প্রভাত রিপোর্ট: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এক কোটি টাকা অনুদান পেয়েছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এই টাকা কীভাবে এসেছে এবং ব্যয় হয়েছে কীভাবে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক পক্ষের নেতারা।
তাঁদের অভিযোগ, সংগঠনের সদ্য সাবেক সভাপতি রিফাত রশিদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মুঈনুল ইসলাম ও মুখ্য সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলাম এই কোটি টাকার তথ্য গোপন করেছেন। অভিযোগ অস্বীকার করে রিফাত রশিদ বলছেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই অভিযোগ তোলা হয়েছে। সেই সঙ্গে কীভাবে ওই টাকা পেয়েছিলেন, তা উল্লেখ করেছেন রিফাত রশিদ। একই সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব অডিট ফার্ম দিয়ে নিরীক্ষা করিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
গণভোটের প্রচারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোটি টাকা পাওয়ার বিষয়টি প্রথমে প্রকাশ্যে আসে গত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল)। সেদিন বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনের সামনে সংবাদ সম্মেলন করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র সিনথিয়া জাহীন আয়েশাসহ কয়েকজন নেতা। তাঁরা সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ওই এক কোটি টাকার পাওয়ার তথ্য গোপনের অভিযোগ করেন।
বিভিন্ন ব্যাংকের ‘সিএসআর ফান্ড’ (করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল) থেকে এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা পাওয়া যেতে পারে—এক শুভাকাঙ্ক্ষীর এমন পরামর্শে তাঁরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে সহায়তা করেন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের কর্মকর্তা হিসেবে থাকা কিছু ‘বড় ভাই’।
সংবাদ সম্মেলনে সিনথিয়া জাহীন বলেছিলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তরফ থেকে গণভোটের পক্ষে দেশব্যাপী প্রচার চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রচারের অর্থায়ন কীভাবে হবে, এমন প্রশ্নে তখন বলা হয়, ব্যক্তিগত খরচে এই কর্মসূচি সম্পন্ন হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে ফান্ড (তহবিল) গ্রহণ এবং তা কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে, সেটা তাঁদের কাছে গোপন রাখা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘সর্বশেষ ১২ এপ্রিল কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিংয়ে তাঁরা (রিফাত–হাসিব) স্বীকার করতে বাধ্য হন, একটি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তাঁরা কমপক্ষে এক কোটি টাকা সংগ্রহ করেছেন। এই অর্থের স্বচ্ছতার হিসাব আমরা এখন পর্যন্ত পাইনি।’
অবশ্য এই সংবাদ সম্মেলনের তিন দিন আগে রিফাত রশিদ, হাসিব আল ইসলামসহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একদল নেতা–কর্মী আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগ দেন। সেদিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নতুন কমিটি গঠনের জন্য পাঁচ সদস্যের উপদেষ্টা পর্ষদ গঠন করে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সব কার্যক্রম স্থগিত করেন রিফাত–হাসিবরা।
যেভাবে এসেছিল কোটি টাকা
সিনথিয়া জাহীনের সংবাদ সম্মেলনের পরদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লাইভে এসে অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতির পদ ছেড়ে এনসিপিতে যোগ দেওয়া রিফাত রশিদ। সেখানে সিনথিয়ার অভিযোগকে ‘হাস্যকর ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ আখ্যা দেন তিনি।
লাইভে রিফাত রশিদ বলেন, ‘আমাদের ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে বিতর্কিত করা এবং গণভোটকে বিতর্কিত করার জন্য এই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হয়েছে। এই অভিযোগ আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, দুদকসহ বাংলাদেশের যেকোনো ধরনের তদন্তকারী সংস্থা যদি এই অভিযোগের তদন্ত করতে চায়, আমরা তাদের পূর্ণ সমর্থন দেব। তদন্ত করতে চাইলে আমি নিজে তাদের কার্যালয়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিয়ে আসব, সব ধরনের প্রক্রিয়া মোকাবিলা করব।’
বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের এক কোটি টাকা দিয়েছে। চুক্তির সব শর্ত পূরণ করে সেই টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রেজিস্টার্ডকৃত অডিট ফার্ম দিয়ে অডিট করিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠিয়েও দিয়েছি।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কীভাবে এক কোটি টাকা পেয়েছিল, সে বিষয়ে ফেসবুক লাইভে ব্যাখ্যা দেন বর্তমানে এনসিপির যুব সংগঠন জাতীয় যুবশক্তির সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা রিফাত রশিদ। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ‘ইয়েস ক্যাম্পেইন’ শীর্ষক প্রচারের জন্য বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তহবিল খুঁজছিল। বিভিন্ন ব্যাংকের ‘সিএসআর ফান্ড’ (করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল) থেকে এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা পাওয়া যেতে পারে—এক শুভাকাঙ্ক্ষীর এমন পরামর্শে তাঁরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে সহায়তা করেন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের কর্মকর্তা হিসেবে থাকা কিছু ‘বড় ভাই’।
ফেসবুক লাইভে রিফাত রশিদ বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকে গিয়ে আমরা আমাদের প্রপোজালগুলো (প্রস্তাবগুলো) দিই। সেই প্রপোজালগুলো গ্রহণ করা হয়। আমাদের একটা বড় ফান্ড দেওয়ার কথা ছিল। সেখানে জাতীয়ভাবে অনেক বড় একটা প্রোগ্রাম করার পরিকল্পনা করেছিলাম। সেখানে কনসার্ট, ডোর টু ডোর ক্যাম্পেইন ও অনলাইন ক্যাম্পেইনের পরিকল্পনা ছিল। সরকার যত বড় ক্যাম্পেইন করেছে, তার চেয়ে বড় পরিসরে ক্যাম্পেইনের পরিকল্পনা করেছিলাম আমরা। তার জন্য ১২ কোটি সামথিং টাকার একটা প্ল্যান দিয়েছিলাম।’
কিন্তু এত ‘অল্প’ টাকায় দেশব্যাপী এমন প্রচার সম্ভব হবে কি না, সে প্রশ্ন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে উঠেছিল জানিয়ে রিফাত রশিদ বলেন, ‘সে সময়ে কিছু জটিলতা দেখা দেয়। প্রথমত, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সরকারের রেজিস্টার্ড কোনো সংগঠন নয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক নন–রেজিস্টার্ড কাউকে ফান্ড দিতে পারবে না। সেই জায়গা থেকে আমরা “স্যাড” নামে একটা ফাউন্ডেশন তৈরি করার উদ্যোগ নিই, যার অধীনে টাকাটা আসবে।’
১৫ দিনের প্রচারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পাঁচ কোটি টাকার চুক্তি হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন সংগঠনের তৎকালীন সভাপতি রিফাত রশিদ। তিনি বলেন, ‘ভোটের আগে তত দিনে সময় স্বল্প ছিল, এক সপ্তাহের মতো ছিল। প্রচারের অংশ হিসেবে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে যাওয়া, ক্যারাভান, ইয়েস গেট ও লিফলেট ছিল। নির্বাচনের দিন দেশের প্রতিটি কেন্দ্রে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে এজেন্ট নিয়োগ করার চেষ্টা ছিল। একটা বড় ফান্ড এখানে বিতরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের এক কোটি টাকা দিয়েছে। চুক্তির সব শর্ত পূরণ করে সেই টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রেজিস্টার্ডকৃত অডিট ফার্ম দিয়ে অডিট করিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠিয়েও দিয়েছি। তাদের প্রতিনিধিরা আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁরাও কোনো সমস্যা পাননি, তাঁরা আমাদের প্রশংসাও করেছেন। এরপর এই অধ্যায়টা আসলে বন্ধই হয়ে যায়।’