• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৪৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
অধস্তন আদালতে বিচারাধীন ৪০ লাখ ৪২ হাজার মামলা : আইনমন্ত্রী অদক্ষ ব্যক্তিদের হাতে রাষ্ট্র পড়লে জনগণের অনেক ভোগান্তি হয় : স্পিকার ক্ষমতার পরিবর্তনের চেয়ে মানসিকতার পরিবর্তন বেশি জরুরি: প্রধানমন্ত্রী বিচারিক দায়িত্ব ফিরে পেলেন বিচারপতি এস এম মনিরুজ্জামান আইনশৃঙ্খলার স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে ডিএমপি কমিশনারের নির্দেশ বিসিএস পরীক্ষার সিলেবাস পরিবর্তন করা হবে: জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে ১১ দলীয় জোটের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা আমার এলাকার হাসপাতাল ‘নিজেই একটা রোগীর মতো’: সংসদে রুমিন ফারহানা ২০৩৩ সালের মধ্যে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে: পানিসম্পদ মন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী চীন

বাংলা নতুন বছরের প্রথম প্রভাত- রমনার বটমূলে গান-কবিতায় ছায়ানটের বর্ষবরণ

প্রভাত রিপোর্ট / ৩৮ বার
আপডেট : মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬

প্রভাত রিপোর্ট : বাংলা নতুন বছরের প্রথম প্রভাত। ঘড়িতে তখন সকাল ৬টা ১৫ মিনিট। পুব আকাশ রক্তিম হয়ে উঠেছে। আকাশে মেঘ থাকায় আলোটা শান্ত, আবছা। এমন পরিবেশে রাজধানীর রমনার বটমূলে বসে শতাধিক শিল্পী সম্মিলিত কণ্ঠে গাইলেন ‘জাগো আলোক-লগনে’। আর এভাবেই বরণ করে নেওয়া হলো বাংলা নতুন বছর ১৪৩৩–কে। গানটিতে কণ্ঠ মেলান মিরাজুল জান্নাত সোনিয়া, ঐশ্বর্য সমাদ্দার, প্রিয়ন্ত দেব ও সমুদ্র শুভম। গানের কথা অজয় ভট্টাচার্যের। সুর করেছেন ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়।
অন্যান্য বছরের মতো এবারও রমনা বটমূলে নতুন বছর বরণের এই প্রভাতি আয়োজন করে দেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট।
সম্মিলিত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে ছায়ানটের এই আয়োজন শেষ হয়। এবারের আয়োজনের মূল ভাবনা ছিল ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’।
বর্ষবরণের এ আয়োজন দেখতে ভোর থেকেই আসতে শুরু করেন দর্শনার্থীরা। সময় যত গড়াতে থাকে, বাড়তে থাকে মানুষের উপস্থিতি। একসময় মানুষে কানায় কানায় পূর্ণ হয় বটমূল প্রাঙ্গণ। বটমূল ছাড়িয়ে রমনা পার্কের অন্যান্য জায়গাতেও বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। সবাই যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো উপভোগ করতে থাকেন বাংলা নববর্ষ বরণের এই আয়োজন।
সম্মেলক গানের পর ‘এ কি সুগন্ধহিল্লোল বহিল’ একক গান পরিবেশন করেন মাকছুরা আখতার অন্তরা। তারপর ‘তোমার হাতের রাখীখানি বাঁধো’ গান ধরেন আজিজুর রহমান।
সেমন্তী মঞ্জুরী গাইলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাজাও আমারে বাজাও’। কাজী নজরুল ইসলামের ‘অরুণকান্তি কে গো যোগী ভিখারি’ গানটি শোনান বিটু কুমার শীল। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘আজি গাও মহাগীত’ গান এককভাবে গান শ্রাবন্তী ধর।
লালন সাঁইয়ের ‘বড় সংকটে পড়িয়া দয়াল’ গানটি পরিবেশন করেন চন্দনা মজুমদার। জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের লেখা ‘এসো মুক্ত করো’ সম্মিলিত কণ্ঠে গাওয়া হয়।
ছোট ও বড়দের দল সম্মিলিত কণ্ঠে গাইলেন সলিল চৌধুরীর ‘সেদিন আর কত দূরে’ গানটি। ছোটদের দল গায় মতলুব আলীর লেখা ‘অলস হইওনা ভাই’ গানটি।
শুধু গান নয়, ছিল কবিতাও। সলিল চৌধুরীর কবিতা ‘এক গুচ্ছ চাবি’ আবৃত্তি করেন খায়রুল আলম। জাতীয় সংগীত আর কথন ছাড়া ২৪টি গান ও কবিতায় মুহূর্তেই যেন পেরিয়ে যায় ঘণ্টা দুয়েকের এ আয়োজন। পয়লা বৈশাখে রমনা বটমূলের আয়োজনে আসা দর্শনার্থীদের বেশির ভাগের পরনে ছিল শাড়ি আর পাঞ্জাবি। শিশু-কিশোরী ও নারীরা পরেন লাল-সাদা শাড়ি। ছেলেদের পাঞ্জাবিতে ছিল লাল–সাদার ছোঁয়া।
শিশু, কিশোর-কিশোরীদের কারও কারও গালে ছিল ‘বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩’ লেখা আলপনা। আয়োজন উপভোগ করেন বিদেশি অতিথিরাও।
স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে এ আয়োজনে এসেছিলেন লোমান গোমেজ। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ১৩ বছর পর বাংলা নববর্ষে ছায়ানটের আয়োজন দেখতে এসেছেন। এত দিন নানা কারণে আসা হয়নি। আজকের আয়োজন ভালো লাগছে। মায়ের কোলে বসে গান শুনছিল ৯ বছরের বেনেডিট এল ডি গোমেজ। লাল-সাদা পাঞ্জাবি পরা বেনেডিট বলল, এবারই প্রথম এসেছে। এমন সুন্দর পরিবেশে গান শুনতে খুব ভালো লাগছে।
ছায়ানটের এ আয়োজনের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি দেখা গেছে। বিজিবি, পুলিশ, সোয়াত, র‍্যাব, এপিবিএন, ডিবিসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা অনুষ্ঠানস্থলে দায়িত্ব পালন করেন।
আয়োজনের একেবারে শেষে বক্তব্য দেন ছায়ানট সভাপতি সারওয়ার আলী। অপশক্তি আবহমান বাংলা গানকে তার সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার থেকে শিকড় বিচ্ছিন্ন করতে উদ্যত বলে মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, শুনতে চান সমাজের অভয়বাণী—সবাই যেন নির্ভয়ে গাইতে পারে। যেন সংস্কৃতির সব প্রকাশ নির্বিঘ্ন হয়। বাঙালি যেন শঙ্কামুক্ত জীবন যাপন করে।
ছায়ানট সভাপতি বলেন, ‘পয়লা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতি তথা জাতিসত্তা উন্মোচনের এক বিশেষ দিন। বিগত ছয় দশকের মতো এই দিনে আমরা সব গ্লানি, জরা মুছে ফিরে দেখি ফেলে আসা বছরকে। গত বছরেও রমনায় নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠিত হয়েছে নববর্ষের অনুষ্ঠান। ১৬ ডিসেম্বর উন্মুক্ত মঞ্চে হলো বিজয় দিবসের আয়োজন। তার দুই দিন পরই গভীর রাতে ছায়ানট সংস্কৃতি–ভবনে ভাঙা হারমোনিয়াম-তবলা-তানপুরা এবং নালন্দার ছিন্নবিচ্ছিন্ন শিশুপুস্তকের দুঃসহ স্মৃতি। সেই রাতেই অগ্নিসংযোগ করা হয় দুই শীর্ষ সংবাদপত্র ভবনে। পরদিন আক্রান্ত উদীচী। এই সহিংস ঘটনাবলির কদিন আগেই অপদস্থ হয়েছেন বাউলশিল্পীরা। স্মরণে জেগে ওঠে এই বটমূলে ২০০১ সালের ভয়াবহ অঘটন।’
সারওয়ার আলী বলেন, যে সংগীত বাঙালির আনন্দ-বেদনা-মিলন-বিরহ-সংকটের সঙ্গী; মুক্তিযুদ্ধ থেকে সব অধিকার অর্জনের অবলম্বন; সব ধর্ম-জাতির মানুষকে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করে; কোনো অপশক্তি ভয় দেখিয়ে সেই সংগীত থেকে শান্তিপ্রিয় মানুষকে নিরস্ত করতে চায়। তারা আবহমান বাংলা গানকে তার সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার থেকে শিকড় বিচ্ছিন্ন করতে উদ্যত। সমাজে বেড়েছে অসহিষ্ণুতা। বেড়েছে আপন মত প্রকাশে দলবদ্ধ নিগ্রহের শঙ্কা।
মার্কিন-ইসরায়েলি নিগ্রহে আজ পারস্য সভ্যতাও ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন বলে উল্লেখ করেন ছায়ানট সভাপতি। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববাসী আজ বিপর্যস্ত ও আতঙ্কিত। স্বদেশে আজ নতুন বছরের প্রথম প্রভাতে সবাই কামনা করে বিশ্বশান্তি। শুনতে চাই, সমাজের অভয়বাণী—যেন সংবাদকর্মীরা নির্ভয়ে প্রকৃত মত প্রকাশ করতে পারেন; সবাই যেন নির্ভয়ে গাইতে পারি; যেন সংস্কৃতির সব প্রকাশ নির্বিঘ্ন হয়—বাঙালি শঙ্কামুক্ত জীবন যাপন করে।’
সারওয়ার আলী বলেন, ‘এমন এক মাতৃভূমির স্বপ্ন দেখি: “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির/ জ্ঞান যেথা মুক্ত, গৃহের প্রাচীর।”’


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও