প্রভাত সংবাদদাতা,মৌলভীবাজার: মৌলভীবাজারে পাকা বোরো ধান ঘরে তোলার আগেই কয়েকদিনের অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ডুবে গেছে জেলার হাওরাঞ্চল। সোমবার (৪ মে) পানি কিছুটা কমায় ও দিনভর হালকা রোদ থাকায় কিছুটা স্বস্তি দেখা দিয়েছে। যেসব ধান কাটার পর রোদের অভাবে নষ্ট হচ্ছিল এসব ধান কিছুটা হলেও শোকাতে পাড়ছেন কৃষকরা। হাওরে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ভাসতে শুরু করছে পঁচে নষ্ট হয়ে যাওয়া ধান।
কৃষকরা জানান, এক সপ্তাহ পর মঙ্গলবার কিছুটা রোদে ধান শোকানো গেছে। যেসব কৃষক কষ্ট করে বুকসমান পানি থেকে ধান কেটে এনেছিলেন তাদের ধান রোদের অভাবে নষ্ট হচ্ছিল। অনেক ধান থেকে চারা গজিয়েছে। এক সপ্তাহ পর রোদে ধান শোকাতে পেরে স্বস্তি জানিয়েছেন তারা। তবে বেশিরভাগ ধান হাওরের পানির নিচে তলিয়ে আছে। জেলায় অন্তত ২০ হাজার কৃষক একেবারে ধান হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে জেলায় ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরোধান চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ২৫৯৭ হেক্টর। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ১৮ হাজার ৫০০টি।
খলায় স্তূপ করে রাখা ভেজা ধান। রোদ না থাকায় সেগুলোতে গজিয়েছে অঙ্কুর। পাশে দাঁড়িয়ে হতাশ চোখে তাকিয়ে আছেন ইটনার কৃষক কামরুল হাসান। তিন একর জমিতে বোরো আবাদ করতে প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ করেছিলেন তিনি। কিন্তু অতিবৃষ্টি আর উজানের ঢলে অর্ধেক ফসল তলিয়ে গেছ, যা বাঁচানো গেছে, তা-ও আধাপাকা অবস্থায় কাটতে হয়েছে। এখন সেই ধান তিনি বিক্রি করছেন মাত্র ৬৫০ টাকা মণে। উৎপাদন খরচের হিসাবে যা মণে ৩০০-৪০০ টাকা লোকসান।
হতাশ কণ্ঠে এসব কথা জানান কামরুল হাসান। মলিন মুখে বলেন, ‘ঋণ শোধ করমু না সংসার চালামু, এই চিন্তায় আছি।’
হাওরাঞ্চলে এবার বোরো মৌসুমে প্রায় সব কৃষকের অবস্থাই এমন। সরকারিভাবে কেজিপ্রতি ৩৬ টাকা, অর্থাৎ মণপ্রতি ১ হাজার ৪৪০ টাকা দাম নির্ধারণ থাকলেও বাস্তবে সেই তার কোনো প্রতিফলন নেই। খলা থেকে মাত্র ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকায় ধান কিনে নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, চলতি বোরো মৌসুমে কিশোরগঞ্জের ১৩ উপজেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে আবাদ হয়েছে এক লাখ ৪ হাজার ৫৮১ হেক্টর জমিতে। জেলায় চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাত লাখ ৯৬ হাজার ৬৮৬ টন, যার বড় অংশই আসবে হাওর থেকে। এর মধ্যে সোমবার বিকেল পর্যন্ত অতিবৃষ্টি ও ঢলে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রায় ৪৯ হাজার কৃষক।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, গত বছর এ সময় ধানের দাম তুলনামূলক বেশি ছিল। কিন্তু এবার একদিকে দুর্যোগ, অন্যদিকে দামের পতন, দ্বিমুখী চাপে পড়েছেন তারা। উৎপাদন খরচ যেখানে মণপ্রতি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, সেখানে ৭০০ টাকায় বিক্রি মানে মণপ্রতি ৩০০-৪০০ টাকা লোকসান।
সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার হাকালুকি, কাউয়াদিঘী, হাইল হাওর, কেওলার হাওরসহ বিভিন্ন এলাকায় বোরো ধান নিমজ্জিত রয়েছে। পানি কিছুটা নামতে শুরু করায় কিছু কিছু এলকায় ধান ভাসতে শুরু করেছে। তবে বেশিরভাগ ধান নষ্ট হয়ে গেছে। এক সপ্তাহ পর রোদের দেখা পাওয়ায় ধানের ঢিবি থেকে রোদে শোকাতে দিয়েছেন।
কৃষকরা বলেন, কৃষি অফিস ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তথ্য উপস্থাপন করছে না। তারা সবসময় প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এড়িয়ে যায়। হাওরের ৫০ শতাংশ কৃষক ধান কাটতে পারেননি। অথচ কৃষি অফিস থেকে বলা হচ্ছে ৮৮ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে হাওরে। অনেক মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে আবার কেউ কেউ এনজিওর ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছেন। এখন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে এসব কৃষক দিশেহারা হয়ে পড়ছেন।
কৃষক কামাল আহমেদ বলেন, বন্যা ও জলাবদ্ধতায় একসপ্তাহ ধরে হাওর এলাকাসহ বিস্তীর্ণ বোরো ফসল পানির নিচে থাকায় সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যারা ধান কেটেছিলেন তরা শোকাতে পারেননি। আজ সকালে বৃষ্টির পর কিছুটা রোদ উঠেছে। হাওরের পানিও কমতে শুরু করেছে তবে ধান নষ্ট হয়ে গেছে একেবারে।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, জেলায় ২ হাজার ৫৯৭ হেক্টর জমির ধান পচে নষ্ট হয়েছে। ক্ষতির সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে। প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ কৃষক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ বছর হাওরে ধান অনেক ভালো হয়েছিল। তবে প্রকৃতিক দুর্যোগের কারণে ভালোভাবে ধান ঘরে তোলা যায়নি।