• বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
ইউনূস সরকারের নবীন সদস্যদের দুর্নীতির অভিযোগ শামার, প্রমাণ চান নাহিদ পাথরঘাটায় বর্জ্য-দূষন রোধে নীরব প্রতিবাদ জাপানে বিপুল জনশক্তি পাঠানোর প্রস্তুতি বাংলাদেশের ভারতীয় ভিসার বিষয়ে সুখবর দিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলায় সংসদে ক্ষুব্ধ জামায়াত আমির ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ চোখে পড়েনি, আরও ভালো নির্বাচনের জন্য ১৯ সুপারিশ অতীতে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য জঙ্গিবাদ শব্দটি ব্যবহার করা হতো : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভূগর্ভস্থ নয়, এখনই ভূপৃষ্ঠের পানির দিকে যেতে হবে: মির্জা ফখরুল রূপপুর প্রকল্পে জ্বালানি লোডিং শুরু, পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে বাংলাদেশ ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আইনের শাসন অপরিহার্য: প্রধানমন্ত্রী
ওয়ার ইকোনমি’ থেকে ‘লোডশেডিং, স্কুল’

বিশ্বজুড়ে যে সংকট নিঃশব্দে ঘনিয়ে আসছে

প্রভাত রিপোর্ট / ১০৭ বার
আপডেট : শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬

………….সাইফুর রহমান………………

গত এক সপ্তাহে বিশ্বের একাধিক দেশে যে ধরনের সিদ্ধান্তগুলো সামনে এসেছে, সেগুলো আলাদা করে দেখলে হয়তো ছোটখাটো প্রশাসনিক পদক্ষেপ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একই সময়ে মিসর, তুরস্ক, পাকিস্তান, রাশিয়া এবং বাংলাদেশে যে নীতি ও সময়সূচির পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা মিলিয়ে দেখলে একটি বড় আর্থিক বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোথাও দোকানপাট রাতের মধ্যে বন্ধের নির্দেশ, কোথাও মুদ্রা টিকিয়ে রাখতে বিপুল রিজার্ভ ব্যয়, কোথাও সরকারি ব্যয় ছাঁটাই, কোথাও জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য অফিস সময় কমানো, আবার কোথাও স্কুলের ক্লাসের সময় নতুনভাবে সাজানোসব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, সারাবিশ্বে সরকার এখন এক ধরনের চাপের ভেতর দিয়ে জনজীবনের গতি কমিয়ে আনছে।
মিসরের উদাহরণ দিয়ে শুরু করা যায়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ থেকে প্রায় ২.৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ছাড় পাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই কায়রো সরকার দোকানপাট রাত ৯টার মধ্যে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। সরকারি ভাষায় একে বলা হচ্ছে “ওয়ার ইকোনমি মোড”, অর্থাৎ যুদ্ধকালীন অর্থনীতি-ধাঁচের একটি পরিচালন ব্যবস্থা। নামটি শোনায় কঠোর, কিন্তু এর ভেতরে মূল উদ্দেশ্য খুবই বাস্তব: জ্বালানি খরচ কমানো, বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনা এবং নগর অর্থনীতির ব্যয়সংকোচন। অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ বলছে, এই ধরনের পদক্ষেপ আসলে সংকটের গভীরতাকেই প্রকাশ করে। কারণ ঋণ পাওয়া আর অর্থনৈতিক স্বস্তি পাওয়া এক জিনিস নয়। যদি দেশটির বৈদেশিক ঋণ, আমদানি ব্যয় এবং জ্বালানি ভর্তুকির বোঝা আগেই অত্যধিক হয়ে থাকে, তাহলে নতুন ঋণ কেবল সাময়িক শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দেয়, স্থায়ী সমাধান নয়।
তুরস্কেও ছবিটা ভিন্ন নয়, শুধু ভাষাটা আলাদা। সেখানে স্থানীয় মুদ্রা লিরাকে ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিপুল পরিমাণ ডলার খরচ করেছে বলে খবর এসেছে। একই সঙ্গে স্বর্ণভাণ্ডার বিক্রির সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা চলছে। একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন রিজার্ভকে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা না ভেবে বর্তমান সংকট সামলানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে বাধ্য হয়, তখন সেটি আর শক্তির প্রতীক থাকে না; বরং দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। রিজার্ভের কাজ বাজারে আস্থা রাখা, মুদ্রার ওপর চাপ কমানো এবং জরুরি সময়ের জন্য সুরক্ষা তৈরি করা। কিন্তু সেই সুরক্ষাই যদি প্রতিদিন ব্যবহৃত হতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের জন্য আর কী অবশিষ্ট থাকে? তুরস্কের ক্ষেত্রে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
পাকিস্তানের ঘটনাটি আরও স্পষ্টভাবে সাধারণ মানুষের জীবনে এসে আঘাত করেছে। ঈদের দিন সরকারি বেতন কাটছাঁট, জ্বালানি বরাদ্দ ৫০ শতাংশ কমানো এবং একটি অস্টেরিটি ফান্ড গঠনের ঘোষণাসব মিলিয়ে ইসলামাবাদের বার্তাটি ছিল অস্বস্তিকর। আনন্দের দিনে এমন ঘোষণা সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষত কঠিনভাবে ধরা দেয়, কারণ এটি উৎসবের আবহেই ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কথা মনে করিয়ে দেয়। সরকারি ব্যয় ছাঁটাই শুনতে যতটা নীতিগত মনে হয়, বাস্তবে তা খুব দ্রুত দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। পাকিস্তান বহুদিন ধরেই বৈদেশিক ঋণ, আমদানি ব্যয়, জ্বালানি সংকট ও বাজেট ঘাটতির ভার বহন করছে। ফলে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায় না; বরং এগুলো দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতারই প্রকাশ।
রাশিয়ার ক্ষেত্রেও একই ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক বাস্তবতা সামনে এসেছে। নগদ অর্থ ও সোনা রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মতো পদক্ষেপ সাধারণত তখনই দেখা যায়, যখন রাষ্ট্র বৈদেশিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণ, মূলধনপ্রবাহ সীমিত করা বা মুদ্রা স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করে। রাশিয়ার ক্ষেত্রে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আর্থিক বিচ্ছিন্নতা এই সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করছে বলেই মনে হয়। কোনো দেশ যখন রপ্তানি, পুঁজি ও রিজার্ভের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, তখন সেটি শুধু নীতিগত কঠোরতা নয়; বরং আস্থার সংকটেরও বার্তা।

■ বাংলাদেশ: নরম ভাষায়, কিন্তু একই বার্তা

এবার বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, এখানেও একই প্রবণতা আরও নরম ভাষায়, কিন্তু স্পষ্টভাবে উপস্থিত। সরকার সম্প্রতি অফিস সময় ৯টা থেকে ৪টা করেছে, বাজার ও শপিংমল ৬টার পর বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে, আর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে নানা কড়াকড়ি আরোপ করেছে। এর সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময়সূচিও নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। সংশোধিত সময়সূচিতে অনেক স্কুলে ক্লাসের সময় পরিবর্তন করা হয়েছেকোথাও সকালবেলা, কোথাও দিনের আলোকে কাজে লাগিয়েযাতে যাতায়াত, বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং সামগ্রিক চাপ কিছুটা কমে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এখানে অফিস সময়, স্কুল সময় এবং বাজার-দোকান বন্ধের সময় একসঙ্গে বদলানো হচ্ছে। এর মানে হলো দিনের কাঠামোই বদলে যাচ্ছে। সকালে অফিসে যাওয়া, দুপুরের আগে স্কুল শেষ করা, সন্ধ্যার আগেই বাজার বন্ধ করাএসবের মধ্য দিয়ে সরকার এক ধরনের সাশ্রয়ী দৈনন্দিনতা তৈরি করতে চাইছে। কিন্তু এই সাশ্রয় শুধু হিসাবের খাতায় থাকে না। অফিস সময় কমলে যাতায়াতের ধরন পাল্টায়, ব্যবসার সময়সীমা সংকুচিত হয়, শিশুদের স্কুল-জীবনে নতুন রুটিন তৈরি হয়, আর পরিবারের জীবনযাত্রায়ও সমন্বয় আনতে হয়।

■ বিশ্লেষণ: এটা কি কাকতালীয়?

এই চারটি দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশের বর্তমান পদক্ষেপকে একসঙ্গে রাখলে একটি বড় চিত্র ফুটে ওঠে। তা হলোঅর্থনীতি এখন শুধু উন্নয়ন বা প্রবৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি দৈনন্দিন জীবনের শৃঙ্খলা, সময়সূচি, জ্বালানি ব্যবহার এবং সামাজিক আচরণের প্রশ্নও হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে যেখানে অর্থনৈতিক নীতি মানে ছিল বড় প্রকল্প, বিনিয়োগ বা বাজেটের অঙ্ক, সেখানে এখন সেটি অনেক বেশি বাস্তব ও স্পর্শকাতর। দোকান কখন বন্ধ হবে, অফিস কখন ছুটবে, স্কুল কখন শুরু হবে, কী পরিমাণ জ্বালানি খরচ করা যাবেএসবও এখন অর্থনৈতিক নীতির অংশ।
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসে: এগুলো কি কাকতালীয়? উত্তর সম্ভবত না। কারণ একযোগে একাধিক দেশে একই ধরনের কৃচ্ছ্রতার ভাষা, একই ধরনের প্রশাসনিক ছাঁটাই এবং একই ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা সাধারণত তখনই দেখা যায়, যখন বিশ্ব অর্থনীতির ভেতরে চাপ জমে উঠছে। মুদ্রাস্ফীতি, ঋণের বোঝা, জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, রিজার্ভ হ্রাস, বিনিয়োগকারীর আস্থাএসব উপাদান একত্রে কাজ করলে সরকারগুলো বাধ্য হয় ব্যয় কমাতে, সময় সংকুচিত করতে এবং ভোগকে নিয়ন্ত্রণে আনতে।
তবে এর মানে এই নয় যে সরকারগুলো কিছু লুকাচ্ছে বলেই এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সমস্যাগুলো দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকেঅতিরিক্ত ঋণ, কম রপ্তানি আয়, উচ্চ আমদানি ব্যয়, জ্বালানি ভর্তুকির চাপ, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, বাজেট ঘাটতিআর শেষে গিয়ে সংকটটি প্রকাশ পায় এমন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে, যা সাধারণ মানুষের চোখে হঠাৎ কঠোর মনে হয়। আসলে হঠাৎ কিছুই ঘটে না; দীর্ঘদিনের ভার শেষ পর্যন্ত এই ধরনের দৃশ্যমান রূপ নেয়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অফিস ও স্কুল সময়সূচির পরিবর্তনও সেই একই বাস্তবতায় রাখা যায়। এখানে উদ্দেশ্য হলো দিনের আলোকে কাজে লাগানো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহার কমানো, এবং সামগ্রিক খরচ নিয়ন্ত্রণে আনা। শিক্ষা খাতে নতুন সময়সূচি যেমন শিক্ষার্থীদের রুটিনে প্রভাব ফেলছে, তেমনি অফিস সময় পরিবর্তন সরকারি ও বেসরকারি কর্মজীবনের গতি বদলে দিচ্ছে। বাজার বন্ধের সময় এগিয়ে আনা হলে ব্যবসায়ীদেরও নতুন সময়ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। অর্থাৎ অর্থনীতি এখন শুধু নীতি নয়, এটি জীবনের সময়শৃঙ্খলা।
সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে এসব সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে তিন জায়গায়। প্রথমত, সময়ের ওপরঅফিস ও স্কুলের সময় বদলালে পুরো দিনের রুটিন পাল্টে যায়। দ্বিতীয়ত, ব্যয়ের ওপরজ্বালানি, পরিবহন, বাজার এবং নিত্যপণ্যের দাম পরিবর্তিত হয়। তৃতীয়ত, আস্থার ওপরমানুষ যখন দেখে সরকার একের পর এক কৃচ্ছ্রতার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তখন তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও সতর্ক হয়ে ওঠে। ব্যয় কমায়, বিনিয়োগ স্থগিত করে, আর বড় সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় পড়ে। এভাবেই অর্থনৈতিক চাপ সামাজিক আচরণেও ছড়িয়ে পড়ে।
সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলোকে আলাদা আলাদা দেশের বিচ্ছিন্ন খবর হিসেবে না দেখে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক চাপের অংশ হিসেবে দেখা উচিত। মিসরের কৃচ্ছ্রতা, তুরস্কের মুদ্রা রক্ষা, পাকিস্তানের বেতন ও জ্বালানি কাটছাঁট, রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশের সময়সূচি পরিবর্তনসবই একটি বড় বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। রাষ্ট্রগুলো এখন অর্থনৈতিক চাপের মুখে নিজেদের খরচ, সময় এবং ভোগের গতি কমিয়ে আনছে। আর এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে কাছের ও সবচেয়ে স্পষ্ট প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনেঅফিসে, বাজারে, স্কুলে, রাস্তায় এবং পরিবারের দৈনন্দিন রুটিনে। ঘড়ির কাঁটা পেছানো শুধু সময় বদলায় না, এটি বলে দেয়রাষ্ট্র এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক প্রভাত


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও