হাসানাত আকাশ, শিবচর: সবুজে ঘেরা গ্রামবাংলার সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে বহু অবহেলিত জনপদের দীর্ঘশ্বাস। খরস্রোতা পদ্মার বুকে জেগে ওঠা বার চর তেমনই এক জনপদ, যেখানে প্রতিটি দিন শুরু হয় অনিশ্চয়তা আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম নিয়ে। প্রশাসনিকভাবে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার চরজানাজাত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হলেও বাস্তবে উন্নয়নের ছোঁয়া এখনো খুব কমই পৌঁছেছে এখানে।
শিবচর উপজেলা সদর থেকে দূরত্ব মাত্র ১৪ কিলোমিটার। কিন্তু এই সামান্য পথ পাড়ি দিতে গিয়েই বোঝা যায়, ভৌগোলিক দূরত্বের চেয়ে বড় হলো অবহেলা আর বঞ্চনার ব্যবধান। কাওড়াকান্দি ফেরিঘাট থেকে উত্তাল পদ্মা পেরিয়ে দেড় ঘণ্টার নৌযাত্রা শেষে পৌঁছাতে হয় বার চরের বেপারী বাজার এলাকায়। পুরো পথজুড়ে চোখে পড়ে নদীভাঙনের ক্ষতচিহ্ন, বিস্তীর্ণ বালুচর আর অনিশ্চয়তায় ঘেরা মানুষের জীবন।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চরের অধিকাংশ মানুষ কৃষি ও মাছ ধরার পেশার সঙ্গে জড়িত। উর্বর মাটিতে ভালো ফসল ফললেও তাদের জীবনে স্বস্তি নেই। দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা, চিকিৎসাসেবার অভাব, বিদ্যুৎহীনতা এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংকট মিলিয়ে নিত্যদিনের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ।
বর্ষা এলেই বাড়ে দুর্ভোগ। নদীর পানি বৃদ্ধি ও তীব্র স্রোতের কারণে নৌযান চলাচল হয়ে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ। কখনো কয়েকদিন পর্যন্ত বন্ধ থাকে যোগাযোগ। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট দেখা দেয়, বেড়ে যায় বাজারদরও।
ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা মজিবর বেপারীর চোখেমুখে ফুটে ওঠে দীর্ঘদিনের কষ্টের ছাপ। তিনি বলেন,আমাগো চরে দুঃখের শেষ নাই। অসুখ হইলে হাসপাতালে নিতে পারি না। কবিরাজই ভরসা। এখনো বিদ্যুৎ আসে নাই। গরমে মনে হয় আগুনের মধ্যে আছি। মোবাইল নেটওয়ার্কও ঠিকমতো কাজ করে না।
স্থানীয় কৃষক করিম বেপারী বলেন, মাটি ভালো, ফলনও ভালো হয়। কিন্তু সেচের ব্যবস্থা নাই। আবার ফসল বিক্রি করলেও ন্যায্য দাম পাই না। মাঝখানের মহাজনেরাই সব লাভ নিয়ে যায়।
একই আক্ষেপ কৃষক দেলোয়ার বেপারীর কণ্ঠেও। তিনি বলেন,বৃষ্টি হলে ফসল ভালো হয়, না হলে জমি ফাঁকা পড়ে থাকে। সরকার যদি রাস্তা, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা আর ন্যায্য দামের ব্যবস্থা করত, তাহলে আমাদের জীবনটা একটু সহজ হতো।
দুই সন্তানের মা রহিমা বিবি বলেন, চরের জীবন মানেই কষ্ট। বাচ্চারা অসুস্থ হলে খুব ভয় লাগে। এখানে ডাক্তার নাই, ওষুধও সহজে পাওয়া যায় না। পড়ালেখার ব্যবস্থাও খুব খারাপ।
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা অত্যন্ত কঠিন। তবে সরকার ধাপে ধাপে এসব এলাকায় সড়ক ও নৌযোগাযোগ উন্নয়ন, বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়াতে কাজ করছে।
মাদারীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা জানান, চরজানাজাত এলাকার দীর্ঘদিনের অবহেলা দূর করতে বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা, নতুন মাদরাসা স্থাপন, কাঁচা সড়ক পাকা করা, নদীভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শিবচরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনে সেতু নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানান তিনি।
পদ্মার বুকে ভাসমান এই জনপদে প্রকৃতির সৌন্দর্য যতটা মোহনীয়, বাস্তব জীবন ততটাই কঠিন। প্রতিদিন প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন বার চরের মানুষ। তাদের একটাই প্রত্যাশা—রাষ্ট্রের উন্নয়নের আলো একদিন পৌঁছাবে তাদের দুয়ারেও।