প্রভাত রিপোর্ট: আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে সারাদেশে শুরু হচ্ছে ২০২৬ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা। এবারও পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে লাখো শিক্ষার্থী। তবে পরীক্ষার আগেই ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকেরা।
দেশে চলমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে বৈশাখের তীব্র গরমে বাড়তি ভোগান্তিতে পড়েছে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিনের পাশাপাশি রাতেও বিদ্যুৎ বিভ্রাট অব্যাহত থাকায় পড়াশোনার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছে শিক্ষার্থীরা।
দেশের একাধিক এলাকায় বসবাসকারী শিক্ষার্থীদের পরিবার জানায়, রাতে যখন পরীক্ষার প্রস্তুতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়, তখনই বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। ফলে কেউ মোমবাতি, কেউ চার্জার লাইট, আবার কেউ হাতপাখা নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু তীব্র গরম ও অস্বস্তিকর পরিবেশে দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। জেলার অন্য উপজেলায়ও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দিনে কয়েকবার এবং রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পরীক্ষার প্রস্তুতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ঠিক পরীক্ষার আগমুহূর্তে বিদ্যুতের এমন অনিয়মিত সরবরাহে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরীক্ষার্থীরা। সন্ধ্যার পর পড়তে বসলে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে। অনেক এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে শিক্ষার্থীরা। এতে মানসিক চাপও বাড়ছে তাদের। অভিভাবকদের দাবি, অন্তত পাবলিক পরীক্ষার সময়টুকুতে যেন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়। কারণ কয়েক ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাটও একজন পরীক্ষার্থীর প্রস্তুতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে সন্ধ্যা ও রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। শহর থেকে গ্রাম-সব জায়গাতেই এখন লোডশেডিংয়ের প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
এদিকে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ১ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৮ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ছাত্র ৫৬ হাজার ৩২৫ জন এবং ছাত্রী ৭৪ হাজার ৩৪৩ জন। শুধু চট্টগ্রাম জেলা থেকেই পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ৯২ হাজার ২৯৬ জন শিক্ষার্থী।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আমাদের পড়াশোনা সন্ধ্যা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত। মূলত, ওই সময়েই বিদ্যুৎ থাকে না। তাহলে আমরা কীভাবে প্রস্তুতি নেবো। সারাদিন মিলে তো ৪ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে না। এই গরমে পড়াশোনায় মনোযোগ রাখতে কষ্ট হচ্ছে।
একই অভিযোগ অভিভাবকদের, তাদের মতে লোডশেডিংয়ের কারণে বাচ্চারা তাদের পড়াশোনায় মনস্থির করতে পারছে না। তাদের প্রস্তুতিতে যে সময় দেওয়া দরকার সেটা যথাযথভাবে দিতে পারছে না। ফলে তাদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফলেও প্রভাব ফেলতে পারে। আমরা সরকারের কাছে দ্রুত বিদ্যুতের সুরাহার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
নগরীর অপর্ণাচরণ সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থী নাছরিন জানায়, সন্ধ্যায় পড়তে বসলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বদিরুজ্জামান স্মৃতি শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষার্থী রিজভী জানায়, সারাদিন মিলে আমাদের উপজেলায় সর্বোচ্চ ৪ ঘণ্টা কারেন্ট থাকে। বাকি সময় চার্জার লাইট-ফ্যান চালিয়ে পড়তে হয়। নগরের বাকলিয়া সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শোয়েবুল ইসলাম বলে, রাতে পড়তে বসলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। প্রচণ্ড গরমে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় চার্জার ফ্যানও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পড়ালেখায় প্রচুর ব্যাঘাত হচ্ছে।
রাউজান ছালামত উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আফরোজা জানিয়েছে, রাতে দুই ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে না। বিদ্যুৎ এলেও ২০-২৫ মিনিটের বেশি থাকে না। দিনে-রাতেই একই অবস্থা চলছে। তীব্র গরমে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছি না। তাই প্রস্তুতি আশানুরূপ হচ্ছে না।
নগরের নাসিরাবাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মো. উল্লাহ বলেন, পরীক্ষার ঠিক আগে এমন বিদ্যুৎ সংকট শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে ফলাফলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে আমার বাচ্চা ঠিকঠাক পড়তে পারছে না। ফলে এটা তার ফলাফলে প্রভাব পড়তে পারে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে বর্তমানে ১০টি বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া ও জ্বালানি সংকটের কারণে এসব কেন্দ্র উৎপাদনে নেই।
স্কাডার তথ্য অনুযায়ী বন্ধ থাকা কেন্দ্রগুলোর তালিকায় রয়েছে- এনলিমা (১১৬ মেগাওয়াট), জুডিয়াক (৫৪ মেগাওয়াট), জুলধা-২ ও ৩ (প্রতিটি ১০০ মেগাওয়াট), রাউজান ১ ও ২ (প্রতিটি ২১০ মেগাওয়াট) এবং কক্সবাজারের উইন্ড প্ল্যান্ট।
পিডিবির চট্টগ্রামের প্রধান প্রকৌশলী মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, উৎপাদন ঘাটতি এবং চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সাময়িকভাবে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। গ্যাস সংকটের কারণে কয়েকটি কেন্দ্র বন্ধ থাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। গ্যাস ও জ্বালানি স্বাভাবিক হলে আশা করছি লোডশেডিং কমে আসবে।
চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ চাহিদা কত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামে মোট বিদ্যুৎ চাহিদা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। আজ ১৫০ মেগাওয়াট কম পেয়েছি। তবে প্রায় সময় চাহিদার চেয়ে ১৫০-৩৫০ মেগাওয়াট কম পাই।’