরাহের কমতি নেই, অন্যদিকে সরকারের কাছেও রয়েছে রেকর্ড মজুদ। গত ১৫ জানুয়ারির তথ্য বলছে, প্রায় ২১ লাখ টনের খাদ্যশস্যের মজুদ রয়েছে সরকারের কাছে। এর মধ্যে চালই রয়েছে ১৮ লাখ ৪২ হাজার টনের বেশি। যা এই অর্থবছরে সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিতরণ করেও শেষ হবে না।
এ বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মজুদ, স্থানীয় উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অবস্থা দেখে সাধারণত আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু এখন সরকারের মজুদ খুবই ভালো, স্থানীয় উৎপাদনও ভালো হয়েছে। বাজারে সরবরাহের কোনো ঘাটতি নেই। এখন আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া মানে কোনো একটা গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘সরবরাহ ভালো থাকার পরও যদি আমদানি করা হয়, তাহলে সেটা কৃষকের ওপর প্রভাব পড়বে। বোরো মৌসুমের কৃষকের ধানের দাম কমে যেতে পারে। এটা তখন কৃষকদের ক্ষতি করবে। এই বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত।’
খাদ্য অধিদপ্তরের একটি সূত্র বলছে, কর্মকর্তাদের একটি অংশ ব্যবসায়ীদের সুযোগ করে দিতে চাইছে। যে কারণে চাল আমদানির তোড়জোড় চলছে। আসলে কোনো সংকট নেই। কারণ, আমনে চুক্তি হওয়া মিলারদের কাছ থেকে সরকার চুক্তির চেয়ে বেশি চাল কিনেছে। কোনো কোনো মিলার দুই থেকে তিনবার করে চাল বিক্রি করেছেন সরকারের কাছে। অভিযোগ আছে, এর আগে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে যে চাল আমদানি হয়েছে তারই একটা অংশ সরকারের কাছে বিক্রি করেছেন মিলাররা। সেখানে তারা প্রতি কেজি চালে ৫-৬ টাকা পর্যন্ত মুনাফা করেছেন।