• রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৫৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম
ঢাকা বাইক শো-তে সিএফএমওটিও নিয়ে এলো ‘জিহো’ এবং নতুন মোটরসাইকেল লাইনআপ রাজশাহী ব্যাংকার্স ক্লাব ক্রিকেট টুর্নামেন্টের হ্যাট্রিক চ্যাম্পিয়ন এনআরবিসি ব্যাংক চট্টগ্রাম নগরে এক দিনে তিন স্থানে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা ইসহাক সরকার যোগ দিলেন এনসিপিতে শরণখোলায় জমি নিয়ে বিরোধে বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ, এলাকায় উত্তেজনা ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের জন্য লম্বা লাইন ছোট হয়ে আসছে শূন্যে নামবে সেশনজট, অনেক কলেজে বন্ধ হতে পারে স্নাতক-স্নাতকোত্তর কোর্স তীব্র গরমে পুড়ছে দেশ, অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে বিচার বিভাগের দুর্নীতির সব শিকড় তুলে আনতে চাই: আইনমন্ত্রী বাংলাদেশ এখন হামের উচ্চ ঝুঁকিতে: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

ভিসা কড়াকড়িতে সৌদি আরবে জনশক্তি রপ্তানি ব্যাহত

প্রভাত রিপোর্ট / ৩৫ বার
আপডেট : শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬

প্রভাত অর্থনীতি: বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্সের প্রধান উৎস সৌদি আরব কর্মী নিয়োগের ভিসা ইস্যু কমিয়ে দিয়েছে। দেশটিতে যাওয়ার পর কর্মীরা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ বা কাজের অনুমতিপত্র (ইকামা) পাচ্ছেন না—এমন অভিযোগের প্রেক্ষাপটে এই কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত মাসে জমা পড়া কয়েক হাজার আবেদন বাতিল করেছে সৌদি আরবের মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়। অনেক নিয়োগকর্তা শ্রমিকের প্রকৃত চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও জালিয়াতি করে ভুয়া চাহিদাপত্র জমা দেয়ায় কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এ পদক্ষেপে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান, বিশেষত সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে জনশক্তি রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরবগামী কর্মীর সংখ্যা ৩৩ শতাংশ কমেছে, যার প্রভাবে সামগ্রিক বৈদেশিক কর্মসংস্থান কমেছে ৩২ শতাংশ।
সৌদি আরব বাংলাদেশের শীর্ষ রেমিট্যান্স উৎস হওয়ায় এই পরিস্থিতি নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। গত বছর প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশটি থেকে ৫.০৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা দেশের মোট ৩২.৮১ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স প্রবাহের ১৫ শতাংশ।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। এতে নতুন কর্মীর চাহিদা কমে যাবে। ফেব্রুয়ারির প্রথম পাঁচ দিনে বাংলাদেশ থেকে ১৩ হাজার ৬৬১ জন কর্মী সৌদি আরব গিয়েছিলেন; অথচ চলতি মাসের একই সময়ে এই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৪৭৪ জনে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অভ ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ-এর (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব টিপু সুলতান বলেন, ভিসা ইস্যুর হার ‘আগের তুলনায় কমে প্রায় ৫ শতাংশে ঠেকেছে।’ তিনি আরও বলেন, শুরুতে সৌদি অনলাইন সিস্টেমে কিছু ভিসা দেখা গেলেও পরে সেগুলো গায়েব হয়ে যাচ্ছে। এতে নানা অনিয়মের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, চলমান সংঘাতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। ‘ইরানে যুদ্ধের কারণনে ইতিমধ্যে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সামগ্রিক ভিসা প্রক্রিয়া আরও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী নিশ্চিত করেছেন, সরকার বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে সমন্বয় সভা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কিছু কর্মী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না, এমন অভিযোগ ওঠার পর সৌদি কর্তৃপক্ষ ভিসা প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে।’
মন্ত্রী আরও জানান, বাংলাদেশি কর্মীরা যাতে কাজের নিশ্চয়তা নিয়ে নিরাপদে সৌদি আরব যেতে পারেন, সে বিষয়ে রিয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে এখন যেকোনো বিষয়ে একইভাবে গুরুত্ব পাওয়া কঠিন। তবে আশা করছি, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এই সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে।’
সৌদি আরব এখনও বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মীদের সবচেয়ে বড় গন্তব্য। আনঅফিশিয়াল হিসাব অনুসারে, বর্তমানে ৩০ লাখের বেশি বাংলাদেশি দেশটিতে কর্মরত। ২০২৫ সালেও দেশের মোট বৈদেশিক শ্রমশক্তির প্রায় ৬৭ শতাংশেরই গন্তব্য ছিল সৌদি আরব।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে সৌদি আরব ৬৫ হাজার ৪১০ জন কর্মী নিয়োগ দিলেও ফেব্রুয়ারিতে সেই সংখ্যা কমে ৪৩ হাজার ৯০৩ জনে দাঁড়িয়েছে। জানুয়ারিতে মোট ৯৫ হাজার ৯২ জন কর্মী বিদেশে পাড়ি দিলেও ফেব্রুয়ারিতে তা কমে হয়েছে ৬৫ হাজার ৭৬ জন।
অন্যান্য বেশ কিছু দেশ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে সীমাবদ্ধতা দেওয়ায় বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতের জন্য সৌদি আরব এখন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত কয়েক বছর ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, বাহরাইন ও মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ অনেকাংশে সীমিত বা স্থগিত রেখেছে।
বিএমইটির তথ্যানুসারে, গত বছর অভিবাসী কর্মীদের করা অভিযোগের ৯০ শতাংশই ছিল সৌদি আরবে কর্মসংস্থানসংক্রান্ত। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ইকামা না পাওয়া, কর্মহীন থাকা ও বকেয়া বেতন। খাতসংশ্লিষ্টরা বলেন, প্রকৃত সংখ্যাটি আরও অনেক বেশি। কারণ অনেক অভিবাসী আনুষ্ঠানিক অভিযোগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানেন না অথবা গ্রামীণ এলাকায় ঘরোয়াভাবে বিষয়গুলো মিটমাটের চেষ্টা করেন।
সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহ বলেন, কোভিড মহামারির পর থেকে সৌদি আরবের ডিজিটাল ভিসা সিস্টেমে নিয়োগকর্তা ও এজেন্টদের কারসাজি করার প্রবণতা বেড়েছে। তিনি বলেন, সৌদি আরবের ডিজিটাল ভিসা সিস্টেমে স্পন্সর ও কাজের ধরন অনলাইনে যাচাই করার সুযোগ রয়েছে। তবে কিছু সৌদি নিয়োগকর্তা এবং স্থানীয় রিক্রুটিং এজেন্ট তথ্য জালিয়াতি করে বিভ্রান্তিকর কাজের বিবরণ দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
‘অনেক সময় ক্লিনার, হেল্পার বা লোডার পদের কথা বলে ভিসা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সৌদিতে পৌঁছনোর পর কর্মীরা দেখছেন, আদতে সেই পদের কোনো অস্তিত্বই নেই। অথবা তাদের দিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো কাজ করানো হচ্ছে,’ বলেন তিনি। তার মতে, এই সমস্যা প্রতিরোধে বিএমইটি এবং রিয়াদে বাংলাদেশ মিশনের শক্তিশালী তদারকি অপরিহার্য। এসব সমস্যা মোকাবিলায় বিএমইটি ও রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাসকে নজরদারি আরও জোরদার করার পরামর্শ দেন তিনি। তার আশঙ্কা, এই অনিয়ম চলতে থাকলে ভবিষ্যতে সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশি কর্মীদের ওপর আরও কঠোর ভিসা বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে।
বাতিল হওয়া ভিসাগুলোর জন্য সৌদি অংশীদারদের আগাম টাকা পরিশোধ করে ফেলার কারণে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের ফলে জালিয়াতি ও অভিবাসন ব্যয় কমতে পারে; তবে সৌদি আরবের স্কিল ভেরিফিকেসশন কর্মসূচির আওতায় দক্ষ শ্রমিক নিয়োগের এই প্রবণতা বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সুযোগের ধরনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন, অনেক এজেন্সি ইতিমধ্যে হাজার হাজার ভিসার জন্য সৌদি অংশীদারদের অগ্রিম টাকা পাঠিয়ে রেখেছে। তিনি বলেন, ‘ভিসা যাচাইয়ের কড়াকড়ির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের প্রভাবই আছে। এতে সৌদি আরবে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে কর্মীরা আগে যে সমস্যার সম্মুখীন হতেন, তা কমবে। তবে ভিসা বাতিল হওয়ায় যেসব এজেন্সি অগ্রিম টাকা দিয়েছে, তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।’
বিএমইটির কর্মকর্তারা বলছেন, তারা পরিস্থিতির বিষয়ে অবগত আছেন। সনংস্থাটির ইমিগ্রেশন শাখার উপ-পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো ইতিমধ্যে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। ‘রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সমস্যা সমাধানে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে,’ বলেন তিনি।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌদি কর্তৃপক্ষের কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের ফলে ভুয়া চাকরির চাহিদা বন্ধ হলে শেষপর্যন্ত অভিবাসন ব্যয় কমে আসবে।
বায়রার সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, তথাকথিত ‘ফ্রি ভিসা’ দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসন খরচ বাড়িয়ে রেখেছে। ‘সৌদি আরব যদি সত্যিই অপ্রয়োজনীয় চাকরির চাহিদা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, তবে তা অভিবাসন খরচ কমাতে সহায়ক হবে।’ বর্তমানে সৌদি আরবে যেতে বাংলাদেশি কর্মীদের ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়, যদিও সরকার-নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।
হাইফা ইন্টারন্যাশনালের ম্যানেজিং পার্টনার মো. শাহিন উদ্দিন বলেন, অদক্ষ কর্মীদের ভিসায় জালিয়াতির ঘটনার পর সৌদি নিয়োগকর্তারা এখন দক্ষ জনশক্তির দিকে বেশি নজর দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো উৎস দেশগুলোর ওপর এর ব্যাপক প্রভাব পড়বে।’ এই পরিবর্তন সৌদি আরবের স্কিল ভেরিফিকেশন কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত। এর আওতায় কর্মীদের নিয়োগের আগে স্বীকৃত পেশায় সনদ নিতে হয়।
২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই কর্মসূচি চালু হয়। শুরুতে প্লাম্বিং, ইলেকট্রিক্যাল কাজ, ওয়েল্ডিং, রেফ্রিজারেশন ও অটোমোবাইল ইলেকট্রিক্যাল সার্ভিস—এই পাঁচ খাত এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। গত দুই বছরে ৭০টিরও বেশি পেশায় এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে। শিগগিরই ৭৩টি পেশাকে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এই সনদ প্রক্রিয়ার অধীনে কর্মীদের তাকামুল সিস্টেমে নিবন্ধন করতে হয়, অনলাইন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয় এবং পাঁচ বছর মেয়াদি দক্ষতার সনদ অর্জন করতে হয়।


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও