• বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
উপকূলবাসীকে রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে: পানিসম্পদমন্ত্রী ‘শ্রম আইনের ওপর বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য অনেকাংশে নির্ভর’ এআইনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাসহ ৯ অ্যাপ-সফটওয়্যার চালু জামায়াত নিজেই স্বীকার করে নিয়েছে কারা খুনি-ধর্ষক ছিল: আইনমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তি সংসদে আনা হোক: রুমিন ফারহানা দুই অঙ্ক থেকে কমিয়ে সুদহার বিনিয়োগবান্ধব করা হবে: বাণিজ্যমন্ত্রী দাম বাড়লো সয়াবিন তেলের ‘মিনার-ই-দিল্লি’ সম্মাননায় ভূষিত রুনা লায়লা জুলাই থেকে ফ্রি ড্রেস-ব্যাগ-জুতা পাবে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা ৩৫ বছর পরও উপকূলে আতঙ্ক: ১৯৯১-এর ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষত আজও শুকায়নি

সেদিন শক্ত প্রতিরোধ গড়েছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

প্রভাত রিপোর্ট / ১৭৫ বার
আপডেট : শুক্রবার, ১৮ জুলাই, ২০২৫

প্রভাত রিপোর্ট: ২০২৪ সালের ৫ জুন সরকারি চাকরির নিয়োগ ব্যবস্থায় কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে চলমান আন্দোলনের মাঝেই ২০১৮ সালে সরকারের জারি করা পরিপত্রকে বাতিল ঘোষণা করে উচ্চ আদালত। এ রায় ঘোষণার পরপরই শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসেন। ১৮ জুলাই আসে প্রতিরোধের ডাক। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক যে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলছিল, ১২ জুলাইয়ের পর থেকে ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হতে থাকে। ১৫ জুলাই ছাত্রলীগ হামলা করে শিক্ষার্থীদের ওপর, পুলিশ হামলা করে মেয়েদের ওপর, তার আগেও তারা হামলা করেছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, কোটা নিয়ে আন্দোলনের প্রতি তাদের খুব একটা আগ্রহ ছিল না। কারণ খুব বেশি শিক্ষার্থী কোটা ব্যবহার করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করে না। বেশ কিছু আক্রমণের ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর, বিশেষ করে মেয়েদের ওপর আক্রমণ নিপীড়নের ঘটনা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চেতনায় প্রচণ্ড আঘাত করে। তখন পুরো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে ১৮ জুলাই মাঠে নামেন। এর আগে ১৫ জুলাই থেকে বেশ কিছু জায়গায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মিছিল হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে— ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, মিরপুরের বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউবিটি), ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। এভাবেই ছোট ছোট প্রতিবাদ শুরু হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে। ১৬ জুলাই যখন রংপুরে শিক্ষার্থী আবু সাঈদ শহীদ হলেন, ওই দৃশ্য সারা দেশের মানুষকে নাড়া দিয়েছে। ওই ঘটনার পর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এবং প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশ (পুসাব) মাঠে নামার ঘোষণা দেয়।
কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে সারা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন তারা। সরকার এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলেও শিক্ষার্থীরা সেই রায়ের জন্য অপেক্ষা করতে অস্বীকার করেন এবং কোটা বাতিলের নতুন নির্বাহী আদেশের দাবি জানান।
২০২৪ সালে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন একসময় রূপ নেয় গণআন্দোলনে। শিক্ষার্থীদের ওপর দমন নিপীড়নের কারণে আন্দোলন হয় তীব্র থেকে তীব্রতর। কোটা সংস্কারের দাবিতে যে আন্দোলন ছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ— সেই আন্দোলন একপর্যায়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে যায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার মাধ্যমে। কবিতার মতোই ভীষণ রাগে ‘যুদ্ধ’ হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভাষ্য— এই রাগ ছিল সহপাঠীদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে।
একই বছরের জুন মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করেন।
এরপর জুলাই মাসে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের’ ব্যানারে শিক্ষার্থীরা অবস্থান কর্মসূচি, বিক্ষোভ, সমাবেশ এবং সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। ৭ জুলাই থেকে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। পরদিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বর্তমানে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) এবং টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অবস্থান, বিক্ষোভ সমাবেশ ও রাস্তা অবরোধ করে আন্দোলন করতে থাকেন।
আন্দোলনের দিনগুলো যত গড়িয়ে যায়, কর্মসূচি আরও কঠোর হতে থাকে। ঘোষণা আসে ‘বাংলা ব্লকেড’-এর। এতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সীমিত সময়ের জন্য সড়ক মহাসড়ক অবরোধ করা হয়। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীরা রাজধানীতে অবরোধ কর্মসূচি পালন করায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থবির হয়ে পড়ে ঢাকা মহানগরী। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সারা দেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা।
রেলপথ, সড়কপথ অবরোধের মধ্যে দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যান শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি অবস্থান কর্মসূচি চলতে থাকে। এরপর ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আরও উত্তপ্ত হয় শিক্ষাঙ্গন। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা মধ্যরাতে প্রতিবাদ জানিয়ে মিছিল করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করা হয়। এতে বেশ কিছু শিক্ষার্থী আহত হন। ১৫ জুলাই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হয়। এর মধ্যে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। হামলার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা সারা দেশে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের ডাক দেন।
শুরুতে এ আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পরে তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। আন্দোলন দমাতে সরকারের তরফে গুলি, টিয়ারশেল, লাঠিসহ বলপ্রয়োগ করা হয়। প্রথমে ফেসবুক, পরে ইন্টারনেট বন্ধ করে পরিস্থিতি সামাল দিতে চায় সরকার। তাতে হিতে বিপরীত হয়। ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হন। তাকেই এ আন্দোলনের ‘প্রথম শহীদ’ হিসেবে সম্মান জানানো হয়।
শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গায়েবানা জানাজার চেষ্টা করা হয়। ১৭ জুলাই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে হল ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর বিপরীতে আন্দোলনকারীরা ঘোষণা দেন ‘কমপ্লিট শাটডাউন’। আন্দোলনে যুক্ত হন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ১৮ জুলাই সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
পুসাবের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুলাহ আল মাহফুজ জাকারিয়া সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের গুলি করে মেরে ফেলবে—এমনটা হতে দেওয়া যায় না। গত বছরের ১৬ জুলাই একদিনে সাত জন নিহত হন। আমরা আগে দেখেছি, রাজনৈতিক দল আন্দোলন করছে, কিন্তু সেগুলো সাধারণ মানুষকে ওইভাবে যুক্ত করেনি। যখন একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর গায়ে বুলেট মারা হয়েছে— এই ঘটনা আমাদের মানসিকভাবে পীড়া দিয়েছে। তখন ১৬ জুলাই আমরা সমন্বিতভাবে সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে আহ্বান জানাই। ১৭ জুলাই অল্প কিছু শিক্ষার্থী মাঠে নামার চেষ্টা করেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তখন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। কিছু কিছু জায়গায় ছাত্রলীগ সেসব কর্মসূচিতে হামলা করলো। তারা মিরপুরে বিইউবিটি’র শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে, ক্যাম্পাসেও হামলা করে ভাঙচুর চালায়। আমরা দেখলাম, আক্রমণ যে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হচ্ছে তা না, আমাদের ওপরেও হামলা হচ্ছে। সব ঘটনা মিলিয়ে ১৬ জুলাই রাতে সিদ্ধান্ত হয়—আমরা পূর্ণশক্তি দিয়ে আন্দোলনের দিকে যাবো।’ তিনি বলেন, ‘১৫ জুলাই রাতে প্রাথমিক ঘোষণা হয়। আর ১৬ জুলাই আমরা সিদ্ধান্ত নিই আন্দোলনে নামার। ১৭ জুলাই গায়েবানা জানাজার কর্মসূচি রেখেছিলাম। পুলিশ এসে এই কর্মসূচি বানচাল করে দেয়। জানাজা পড়াতে যারা আসছিলেন, তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছিল। ওইদিন বিকাল থেকে রামপুরা এলাকার ব্র্যাক, ইস্ট ওয়েস্ট, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ান। অপরদিকে বসুন্ধরা এলাকায় নর্থ সাউথ, আইইউবি , এআইইউবি’র শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ শুরু করেন। এভাবে মিরপুর একটা জোন, উত্তরা ও ধানমন্ডি জোন আছে। এরা সবাই নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করা শুরু করেন। আর আমরা পুসাবের পক্ষ থেকে সবার সঙ্গে একটা কমন নেটওয়ার্ক তৈরি করে দেই, যাতে কেন্দ্রীয়ভাবে একটা কৌশলের মধ্য দিয়ে যায়। এর ফলে ১৮ জুলাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পূর্ণশক্তি নিয়ে মাঠে নামেন।
আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষার্থীরা জানান, ১৮ জুলাই সকালে উত্তরায় নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আসিফ শহীদ হন, একদম পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে টার্গেট করে গুলি করে ঝাঁজরা করা হয়। এ ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আরেকটি ঘটনা ঘটে। ওখানে ইম্পেরিয়ালের একটি ছেলে নাম জিল্লুর, ব্র্যাককে সাহায্য করার জন্যই ইম্পেরিয়ালের শিক্ষার্থীরা সামনে এসেছিলেন। জিল্লুর এসে জানালো যে ‘আমরা তো ইউনিফর্মে আছি, আমাদের দেখলে গুলি করবে না’। ওই অবস্থায় তাকে টার্গেট করে পুলিশ গুলি করে এবং সে মারা যায়। এরপর তার লাশ ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ভেতরে নিয়ে যান শিক্ষার্থীরা। এসময় ‘আমার ভাইকে মাইরা ফেলছে’ বলে চিৎকার করে কাঁদতে থাকেন একজন নারী শিক্ষার্থী। সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি আসলে ব্র্যাকের সামনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে হয় বলে মনে করেন তারা।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর বড় ধরনের আক্রমণ করে পুলিশ ছত্রভঙ্গ করে দেয়। তখন সেদিকে এগিয়ে আসেন ইস্ট ওয়েস্টের শিক্ষার্থীরা। অপরদিকে নর্থ সাউথ এবং ইউআইইউ’র শিক্ষার্থীরাও চলে আসেন। ব্র্যাকের সামনে তারা সবাই প্রতিরোধ গড়ে তুলে পুলিশকে পিছু হটতে বাধ্য করেন।
১৮ জুলাই মেরুল বাড্ডায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুলিশের সঙ্গে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ চলে। একপর্যায়ে কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে যায় পুলিশ। বাইরে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর থেকেই পুলিশ ছররা গুলি ও রাবার বুলেট ছোড়ে। এতে আহত হন অনেকে। সেদিন প্রতিরোধের মুখে কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে আটকা পড়ে যান পুলিশের কিছু সদস্য। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাদ থেকে হেলিকপ্টার দিয়ে উদ্ধার করতে দেখা গেছে।
জাকারিয়া বলেন, ‘ব্র্যাকের সামনে পুলিশের আক্রমণ প্রতিহত করতে যখন ইস্টওয়েস্ট, নর্থ সাউথ এবং ইউআইইউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছুটে আসেন, তখন একপর্যায়ে পুলিশ পিছু হটতে বাধ্য হয়। প্রতিরোধের মুখে কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাদ থেকে হেলিকপ্টারে করে পুলিশকে উদ্ধার করা হয়। পুলিশকে ঠেকিয়ে দেওয়ার এ বিষয়টা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস এনে দেয়—আমরা প্রতিরোধ করতে সক্ষম। এরপর থেকেই কিন্তু আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের সঙ্গে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কোনও ধরনের যোগাযোগ ছিল না। যোগাযোগের সংযোগ আরও পরে তৈরি হয়েছে। ১৮ জুলাই পুরো ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটের মতো বড় বড় শহরগুলোতে পুরোপুরি প্রতিরোধ ছিল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত পরিবারের। এ শিক্ষার্থীরা যখন মাঠে নামেন, তখন আশপাশের স্কুল-কলেজের মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও আত্মবিশ্বাসী হয়ে মাঠে নেমে যান। এ সম্মিলিত প্রতিরোধ দেখে অনেক কর্মজীবী মানুষ আন্দোলনে যুক্ত হন। এরই ধারাবাহিকতায় অভিভাবকরা মাঠে নামেন। এই যে ধাপে ধাপে প্রতিটি স্তরের মানুষের মধ্যে একটা সংযোগ—এটা তৈরিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ’
১৮ জুলাই প্রতিরোধ শুরুর পর সারা দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করেন বলে জানান আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্তরা। আন্দোলনের আপডেট, কর্মসূচি, করণীয় নির্ধারণে ব্যবহার করা হয় হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপ। সারা দেশের এসব তথ্য এক জায়গায় করে প্রচারের কাজটি করে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশ (পুসাব) প্ল্যাটফর্ম। তাদের ফেসবুক পেজে এ সংক্রান্ত আপডেট সারা দিন পোস্ট করা হতো। এছাড়া বিভিন্ন জায়গায় প্রতিরোধের ছবি, ভিডিও, কর্মসূচির আপডেট এ পেজ থেকেই সবার জন্য পোস্ট করা হতো—সারা দেশের মানুষকে জানানোর জন্য।
শিক্ষার্থীরা জানান, ১৮ জুলাই মূল প্রতিরোধের দিনেই সারা দেশে ২২-২৩ জন শহীদ হন। এরপর যখন ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সারা দিনের হত্যাযজ্ঞ দেখার পর নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার গেট থেকে শুরু হয় একদফার স্লোগান। সরকার পতনের স্লোগান তখন শুরু হয়।
জাকারিয়া জানান, একদফা ঘোষণার পর থেকে তৎকালীন সরকারের সরাসরি টার্গেটে পড়ে যাই আমরা। ইন্টারনেট বন্ধ হওয়ার পর থেকে চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রত্যেক দিন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসাবাড়িতে আমাদের কেউ না কেউ থাকতো। সেখানের বাসাবাড়ির মেস থেকে অভিযান চালিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিভিন্ন এজেন্সি তুলে নিয়ে যায়। তাদের অনেককে নির্যাতন করা হয়। এত কিছুর পরও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাঠ ছেড়ে দেননি। তারা কিন্তু কেউ রাজনীতি করছেন না। তাদের মনমানসিকতা এমনভাবে তৈরি হয়েছে— ‘আমার ভাইবোনকে মেরে ফেললো! এই যে অন্যায়ভাবে মেরে ফেলা হয়েছে, এর বিচার না করে আমি রাস্তা ছাড়তে পারি না। একটাই কারণ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার— আমার ভাইকে গুলি করে যে মারা হয়েছে, এর শেষ আমরা দেখে ছাড়বো। এ কারণেই শেষ দিন পর্যন্ত তারা রাস্তায় ছিল।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাকিন শাবাব নিজেও আন্দোলনে সরাসরি অংশ নিয়েছেন। আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য যোগাযোগ করেছেন বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘১৫ জুলাই রাতে আমাদের ব্র্যাকের কয়েকজন জুনিয়র শিক্ষার্থী আন্দোলন নিয়ে আলোচনা করেন। শিক্ষার্থীদের গায়ে হাত দিয়ে ফেললো। এ নিয়ে করণীয় কী, এসব বিষয় নিয়ে তারা আলোচনা করেন। তখন সিদ্ধান্ত হয়—তারা ১৬ জুলাই ব্র্যাক থেকে একটা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করবেন। আমার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খুব ভালো ছিল। আমি তাদের সঙ্গে কথা বললাম। আমি যেহেতু সিনিয়র ছিলাম, তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে, ভেতর-বাইরের চাপ সামলায়ে সেদিনের প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করলাম। ১৭ জুলাই দেখলাম, সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মোটামুটি বন্ধ হয়ে গেছে। ১৮ জুলাই আমরা যে নামবো, তখন আমাদের ব্র্যাকের সমন্বয়কদের সঙ্গে আলাপ করে দেখলাম—মানুষ কম হয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ধরপাকড় শুরু হয়ে গেছে। অনেকে ভয় পেয়ে লুকিয়ে গিয়েছিল, কেউ কেউ গ্রামের বাড়ি চলে গিয়েছিল। সেসময় চিন্তা করলাম, আমরা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলি।’ তিনি বলেন, ‘আমি ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রথমে যোগাযোগ করি। সে সময় তো আন্দোলনের নেতৃত্বে, কিংবা সমন্বয় করার মতো কেউ ছিল না। আন্দোলনের সামনের সারিতে যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে একজনকে পেলাম ইস্ট ওয়েস্টের নাঈম আবেদীন, নর্থ সাউথ থেকে পেলাম কাওসার হাবীব, আইইউবি থেকে তালহাদের পেলাম। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। সবার সঙ্গে ফোনে আলাপ হয়েছে। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম আমি, ব্র্যাকের আরেক সমন্বয়ক ফরিদ এবং নাঈম। আমরা সবাইকে বলছিলাম, যার সঙ্গেই কথা হবে তাকে যেন বলা হয়— আরও কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। এভাবে যোগাযোগ করে একটা নেটওয়ার্ক স্থাপন হলো। তারপর আমরা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আলাপ শুরু করলাম। সেখানে আমরা সমন্বয় করলাম ১৮ জুলাই কীভাবে কী করবো। সেদিন সকালে ব্র্যাকের মতো একটা পরিস্থিতি তৈরি হলে রাতে আমরা বাসায় এসে মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিলাম—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করবো। তখন অনেকে আত্মগোপনে ছিলেন। আমাদের মধ্যে কেউ না কেউ সারজিস আলমের সঙ্গে পথে দেখা করে। সরাসরি রিফাত রশিদ, হাসিব, উমামাসহ অনেকের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ শুরু হয়। এভাবেই একটা সমন্বয় তৈরি হলো।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, যেহেতু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ঢাকা শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। এ অবস্থান থাকার কারণে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো ব্লক করার ক্ষেত্রে সহায়ক ছিল। ১৮ জুলাই শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর প্রতিরোধ গড়ে তোলার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হয়। একপর্যায়ে নাহিদ ইসলামসহ কোটা সংস্কার আন্দোলনের পাঁচ জন কেন্দ্রীয় সমন্বয়ককে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়। তারপরও আন্দোলন থেমে থাকেনি। অন্য সমন্বয়কদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করে এই আন্দোলন চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেট বন্ধের মধ্যেও যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছিলেন। কোথাও এসএমএস কিংবা কোথাও সরাসরি ভিন্ন ভিন্ন নম্বর থেকে ফোন কলে সমন্বয় করা হতো। আবার কিছু কিছু এলাকাভিত্তিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল। তারা গোপনে চায়ের দোকানে মিলিত হয়ে আন্দোলনের করণীয় এবং কর্মসূচির আপডেট শেয়ার করতেন।
সাকিন শাবাব জানান, তাদের সেকেন্ড প্ল্যান ছিল, আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওদেরও সেকেন্ড প্ল্যান ছিল। আমাদের তিনটি স্তর ছিল। প্রথম স্তরের যদি কিছু হয়, দ্বিতীয় স্তর আন্দোলন চালাবে। এভাবে আমরা আরেকটা গ্রুপকে সব সময় প্রস্তুত রেখেছিলাম। যার পরিপ্রেক্ষিতে নাহিদ, সারজিস, হাসনাতদের যখন ডিবি তুলে নিয়ে যায়—তখন সেকেন্ড লেয়ারে হাসিব, আবু বাকের মজুমদার ছিল, তাদের সঙ্গে আলাপ করে সমন্বয় করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ইন্টারনেট বন্ধের সময় আমরা কারও সঙ্গেই ওভাবে যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। আমি এবং ব্র্যাকের সমন্বয়ক আমরা মিরপুরের দিকে থাকতাম। কারণ আমরা দেখছিলাম—যেসব জোনে আন্দোলন চলছে, ওসব এলাকা থেকে তাদের আটক করে। আমি মিরপুরে আন্দোলন করিনি। সেহেতু আমাকে ধরতে পারেনি। আমাদের বাসা থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে একটা বাসায় আমরা কয়েকজন একসঙ্গে ছিলাম। আমরা এক-একদিন এক জায়গায় আন্দোলনের সমন্বয় করেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছিল। সবই ছিল ফোনে ফোনে। আমার অনেক টাকা গেছে ফোনের পেছনে, কত টাকা আসলে হিসাব নেই। প্রতিদিন অন্তত ৩ হাজার টাকা ফোনের পেছনে যেতো। পাশাপাশি সিম পাল্টাতে হতো। কয়েকটা সিম ব্যবহার করতাম।’
কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে আলাপে তারা জানান, এটা আমাদের ব্যক্তিগত মতামত না, এখন সবাই বলছে— প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টরা না থাকলে এটা সম্ভব হতো না। সবাই জানে, এই শিক্ষার্থীরা আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু এখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছাড়া মাদ্রাসা, আলেম সমাজও ছিল। এছাড়া একটা বড় গ্রুপ ছিল পথশিশুদের, যাদের ঘরবাড়ি পথে। এদের আসলে বাদ দেওয়া যাবে না। মূলত সবাই সবার জায়গা থেকে এগিয়ে এসেছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নেমেছিল বলেই সম্ভব হয়েছে। যদিও তারা উপেক্ষিত, কিন্তু কিছু করার নেই।
আব্দুলাহ আল মাহফুজ জাকারিয়া বলেন, ‘৩৬ জুলাই (৫ আগস্ট) আসার পেছনে ১৮ জুলাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যখন নিপীড়নের মুখে হাল ছেড়ে দিয়ে হলগুলো খালি করতে বাধ্য হলো, তখন কিন্তু সবাই মোটামুটি ধরে নিয়েছিল, আন্দোলন শেষ। ওই পর্যায়ে ১৮ জুলাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যদি মাঠে নেমে না আসতেন, তাহলে ৩৬ জুলাই আসতো না। কারণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা যেভাবে রাস্তায় নেমে এসেছেন, তাদের দেখাদেখি রাস্তায় সাধারণ মানুষ, মাদ্রাসার ছাত্ররা পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। ৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশের বিভাগীয় বড় শহরগুলোতে আন্দোলনের নেতৃত্ব মোটাদাগে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে ছিল। এই নেতৃত্ব যার যার জায়গা থেকে হয়েছে। কেন্দ্রীয় কোনও আদেশে হয়নি। যে যেভাবে পেরেছে তার জায়গা থেকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কারীরা পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করেন— ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ৩ আগস্ট অনির্দিষ্টকালের জন্য সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়। এরপর ৪ আগস্ট ঘোষণা দেওয়া হয় ৬ আগস্ট ঢাকা অভিমুখে লং মার্চের। কিন্তু হঠাৎ লং মার্চের সিদ্ধান্ত একদিন এগিয়ে নিয়ে এসে ৫ আগস্ট করা হয়। ৫ আগস্ট দুপুরে তীব্র আন্দোলনের মুখে খবর আসে, ‘পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’।


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও