• সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৪ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
প্রশ্ন তুললেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক পক্ষের নেতারা গত ১৮ মাস যে আরামে ছিলেন, সেই আরাম এখন হচ্ছে না: প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান হুইলচেয়ারে করে দীপু মনিকে দেখতে এলেন স্বামী এটা আমি-ডামির সরকার না, কাদেরকে নিশ্চিহ্ন করতে চান: সংসদে প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু পিরোজপুরে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বিষয়ক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের দাবিতে পাথরঘাটায় মানববন্ধন নাজিরপুরে হীরা -২ এর বাম্পার ফলন; সুপ্রীম সিডের মাঠ দিবস পালন এপ্রিলের ২৫ দিনে এলো ২৫৭ কোটি ডলার রেমিট্যান্স বাংলাদেশে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী সুইজারল্যান্ড : বাণিজ্যমন্ত্রী দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কার্যক্রম চলছে : সেতুমন্ত্রী

বাংলাদেশ এখন আলু ও পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ, দামে হতাশ কৃষক

প্রভাত রিপোর্ট / ৬২ বার
আপডেট : বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬

প্রভাত অর্থনীতি: বাংলাদেশ এখন আলু ও পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ। গত বছর (২০২৫ সাল) ১ কোটি ১২ লাখ টন আলু উৎপাদন হয়েছিল, যা চাহিদার প্রায় ২২ লাখ টন বেশি। দেশে বছরে ৯০ লাখ টন আলুর চাহিদা রয়েছে। এ বছরও উৎপাদন গত বছরের চেয়ে সামান্য কমবেশি হবে বলে মনে করছে কৃষি বিভাগ।
গত বছর দাম কমে যাওয়ায় হিমাগার পর্যায়ে আলুর সর্বনিম্ন দাম বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, তবে তেমন কাজ হয়নি। এবার এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়েও আমার জানা নেই।-কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ মুনসুর আলম খান
পেঁয়াজের চাহিদা ও উৎপাদন প্রায় কাছাকাছি। এর মধ্যে কিছু পেঁয়াজ পচে নষ্ট হলে ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চারা, কন্দ ও বীজ মিলিয়ে ৪২ লাখ ৫০ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। ধারাবাহিকভাবে এ বছর ২ লাখ ৮৬ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৪২ লাখ ৬৪ হাজার ১০০ টন।
দেশে পেঁয়াজের চাহিদাও প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টন। তবে সংরক্ষণ সমস্যাসহ নানান কারণে পেঁয়াজ নষ্ট হয়। ফলে কিছু পেঁয়াজ ভারত থেকে আমদানি হচ্ছে।
গত বছরও বাড়তি উৎপাদনে আলুর দাম পায়নি চাষিরা। ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির কারণে ওই পণ্যেরও একই অবস্থা। তবে সেসব ক্ষতি পুষিয়ে দিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কৃষি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দুটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এর মধ্যে আলু চাষিদের জন্য নিয়মিত বরাদ্দের পাশাপাশি ১১০ কোটি টাকা ভর্তুকির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু প্রায় সাড়ে তিন মাস সময় পেরিয়ে গেলেও চাষিরা তা পাননি।
একই সময়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিয়েছিল, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে ৫০ হাজার টন আলু কিনবে। পরে সেই আলুও কেনা হয়নি। যে কারণে নতুন আলু উঠলেও এখনো কোল্ড স্টোরেজগুলোতে গত বছরের পুরোনো আলুও রয়ে গেছে।
দেশে এখন কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৮ থেকে সর্বোচ্চ ১০ টাকায়। যে আলু উৎপাদনে সেচ, সার, বীজ, শ্রমিক খরচ, নষ্ট আলু ও পরিবহন খরচ সমন্বয় করে প্রতি কেজির উৎপাদন খরচ হয়েছে সর্বনিম্ন ১৪ টাকা। অর্থাৎ, প্রতি কেজিতে আলুচাষিরা লোকসান গুনছেন ৪ থেকে ৬ টাকা। এর চেয়েও খারাপ অবস্থা পেঁয়াজের। এবার প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে সম্ভাব্য খরচ ৩৮ টাকা। সেখানে দেশের সর্বোচ্চ পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা পাবনায় সোমবার (৩০ মার্চ) পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে পাইকারিতে ১৮ থেকে ১৯ টাকায়। অর্থাৎ, মুনাফা দূরের কথা, ওই এলাকার পেঁয়াজ চাষিরা পাচ্ছেন খরচের অর্ধেক দাম।
পাবনার বাজারগুলোতে পেঁয়াজের দর মণপ্রতি ৭০০-৮০০ টাকা। সর্বোচ্চ ভালো পেঁয়াজের বাজার ৯০০ টাকা।
পাবনা সদর উপজেলার কোলচুরি গ্রামের পেঁয়াজ চাষি ইয়াসিন আলী বলেন, ‘গত বছরও আমরা পেঁয়াজে লোকসান দিয়েছি। এবারও ভাগ্য একই। মণপ্রতি পেঁয়াজে খরচ হয়েছে ১২০০-১৫০০ টাকা। এদিকে ৪২ কেজিতে মণ হিসেবে বর্তমানে পেঁয়াজের বাজার ৭০০-৮০০ টাকা। তিনি বলেন, অন্তত দুই হাজার টাকা মণ দর হলে কৃষকের চাষের খরচ পোষাবে। তা না হলে বছর বছর লোকসানে কৃষক মরে শেষ হয়ে যাবে। সরকারের প্রতি আমাদের দাবি, পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হোক, যেন আমরা বাঁচি।
আলু-পেঁয়াজে টানা দুই বছর লোকসানে কৃষকের ঘাড়ে ঋণের চাপ বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এটা পরবর্তী বছরগুলোতে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আমাদের অতি প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্য আলু ও পেঁয়াজ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। গত বছরের মতো চলতি বছরও ভালো ফলনে মাঠজুড়ে ছিল ফসলের হাসি। তবে উৎপাদন খরচের অর্ধেকও না ওঠায় কৃষকের ঘরে যেন চলছে কান্নার রোল। দাম না পেয়ে দিশাহারা কৃষক।
পাবনার পেঁয়াজের মান ভালো, কিন্তু সেখানকার চেয়েও দেশের উত্তরাঞ্চলের কিছু জেলায় পণ্যটির দামের অবস্থা আরও খারাপ। নওগাঁ, জয়পুরহাট, নাটোরসহ কিছু জেলায় এখন পেঁয়াজের কেজি ১০ টাকার নিচে বিক্রি হচ্ছে— এমন খবর মিলছে। ফলে ওইসব এলাকার পেঁয়াজচাষিরা চরম বিপর্যয়ে পড়েছেন এবার।
আগে বলা হয়েছে, এবার প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ ১৪ টাকা। এ হিসাব কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের (ডিএএম)। তবে হিমাগার মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে এবার আলু উৎপাদনের খরচ আরও ২ টাকা বেশি, কেজিপ্রতি ১৬ টাকা।
ডিএএম বলছে, পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ হচ্ছে ৩৮ টাকা প্রতি কেজি। পেঁয়াজের এ হিসাব গত বছরের। এবছর খরচ দু-এক টাকা কমবেশি হবে।
আলু চাষিদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও বেশ কয়েকজন চাষি খরচের হিসাবে একমত হয়েছেন। জয়পুরহাটের কাহালু উপজেলার কৃষক আবু হোসেন যে হিসাব গণমাধ্যমকে দিয়েছেন, তাতে তার এবার আলু উৎপাদন খরচ ১২-১৩ টাকা। তিনি এবার বর্গা নিয়ে সাড়ে নয় বিঘা জমিতে আলু আবাদ করেছিলেন। এজন্য তিনি জমির মালিকদের দিয়েছেন সাড়ে তিন লাখ টাকা।
এছাড়া আলুর বীজ, জমি তৈরির খরচ, সেচ ও কীটনাশক কেনাসহ বোনা এবং আলু ওঠানোর মজুরি দিয়ে বিঘাপ্রতি খরচ হয়েছে ৪০ থেকে ৪২ হাজার টাকা। তিনি বিঘাপ্রতি ফলন পেয়েছেন ৮২ মণ। তবে তিনি প্রতি বিঘায় ২০ থেকে ২২ হাজার টাকার বেশি দাম পাচ্ছেন না। ফলে অর্ধেক দামে আলু বিক্রি করে দিতে হচ্ছে।
চাষি আবু হোসেন বলেন, এখন আলু আমার গলার কাঁটা হয়ে গেছে। না ফেলতে পারছি, না গিলতে। গত বছরও আলুতে লোকসান হয়েছিল। দুই বছরের লোকসানে ঋণের চাপে এখন পথে বসার উপক্রম হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সভাপতি মো. আহসানউজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘খাদ্যপণ্যের কম দাম ভোক্তাদের জন্য সাময়িক স্বস্তির হলেও উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দাম কৃষকদের ভবিষ্যতে উৎপাদনে নিরুৎসাহিত করবে। তিনি পরামর্শ দেন, উদ্বৃত্ত পণ্য সরাসরি সংগ্রহ করা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, পরিবহন খরচ কমানো এবং হিমাগার সুবিধা বাড়ানোর মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের যথাযথ প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন।’
এসব বিষয়ে কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহাম্মদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এখন কৃষকদের যেসব সমস্যা হচ্ছে সেগুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছি। সেখানে কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য দাম না পাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। কৃষকদের ক্ষতি কীভাবে কমানো যায়, সেটা আমরা দেখছি।’
কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিষ্ঠান কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। তবে এ প্রতিষ্ঠান ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।
জানতে চাইলে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ মুনসুর আলম খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গত বছর দাম কমে যাওয়ায় হিমাগার পর্যায়ে আলুর সর্বনিম্ন দাম বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, তবে তেমন কাজ হয়নি। এবার এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়েও আমার জানা নেই।’
পেঁয়াজের দাম কমা নিয়ে কৃষকদের ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধসহ বেশ কিছু দাবি রয়েছে, যেগুলো তারা প্রতি বছরই জানিয়ে আসছেন। তবে সুনির্দিষ্ট কোনো মাধ্যম না থাকায় সে দাবি সরকারের কাছে পৌঁছায় না। গণমাধ্যমে উঠে আসে প্রায়শই।
বেশ কয়েকজন পেঁয়াজ চাষি বলেন, এখন ভরা মৌসুমে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা হচ্ছে। এ আমদানির কারণে স্থানীয় কৃষকরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দ্রুত এ আমদানি বন্ধ করতে হবে। প্রায় প্রতি বছরই অযথা আমদানির সিদ্ধান্ত যেন কৃষককে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, তার জন্য সঠিক ও স্থায়ী নীতি দরকার।
পাশাপাশি সার ও কীটনাশকের দাম কমানো এবং এ বছরের বৈরী আবহাওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বিশেষ সহায়তার দাবি করেন তারা।


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও