…………….সাইফুর রহমান ……………..
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর Truth Social প্ল্যাটফর্মে এক চাঞ্চল্যকর পোস্টে ইরানকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন — কাতারের এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) স্থাপনায় আর কোনো হামলা চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সম্পদ, সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ড, “সম্পূর্ণরূপে উড়িয়ে দেবে।” ট্রাম্প তাঁর পোস্টে লেখেন, ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে যা ঘটেছে তার ক্রোধে সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ডে হামলা চালিয়েছে, তবে এই হামলা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র বা কাতার কিছুই জানত না। তিনি আরও বলেন, ইরান এই তথ্য না জেনেই কাতারের এলএনজি সুবিধায় “অন্যায় ও অযৌক্তিকভাবে” আঘাত করেছে, এবং যদি পুনরায় কাতারে হামলা হয়, তাহলে তিনি দ্বিধা করবেন না — ইসরায়েলের সম্মতি ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র নিজেই পদক্ষেপ নেবে।
ইসরায়েলের হামলা এবং ইরানের প্রতিশোধ
১৮ মার্চ ২০২৬ ইসরায়েলের বিমানবাহিনী ইরানের বুশেহর প্রদেশের উপকূলে অবস্থিত সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ডে আঘাত হানে, যা বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, এই হামলায় বেশ কয়েকটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং গ্যাস ফিল্ডে বড় ধরনের আগুন লাগে, যদিও পরে তা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। Times of Israel-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হামলা আসলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করেই পরিচালিত হয়েছিল, যা ট্রাম্পের পোস্টের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ইসরায়েলের হামলার পরপরই ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড প্রতিশোধের হুমকি দেয় এবং সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের তেল-গ্যাস স্থাপনায় আঘাত হানার ঘোষণা দেয়। ইরানের এই হুমকি বাস্তবে পরিণত হয় যখন কাতারের বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি রপ্তানিকেন্দ্র রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করে, যেখানে “ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি” হয়েছে বলে QatarEnergy নিশ্চিত করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র আটকানোর পর তার গ্যাস সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছে।
সাউথ পার্স — কেন এই গ্যাসক্ষেত্র এত গুরুত্বপূর্ণ?
সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্র শুধু ইরানের নয়, পুরো বিশ্বের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ক্ষেত্রটি ইরান ও কাতার যৌথভাবে পরিচালনা করে — কাতারের দিকটি “নর্থ ফিল্ড” নামে পরিচিত। ইরানের মোট গ্যাস উৎপাদনের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে সাউথ পার্স থেকে এবং এই ক্ষেত্র ইরানের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও তুরস্কে পাইপলাইনে সরবরাহের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকরা জানান, সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের মোট গ্যাস উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বৈশ্বিক বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব
এই হামলাগুলোর পরপরই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১০৮.৬৬ ডলারে পৌঁছায়, এবং ইউরোপীয় গ্যাস বেঞ্চমার্ক ২৮ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। এশিয়া ও ইউরোপের গ্যাসের দাম ইতোমধ্যে যথাক্রমে ৪০ ও ৫০ শতাংশ বেড়েছিল মার্চের শুরুতে, আর এবার কাতারের রাস লাফানে হামলার পর বেঞ্চমার্ক গ্যাস প্রাইস আরও ২০ শতাংশ লাফিয়ে ওঠে। এনার্জি ডেটা ফার্ম Wood Mackenzie সতর্ক করেছে, রাস লাফানে ক্ষয়ক্ষতি “বৈশ্বিক গ্যাস বাজারের দৃষ্টিভঙ্গি মৌলিকভাবে পরিবর্তন করবে” এবং এই বিঘ্ন দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে চলতে পারে।
জ্বালানি যুদ্ধের ভয়ংকর পরিণতি
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন একটি পূর্ণ “এনার্জি ওয়ার” বা জ্বালানি যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিণতি অনেক ভয়াবহ হতে পারে:
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি: বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবহন হওয়া তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে যায়। ইরান হুমকি দিয়েছে এটি বন্ধ করে দেওয়ার, যা ঘটলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে।
এলএনজি সরবরাহের ২০ শতাংশ হ্রাস: কাতার বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক এবং বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ করে। রাস লাফান বন্ধ থাকলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তীব্র গ্যাস সংকটে পড়বে।
কয়লায় ফেরত যাওয়া: জাপান, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলো ইতোমধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে।
বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও সার সংকট: গ্যাস ও তেলের দাম বাড়লে সার ও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়বে, যা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।
দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক বিনিয়োগ ধ্বংস: যদি যুদ্ধ মাসের পর মাস চলে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ শূন্যে নেমে আসতে পারে।
বাংলাদেশের উপর বিধ্বংসী প্রভাব
বাংলাদেশের জন্য এই সংকট বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ দেশটির মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসে কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি আকারে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রায় ৫০ শতাংশ গ্যাসচালিত এবং সেই গ্যাসের একটি বড় অংশ আমদানিকৃত — ফলে কাতারের রাস লাফান বন্ধ থাকলে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। দেশটি ইতোমধ্যে সংকটের আঁচ পাচ্ছে — পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আরফানুল হক জানিয়েছেন, গ্যাস সরবরাহ সতর্কতামূলকভাবে দৈনিক ১৫০-২০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমানো হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয়ভাবে গ্যাস উৎপাদনের খরচ মাত্র ৩ টাকা প্রতি ঘনমিটার, কিন্তু আমদানিকৃত এলএনজির খরচ প্রায় ৫৫ টাকা — অর্থাৎ ১৮ গুণ বেশি। এই মূল্যের পার্থক্য ইতোমধ্যেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করছে এবং বিদ্যুতের বারবার লোডশেডিং গার্মেন্টস ও রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত করছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখা, নির্দিষ্ট সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং জ্বালানি সংরক্ষণের নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় যে এলএনজি সংকট বাংলাদেশকে কাবু করেছিল, এবারের পরিস্থিতি তার চেয়েও মারাত্মক হতে পারে।
পরিস্থিতি কোথায় যাচ্ছে?
ট্রাম্পের এই পোস্ট আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের উদ্বিগ্ন করেছে। একদিকে তিনি ইসরায়েলকে আরও হামলা বন্ধ রাখতে বলছেন, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ইরানকে সরাসরি হুমকি দিচ্ছে — যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান সতর্ক করেছেন, এই হামলাগুলো “অনিয়ন্ত্রণযোগ্য বৈশ্বিক পরিণতি” ডেকে আনতে পারে।
Middle East Council on Global Affairs-এর বিশ্লেষণ বলছে, যদি এই সংঘাত সপ্তাহের পর সপ্তাহ চলে, তাহলে এলএনজির দাম আকাশচুম্বী হবে, বীমা বাজারে আতঙ্ক দেখা দেবে এবং জাহাজ চলাচলে বড় বিঘ্ন ঘটবে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতিতে একটি পারমাণবিক সংকটের সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে গ্যাসের দামে (price cap) আরোপের কথা ভাবছে, যখন এশিয়ার দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পথে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু স্বল্পমেয়াদে এই “এনার্জি ওয়ার” থেকে বাঁচার কোনো সহজ পথ নেই — বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য।
ট্রাম্পের হুমকি, ইসরায়েলের হামলা এবং ইরানের প্রতিশোধ মিলিয়ে বিশ্ব এখন এক অভূতপূর্ব জ্বালানি যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে — যার পরিণতি ঢাকার বিদ্যুৎ বিভ্রাট থেকে শুরু করে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি পর্যন্ত সবখানে অনুভূত হচ্ছে।