• বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:২০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
নাটোরে জেলা প্রশাসকের উপস্থিতিতে স্বপ্নকলি স্কুলের শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা সুন্দরবনে বনদস্যু আতঙ্কে মাছ ধরা বন্ধ, বিপাকে হাজারো জেলে `জলাবদ্ধতা নিরসন ও শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব’ মুক্তাগাছায় কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধের তীব্র সংকট জুলাই সনদ ‘অবৈধ ও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক’ ঘোষণা চেয়ে রিট এক বছরে ১৭ হাজার ৫১৬ কোটি টাকার মালামাল জব্দ করেছে কোস্টগার্ড বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি: ৯৩ বারের মতো পেছাল তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ রোজায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি মোকাবিলাই মূল চ্যালেঞ্জ : বিদ্যুৎমন্ত্রী উন্নত দেশের মানদণ্ডে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করবে সরকার : শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী
দ্রব্যমূল্য নিয়ে ‘সাউন্ড বাইট’ নয়, কাজ করে দেখাবো: বাণিজ্যমন্ত্রী

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত সরকারের হাতে আছে,আতঙ্ক নয়

প্রভাত রিপোর্ট / ১০ বার
আপডেট : বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

প্রভাত রিপোর্ট: বাজারে দ্রব্যমূল্য নিয়ে কোনো ‘সাউন্ড বাইট’ নয়, বরং কাজের মাধ্যমে ফল দেখানোর আশ্বাস দিয়েছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। দেশে রমজানের পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত ও সরবরাহ রয়েছে; পণ্য নিয়ে ভোক্তাদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই বলেও আশ্বস্ত করেছেন তিনি। বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) প্রথম কর্মদিবসে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। এ সময় প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম ও বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে বাজারও স্থিতিশীল থাকবে। রমজান মাস ও পরবর্তী সময়ের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত সরকারের হাতে রয়েছে এবং পাইপলাইনেও পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে বাজার নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
রমজান এলেই ‘সিন্ডিকেট’ প্রসঙ্গ সামনে আসে এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আমি ‘সাউন্ড বাইট’ দেবো না। ইনশাআল্লাহ কাজ করে দেখাবো। বাজার তদারকি ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। রমজানের শুরুতে কিছু পণ্যের দাম বাড়ার ব্যাখ্যায় বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এটি মূলত এককালীন চাহিদা বৃদ্ধির ফল। মানুষ সাধারণত পুরো মাসের জন্য একসঙ্গে বাজার করে, ফলে হঠাৎ করে ভোগ বৃদ্ধি পায় এবং এর সাময়িক প্রভাব খুচরা বাজারে পড়ে।
অন্যদিকে রপ্তানির সাম্প্রতিক নিম্নগতি প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামো এখনো অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই একটি মাত্র পণ্য থেকে আসে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন পণ্য যুক্ত করে রপ্তানি বৈচিত্র্য আনা, নতুন বাজার সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগে আগ্রহী বেসরকারি উদ্যোক্তাদের যথাযথ সহায়তা দেওয়াই সরকারের অগ্রাধিকার হবে বলে তিনি জানান।
বিশ্ব বাণিজ্যে অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ নীতিতে হঠাৎ পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। একটি দরিদ্র দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ভুল করার সুযোগ খুবই সীমিত। নীতিগত ভুল বা দীর্ঘস্থায়ী বৈদেশিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা দেশের নেই। তাই গত কয়েক মাসে যে মন্থর পরিস্থিতি দেখা গেছে, সেখান থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে সরকার কাজ শুরু করেছে বলে জানান তিনি।
বৈদেশিক ও দেশীয় বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনিশ্চয়তার মধ্যে কোনো বিনিয়োগ আসে না। বিনিয়োগের প্রধান শর্ত হলো স্থিতিশীল পরিবেশ। বিনিয়োগকারীদের নিশ্চিত হতে হয় যে তাঁদের পুঁজি ও শ্রমের বিপরীতে যুক্তিসংগত মুনাফা পাওয়া যাবে। তিনি আরও বলেন, দেশে বড় একটি কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী রয়েছে এবং প্রতি বছর প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। গত দুই থেকে তিন বছর ধরে বিনিয়োগ স্থবির থাকায় অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি হয়েছে। এই অবস্থা কাটিয়ে উঠতে না পারলে কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই নতুন সরকারকে নাগরিক জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল ইস্যু নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরীক্ষার মুখে পড়তে হচ্ছে। বাজারে বিদ্যমান সিন্ডিকেট ভাঙা এবং দামের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই এখন তাদের জন্য তাৎক্ষণিক এক বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভের পর গত মঙ্গলবার সরকার গঠন করেছে দলটি। আর এ সময় শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। সরকারি সূত্র বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি ভোগ্যপণ্য আমদানি করা হয়েছে। চিনি, ভোজ্যতেল, ছোলা, ডাল ও খেজুরের মতো রমজানকেন্দ্রিক পণ্যের মজুদ ও সরবরাহ নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, প্রতিবছর ‘মজুদ পর্যাপ্ত’ ঘোষণার পরও বাজারে তার প্রতিফলন স্পষ্ট থাকে না। ফলে সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে আস্থার সংকট থেকেই যায়।
নিম্ন আয়ের মানুষের চাপ কমাতে সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কার্যক্রম বাড়ানো হচ্ছে। খোলাবাজারে টিসিবির ট্রাক সেলের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ করা হবে বলে জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এতে শহরাঞ্চলে স্বল্পমূল্যে পণ্য পাওয়ার সুযোগ বাড়বে। তবে যেসব এলাকায় টিসিবির ট্রাক সেল পৌঁছবে না, সেখানে বাজারদরের চাপ বহাল থাকবে—এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা।
কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে সরবরাহের বাস্তবতা বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। যেমন লেবু বা বেগুনের মতো পণ্যে মজুদের বিষয়টি প্রযোজ্য নয়। মৌসুমি উৎপাদন ও পরিবহনের ওপরই দাম নির্ভর করে। কৃষক পর্যায়ে ৪০ টাকা কেজির বেগুন শহরের খুচরা বাজারে ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হওয়া বাজারকাঠামোর গলদেরই ইঙ্গিত দেয়। মধ্যস্বত্বভোগী ও সরবরাহ চেইনের অস্বচ্ছতা এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। যদিও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, এবার কঠোর নজরদারি থাকবে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এবারের রমজানের পণ্য আমদানি ও মজুদের বড় অংশ সম্পন্ন হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। তাই রোজার শুরুতে দাম হঠাৎ বাড়লেও তার পুরো দায় নতুন সরকারের ওপর বর্তাবে না। কিন্তু দামের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে তারা কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই থাকবে জনদৃষ্টি।
এ বিষয়ে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘এটি চ্যালেঞ্জিং, তবে অসম্ভব নয়। সরকার যদি শুরু থেকেই বাজার ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেয় এবং সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলে, সেখানে সরবরাহ নিশ্চিত করা, কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধ, নিয়মিত তদারকি ও তথ্যের স্বচ্ছতা একসঙ্গে কাজ করলে ইতিবাচক ফল মিলবে।’ তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দক্ষতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে রমজানের মতো সংবেদনশীল সময়েও বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব। ক্যাবের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসেনের ভাষায়, ‘নতুন সরকার দায়িত্ব নিচ্ছে রোজার ঠিক আগমুহূর্তে। তাই এটি তাদের জন্য বড় পরীক্ষা। আগের সরকার বাজারে অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। নতুন সরকার যদি দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়, তাহলে মানুষের আস্থা বাড়বে।’ পবিত্র রমজান মাস সামনে রেখে বাজার প্রস্তুতি নিয়ে বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমরা আগাম ও সমন্বিত প্রস্তুতি নিয়েছি। বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে একাধিক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’ তিনি জানান, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং বন্দর থেকে দ্রুত খালাস নিশ্চিত করা হয়েছে। চিনি ও সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রে আগাম আমদানি সম্পন্ন হয়েছে; কোথাও কৃত্রিম সংকটের চেষ্টা হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি হিসাবে, ভোজ্যতেলের বার্ষিক চাহিদা ২৫ লাখ টন, যার মধ্যে রমজানে লাগে প্রায় তিন লাখ টন। স্থানীয় উৎপাদন পাঁচ লাখ টন; আমদানি ও পাইপলাইনে মিলিয়ে পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। মসুর ডাল, চিনি, পেঁয়াজ ও ছোলার ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে পেঁয়াজে স্থানীয় উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি, এ তথ্য বাজারে স্বস্তির ইঙ্গিত দেয়।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। গত দুই দিনের ব্যবধানে বেগুন ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৯০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ১৬০ টাকা থেকে বেড়ে ২০০ থেকে ২৪০ টাকা এবং শসা প্রতি কেজি ৮০ টাকা থেকে বেড়ে ১০০ থেকে ১২০ টাকা হয়েছে। একই সঙ্গে অন্য সব ধরনের সবজির দামও বেড়েছে। ছোলার কেজি ১০০ থেকে ১১০ টাকা, সয়াবিন তেল ১৯৫ টাকা, দেশি চিকন মসুর ডাল ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা, মোটা দানার মসুর ডাল ১২০ থেকে ১৩০ টাকা, দেশি পেঁয়াজ ৬০ থেকে ৭০ টাকা। ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৯০ থেকে ২০০ টাকা, ডিম প্রতি ডজন ১১০ থেকে ১২০ টাকা এবং চিনি প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে লেবুর দাম আকাশছোঁয়া। ছোট লেবুর হালি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, বড় লেবু ১২০ থেকে ১৬০ টাকা পর্যন্ত।
রাজধানীর জোয়ারসাহারা বাজারের সবজি বিক্রেতা মো. মিলন খান বলেন, ইফতারের প্রয়োজনীয় পণ্যগুলো গত দুই দিনের ব্যবধানে প্রতি কেজিতে বেড়েছে ৩০ থেকে ৫০ টাকা। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙা এবং ব্যবসায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা। শুধু অভিযান নয়, সরবরাহ চেইনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত মনিটরিং, দৃশ্যমান শাস্তি এবং সমন্বিত নীতিই বাজার স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত। পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও বাজারের প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হবে রমজানের প্রথম সপ্তাহেই। ভোগ্যপণ্যের সাবলীল সরবরাহ, দাম নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবসায়ীদের জবাবদিহি—তিন উপাদানই নির্ধারণ করবে নতুন সরকারের প্রথম রমজানের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার সাফল্য।


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও