………………….শাহরিন হক…………………….
আমরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলি। কিন্তু সত্যি বলতে কী, এই কথাগুলো এখন অনেকটাই অস্বস্তি তৈরি করে। কারণ আমরা জানি, কাগজে-কলমে যতটা স্বাধীনতার কথা বলা হয়, বাস্তবে তার জায়গাটা ততটা বিস্তৃত নয়। বরং ধীরে ধীরে সেই জায়গা ছোট হচ্ছে, চুপচাপ, চোখের আড়ালে।
বাংলাদেশে গণমাধ্যমের বর্তমান অবস্থাটা বোঝার জন্য আলাদা কোনো ঘটনার দরকার নেই। বরং পুরো ছবিটা একসঙ্গে দেখলেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়। এখানে আইন আছে, অর্থনৈতিক চাপ আছে, মালিকানার প্রভাব আছে, আবার ডিজিটাল যুগের নতুন চ্যালেঞ্জও আছে। সব মিলিয়ে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে গণমাধ্যম আছে, কিন্তু তার ভেতরের স্বাধীনতা অনেক সময় সীমাবদ্ধ। আর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে মানুষের বিশ্বাসে।
আমরা প্রায়ই বলি, রাজনৈতিক চাপ গণমাধ্যমের বড় সমস্যা। সেটা ঠিক, কিন্তু এটিই পুরো গল্প নয়। ভেতরের কাঠামোটা আরও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বড় অনেক গণমাধ্যম এখন এমন মালিকানার অধীনে, যাদের নিজস্ব ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক স্বার্থ আছে। ফলে অনেক সময় খবরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় শুধু জনস্বার্থ ভেবে নয়, বরং সেই বড় স্বার্থগুলোর কথা মাথায় রেখে। এই প্রভাবটা খুব সরাসরি চোখে পড়ে না। কেউ এসে বলে না, এই খবর ছাপা যাবে না। কিন্তু তবুও কিছু খবর আর সামনে আসে না, কিছু বিষয়কে নরমভাবে বলা হয়, আর কিছু বিষয় চুপচাপ বাদ পড়ে যায়। ধীরে ধীরে এটা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়। এর সঙ্গে যখন যোগ হয় সরকারি বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরশীলতা, তখন পুরো বিষয়টা আরও জটিল হয়ে ওঠে। তখন আর চাপ দিতে হয় না, সংযমটা নিজের ভেতর থেকেই চলে আসে। এই জায়গায় এসে আইন আরও বড় ভূমিকা নেয়। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং সাইবার নিরাপত্তা আইন, এই আইনগুলো এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে কোনটা বলা নিরাপদ আর কোনটা ঝুঁকিপূর্ণ, সেটার স্পষ্ট সীমা অনেক সময় থাকে না। কিছু ক্ষেত্রে ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেপ্তার, ডিভাইস জব্দ বা তথ্য নেওয়ার সুযোগ থাকায় সাংবাদিকদের জন্য কাজটা আরও কঠিন হয়ে যায়।
এর প্রভাব কিন্তু খুব বাস্তব। অনেক সাংবাদিক মামলার মুখোমুখি হয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে আইনি লড়াই চালাতে হচ্ছে। অনেক সময় অভিযোগের ধরনও এমন হয়, যা তাদের পেশাগত কাজের বাইরেও চলে যায়। তখন প্রশ্নটা আর শুধু সাংবাদিকতার থাকে না, নিজের নিরাপত্তার কথাও ভাবতে হয়। তাই অনেক সময় সিদ্ধান্তটা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, এই প্রতিবেদন করবো, নাকি না করাই ভালো? আর এই জায়গা থেকেই নীরবতা জন্ম নেয়, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে কাজ করে। এই নীরবতার প্রভাব শুধু সংবাদমাধ্যমে থেমে থাকে না। ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এর প্রভাব পড়ে। মানুষ খবর দেখে, পড়ে, কিন্তু বিশ্বাস করতে দ্বিধা করে। তারা ভাবতে শুরু করে, সবটা কি বলা হচ্ছে, নাকি কিছু বাদ যাচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলোই আসলে বড় সংকেত। কারণ যখন মানুষ আর নিশ্চিত হতে পারে না, তখন তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভিত্তিটাই দুর্বল হয়ে যায়। কে সঠিক, কে ভুল, কোথায় জবাবদিহি দরকার, এসব বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে করে যে জায়গাটা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেটি হলো জবাবদিহির সংস্কৃতি। এর সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে ডিজিটাল দুনিয়ার নতুন বাস্তবতা। তথ্য এখন হাতের মুঠোয়, কিন্তু সব তথ্য নির্ভরযোগ্য নয়। ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, অনেক সময় সত্য তথ্যের আগেই। মানুষ প্রতিদিন এত তথ্যের ভিড়ে পড়ে যে, একসময় যাচাই করার আগ্রহটাই কমে যায়। ক্লান্তি চলে আসে, আর সেই ক্লান্তিই অনেক সময় ভুল তথ্যকে জায়গা করে দেয়।
এই পরিস্থিতিতে যদি গণমাধ্যম শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য না হয়, তাহলে মানুষের জন্য ভরসার জায়গা আরও কমে যায়। অথচ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও এখনো পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। ফলে তথ্যের এই জটিল ভিড়ে একজন সাধারণ মানুষ অনেকটাই একা হয়ে পড়ে।
মজার বিষয় হলো, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার গুরুত্ব নিয়ে কেউ দ্বিমত পোষণ করে না। নীতিগতভাবে সবাই একমত, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম দরকার। কিন্তু সেই কথাগুলো বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে যে ফাঁকটা আছে, সেটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। আইনগুলো এখনো বদলায়নি, মালিকানার স্বচ্ছতা আসেনি, আর সাংবাদিকদের নিরাপত্তাও পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি, বিশেষ করে নারী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে। এই একই চিত্র আমরা বারবার দেখেছি, কথা বলা হয়, কিন্তু পরিবর্তনটা আর আসে না। তাই এখন প্রশ্নটা নতুন নয়, কিন্তু জরুরি, এই অবস্থাটা কি বদলাবে? সমাধানের পথ অজানা না। আইনি কাঠামোকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। গণমাধ্যমের মালিকানা ও সম্পাদনার মধ্যে স্পষ্ট সীমা থাকতে হবে। আর্থিকভাবে স্বাধীন থাকার পথ তৈরি করতে হবে। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, অনলাইনে এবং বাস্তব জীবনে দু’দিকেই। এর পাশাপাশি আমাদেরও ভাবতে হবে, আমরা কীভাবে তথ্য গ্রহণ করছি। তথ্য যাচাই করার অভ্যাস তৈরি করা, সচেতন হওয়া, এসবও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু গণমাধ্যম নয়, সচেতন নাগরিকও একটি সুস্থ তথ্যব্যবস্থার অংশ।
সবশেষে কথা একটাই, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো বাড়তি সুবিধা নয়, এটি মৌলিক প্রয়োজন। একটি স্বাধীন গণমাধ্যম থাকলে সমাজে আস্থা তৈরি হয়, জবাবদিহি বাড়ে, আর গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। আর যখন এই জায়গাটা সংকুচিত হয়, তখন তার প্রভাব পড়ে সবার ওপর। বাংলাদেশ এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে সমস্যাগুলো স্পষ্ট। সমাধানের পথও জানা। এখন দেখার বিষয়, আমরা সেই পথে হাঁটতে পারি কি না।
লেখক : সমন্বয়ক, আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (সৌজন্যে ঢাকা পোস্ট)