প্রভাত রিপোর্ট: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে ‘রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার মতভিন্নতায় হতাশ হওয়ার কিছু নেই’ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রবিবার (২০ জুলাই) রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে জিয়া উদ্যানে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধনকালে তিনি এ মন্তব্য করেন। জাতীয়তাবাদী কৃষক দল ও আমরা বিএনপি পরিবারের উদ্যোগে জুলাই অভ্যুত্থান উপলক্ষে ‘গণঅভ্যুত্থান ২০২৪ জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা সবুজ পল্লবে স্মৃতি অম্লান কার্যক্রম’ শীর্ষক নিম গাছ রোপণের এই কর্মসূচি করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর জিয়াউর রহমানের সমাধি সংলগ্ন জিয়া উদ্যানে শহীদদের নিয়ে শহীদ সৈকত ও শহীদ আবু সাইদের নামে দুইটি নিম গাছ রোপণ করেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, ‘এখানে একজন শহীদের পিতা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘‘আমরা আশা করেছিলাম গণঅভ্যুত্থানের পরে অতি দ্রুত রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত হবে, রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হবে, আমরা একটা নতুন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারবো।’’ বিষয়টা হলো, রাজনীতিটা অত সহজ পথ নয়… গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো থাকে না… এখানেও সমস্যা থাকবে, সেটাই রাজনীতি। কিন্তু এতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, ভিন্নমত থাকবে, বহুমাত্রিক পথ থাকবে, কেউ গণতন্ত্রের বিশ্বাস করবে, কেউ সমাজতন্ত্রের বিশ্বাস করবে, কেউ ওয়েলফেয়ার স্টেটে বিশ্বাস করবে… সবগুলোকে মিলিয়ে আমরা রেইনবো স্টেট একটা রংধনু… অনেকগুলো রং নিয়ে রংধনু ওঠে… সে রকম একটা রাষ্ট্র নির্মাণ করতে অনেক আগেই আমাদের বেগম খালেদা জিয়া সেই স্বপ্ন দেখেছিলেন।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ৩১ দফা দিয়েছেন। সেই ৩১ দফার মধ্যে প্রতিটি কথা… আজ যে সংস্কারের প্রশ্নটা উঠেছে, সংস্কারের যে প্রস্তাবগুলো আসছে, তার প্রত্যেকটি প্রস্তাব আমরা ২০২২ সালে দিয়েছি।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমার কতজন শহীদ হয়েছেন, আমার কতজন নিহত হয়েছেন, আমরা কত ত্যাগ স্বীকার করেছি, কারা কী কাজ করেছি– এই বিতর্কে আমি যেতে চাই না। কারণ ওটা আমার কাছে মনে হয়, স্বার্থপরতার একটা ব্যাপার আছে। আমার দায়িত্ব হলো, এই জাতিকে আমাকে ওপরে তুলতে হবে। যে প্রাণগুলো গেছে, যারা জীবন দিয়েছে তারা কিন্তু জীবন দিয়ে ঘোষণা করেই দিয়েছেন তারা ফ্যাসিস্টকে সরিয়ে জাতিকে একটা স্বাধীন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চান।’ তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য একটাই, আমরা সত্যিকার অর্থে একটা উদারপন্থি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণ করতে চাই, আমরা নতুন বাংলাদেশ চাই, পরিবর্তন চাই। আমরা দুর্নীতি চাই না, ঘুষ চাই না, আমরা হত্যা চাই না, নির্যাতন চাই না। আমরা মানুষ সুস্থভাবে স্বাধীনভাবে কমফোর্টেবল ওয়েতে স্বস্তির সঙ্গে যেন চলাফেরা করতে পারি, সেই ধরণের একটা রাষ্ট্র চাই। আমরা আশান্বিত, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমাদের সেই লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এক অনুষ্ঠানে এক শহীদের মায়ের আহজারির কথা উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘শহীদের সেই মা একটা কথাই বলছিলেন, ‘‘যে ছেলেটাকে নিয়ে আমি স্বপ্ন দেখেছি, আমার পরিবার স্বপ্ন দেখেছে, সেই ছেলেটাকে ওরা কেড়ে নিয়ে গেছে।’’ কেড়ে নিয়ে গেছে পাশবিকভাবে। তাকে গুলি করে মেরেছে, পরে গেছে এরপরে একটা ভ্যানের মধ্যে উঠিয়েছে। বেঁচে আছে না মরে গেছে সেটা না দেখে আরও ছয়-সাতটা লাশের সঙ্গে তাতে পুড়িয়ে দিয়েছে।’
মির্জা ফখরুল বলেন, চিন্তা করতে পারেন– একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক আমরা। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ করেছি একটা স্বাধীন দেশের জন্য। সেই দেশের পুলিশ প্রশাসন, যা আমার রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য দায়িত্ব পালন করে, যাদের বেতন আমাদের প্রত্যেকের ট্যাক্সের টাকায় থেকে। তারা আজ আমার ছেলেকে হত্যা করছে, পুড়িয়ে মারছে কী নির্মম নৃশংস অমানবিক। এ জন্য হাসিনাকে কোনোদিন ক্ষমা করা যাবে না, হাসিনা হলো মানবজাতির একটা কলঙ্ক, হাসিনা মায়েদের একটা কলঙ্ক। আমাদের প্রথম কাজ হবে তাদের বিচার করা।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দ্বিতীয় কাজ হবে শহীদদের পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা, যারা আহত হয়েছে, চোখ হারিয়েছে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। তা না হলে ভবিষ্যতে জাতি আমাদের ক্ষমা করবে না। সে জন্য গতকালও প্রস্তাব করেছি, আজও প্রস্তাব করছি, আমরা আমাদের দলের পক্ষ থেকে একটা ফান্ড রেইস করবো, যার মাধ্যমে এই পরিবারকে যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করবো। ইতোমধ্যে আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আমরা বিএনপি পরিবারের মাধ্যমে এই কাজটা করেছেন।’
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আগামী দিনে নির্বাচনের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে এই অন্তর্বতী সরকার। আশা করি, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে নির্বাচন হবে।’ তিনি বলেন, ‘সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমরা জনগণের একটা সরকার তৈরি করতে পারবো। যে সরকার আমার এই শহীদদের মূল্যায়ন করবে, তাদের মর্যাদা দেবে, একই সঙ্গে বাংলাদেশে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার সব রকম ব্যবস্থা নেবে।’
কৃষক দলের সভাপতি হাসান জাফির তুহিনের সভাপতিত্বে ও আমরা বিএনপি পরিবারের আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমনের সঞ্চালনায় এই অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন– বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান, শোক ও বিজয়ের বর্ষপূর্তি পালন কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান খান, কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুলসহ চার জন শহীদদের স্বজন।
অনুষ্ঠানে আর ছিলেন– অবসরপ্রাপ্ত বিগ্রেডিয়ার জেনারেল একেএম শামসুল ইসলাম শামস, বাদলুর রহমান বাদল, সাইফ আলী খান, মোকছেদুল মোমিন মিথুন, জাহিদুল ইসলাম রনি, শফিকুল হক সাজু ও হাসনাইন নাহিয়ান সজীবসহ কৃষক দলের কেন্দ্রীয় নেতারা।