প্রভাত অর্থনীতি: শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎখাত স্বজনপ্রীতি ও চোরতন্ত্রে জর্জরিত হয়ে পড়ে। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত বিদ্যুৎ চুক্তি পর্যালোচনায় গঠিত জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর আওতায় স্বাক্ষরিত একতরফা চুক্তিগুলোর কারণে প্রতিবছর প্রায় ১৫০ কোটি ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে দেশ।
কমিটি সরকারের প্রতি সব একতরফা চুক্তি পুনঃআলোচনার সুপারিশ করেছে। আগের সরকারের সময়ে আদানি পাওয়ারের স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোর মধ্যে আদানি পাওয়ারের সঙ্গে করা চুক্তিকে অন্যতম একতরফা হিসেবে উল্লেখ করে, বিশেষভাবে এটি বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
কমিটির মতে, শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে অনুমোদিত এসব চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল নিজদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় সংহত করা, যার বিনিময়ে বাংলাদেশকে গুনতে হয়েছে বিপুল আর্থিক ক্ষতি।
প্রায় সাড়ে ৯ হাজার মেগাওয়াট অব্যবহৃত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার কারণে বছরে প্রায় ১৫০ কোটি ডলার ব্যয় হচ্ছে উল্লেখ করে কমিটি সতর্ক করেছে, একতরফা চুক্তিগুলো নিয়ে পুনঃআলোচনা বা ব্যাপক পর্যালোচনা না হলে সামনে বড় ধরনের আর্থিক সংকট দেখা দিতে পারে।
রবিবার প্রকাশ করা প্রতিবেদনে কমিটি বলেছে, দেশের বিদ্যুৎখাতের বর্তমান সংকটের জন্য জ্বালানির দামে ওঠানামা বা বৈশ্বিক ধাক্কা দায়ী নয়; বরং এটি ছিল এমন “সিস্টেমেটিক্যালি ইঞ্জিনিয়ারড চুক্তির” ফল, যা জনগণের ক্ষতির বিনিময়ে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অস্বাভাবিক সুবিধা দিয়েছে। এদিন রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় কমিটির তৈরি প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন কমিটির প্রধান মঈনুল ইসলাম চৌধুরী।
সংবাদ সম্মেলনে কমিটির সদস্যরা চুক্তি অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে জানিয়েছেন, তারা এমন পর্যাপ্ত প্রমাণ পেয়েছেন, যার ভিত্তিতে এসব চুক্তি বাতিল করতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।
উদ্বোধনী বক্তব্যে কমিটির প্রধান মঈনুল ইসলাম বলেন, দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি আইন বাস্তবে বিদ্যুৎখাতে “স্বজনপ্রীতি ও চোরতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে” চালু করা হয়েছিল। তিনি বলেন, এই আইনের আওতায় দেওয়া প্রকল্পগুলো ছিল অস্বচ্ছ ও খামখেয়ালি। এর ফলে বিদ্যুৎখাত আজ চরম ঝুঁকির মধ্যে—প্রকৃতপক্ষে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
মূল অনুসন্ধানগুলো তুলে ধরে কমিটির সদস্য ও বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার কারণে ২০১৫ সালেই বাংলাদেশ গড়ে ৫০ হাজার কোটি টাকা ক্ষতির মুখে পড়ে—যা ঢাকা মেট্রোরেল নির্মাণ ব্যয়ের প্রায় সমান। তিনি বলেন, “ক্রয় প্রক্রিয়া কারসাজির মাধ্যমে এবং দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে অযৌক্তিক সুবিধা দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের জন্যই এটি করা হয়েছিল।”
জাহিদ হোসেন আরও বলেন, জনপরিসরে পরিস্থিতিকে জরুরি অবস্থা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। “আমাদের বলা হয়েছিল—যেকোনো মূল্যে বিদ্যুৎ দরকার। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সংকট চুক্তির মাধ্যমেই পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছিল।”
কমিটির মতে, সাময়িক আইন হিসেবে প্রণীত দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি আইন, ২০১০ ধীরে ধীরে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক দখলের হাতিয়ারে পরিণত হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, “প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র বাতিল করে এবং জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি পাশ কাটিয়ে রাষ্ট্র কার্যত নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর হাতে ব্ল্যাঙ্ক চেক তুলে দেয়।”
কমিটির ভাষায়, আদানি চুক্তি শুধু একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয়; এটি শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতার এক জীবন্ত স্মারক। কোনো প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই অনুমোদিত এই চুক্তিতে, এই অঞ্চলের মধ্যে আমদানিকৃত বিদ্যুতের অন্যতম সর্বোচ্চ দর নির্ধারণ করা হয়েছে।
আদানি চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া শুরুর আহ্বান জানিয়ে কমিটির সদস্য মোশতাক হোসেন খান বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের হুইসেলব্লোয়ারদের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চুক্তি–সংক্রান্ত নথি জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে, যার মধ্যে আদানি চুক্তিও রয়েছে।
কমিটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আদানি পাওয়ার থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুতের দাম ভারতের অন্যান্য উৎস থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুতের তুলনায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি। মোশতাক বলেন, “ভারতের গ্রিড থেকে আমরা ইউনিটপ্রতি ৪ দশমিক ৪৬ সেন্টে বিদ্যুৎ কিনি। অথচ আদানির সঙ্গে চুক্তি হয়েছে ৮ দশমিক ৬১ সেন্টে, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ দশমিক ৮৭ সেন্টে। তিনি আরও বলেন, “২৫ বছরে আদানি চুক্তির আওতায় কমপক্ষে ২৫ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে, যার অন্তত ৪০ শতাংশ বা ১০ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয়। এই বাড়তি ব্যয় এসেছে চুক্তিতে দুর্নীতির কারণে।”
মোশতাক বলেন, “আমরা এমন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেয়েছি, যা থেকে বোঝা যায়—এই চুক্তির মাধ্যমে কিছু বাংলাদেশি কর্মকর্তা তাদের বিদেশি ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তরের সুবিধা পেয়েছেন।” তবে তিনি যোগ করেন, কমিটি শেখ হাসিনার কোনো বিদেশি হিসাবে লেনদেনের সঙ্গে এই চুক্তির সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায়নি কমিটি।
কমিটির এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে আদানি পাওয়ারের বাংলাদেশে জনসংযোগ দেখভালকারী প্রতিষ্ঠান ফাইভ ডব্লিউ কমিউনিকেশনস জানায়, তারা এখনও জাতীয় কমিটির প্রতিবেদন পায়নি। বাংলাদেশের কোনো কর্তৃপক্ষ তাদের সঙ্গে যোগাযোগও করেনি। এ কারণে প্রতিবেদন নিয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয় বলে জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, “কোনো পর্যায়ে আমাদের কাছে বাংলাদেশি কোনো কর্তৃপক্ষ আমাদের মতামত বা তথ্য চায়নি।”
কমিটি জানিয়েছে, আদানি চুক্তি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতেও বৈশ্বিক মানদণ্ডের তুলনায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বেশি দর নির্ধারণ করা হয়েছে। ভারী ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে যুক্তিসংগত ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি ট্যারিফ দেওয়া হয়েছে।
কমিটির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১১ থেকে ২০২৪ অর্থবছরের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন চারগুণ বেড়েছে। একই সময়ে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের পরিশোধিত অর্থ বেড়েছে ১১ গুণ, আর ক্যাপাসিটি চার্জ বেড়েছে প্রায় ২০ গুণ।
প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়, “এটা কীভাবে সম্ভব হলো?” যার উত্তর দেওয়া হয়—”একতরফা চুক্তির কৌশলের মাধ্যমে।”
কমিটির মতে, এসব চুক্তি এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যাতে বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি কার্যত শূন্য থাকে, আর জ্বালানির দামের ওঠানামা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সব দায় রাষ্ট্রকে বহন করতে হয়।
টেক-অর-পে শর্তের আওতায়, অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্যও বিনিয়োগকারীদের অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। ট্যারিফ বা বিদ্যুতের দামকে যুক্ত করা হয় মার্কিন ডলারের সঙ্গে, ফলে টাকার অবমূল্যায়নের পুরো চাপ সরকারকে বহন করতে হয়। কার্যত করদাতারা এমন বিদ্যুতের জন্য অর্থ দিতে বাধ্য হন, যা তাদের প্রয়োজন ছিল না বা ব্যবহারই করতে পারেননি।
কমিটি পায়রা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদাহরণ দিয়ে প্রতিবেদনে বলেছে, “একটি বৃহৎ বেজলোড কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে বন্দর অবকাঠামোয় বড় অঙ্কের সরকারি বিনিয়োগ করা হলেও—-সেখানে কার্যকর ডিপ-সি কয়লা হাবের প্রয়োজনীয় সুবিধা নেই। ফলে উৎপাদন সক্ষমতার মধ্যেই লজিস্টিক ঝুঁকি ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
আরেকটি বড় গ্যাসভিত্তিক প্রকল্প রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ বা অতিরিক্ত এলএনজি সক্ষমতা ছাড়াই চালু করা হয়, যার ফলে প্রযুক্তিগতভাবে সক্ষম কেন্দ্রটি কাঠামোগতভাবেই অব্যবহৃত থেকে যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, “এই অসংগতিগুলো দুর্ঘটনাবশত হয়নি। এগুলো ছিল (সংশ্লিষ্ট) পক্ষগুলোর মধ্যে যোগসাজশের ফল, যার উদ্দেশ্য ছিল বিপুল অতিরিক্ত মুনাফা নিজদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেওয়া।” সুপারিশে কমিটি বলেছে, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) শক্তিশালী করা জরুরি। এছাড়া বিপিডিবির ওপর স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নজরদারির জন্য বহিরাগত প্রযুক্তি ও আইনি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি নতুন ‘এনার্জি ওভারসাইট কমিশন’ গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।