প্রভাত রিপোর্ট: সৌদি আরব আগামী ২০৩০ সালের ওয়ার্ল্ড এক্সপো ও ২০৩৪ সালে ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ উপলক্ষে তাদের ভিশন ২০৩০ রূপকাঠামো অনুযায়ী স্মার্ট শহর, বিমানবন্দর, মেট্রো, হাইওয়ে, স্টেডিয়াম, হোটেল এবং ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করছে শত শত বিলিয়ন ডলার। ব্যাপক এই রুপান্তরের লক্ষ্যই হলো সৌদি আরবকে পর্যটন, ক্রীড়ানুষ্ঠান ও উদ্ভাবনের বৈশ্বিক পাওয়ারহাউজ হিসেবে গড়ে তোলা।
দেশটির নির্মাণ ও সেবাখাতে এতে করে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, যা আকৃষ্ট করবে বহুজাতিক কর্পোরেশনসহ লাখ লাখ পর্যটককেও। বাংলাদেশের মতো শ্রমশক্তি রপ্তানিকারক দেশের জন্য এটি একটি সুবর্ণ সুযোগ বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশ কি এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েই যাচ্ছে।
ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশি কর্মীরা সৌদি শ্রমবাজারের বড় একটি অংশ দখলে রেখেছে। কিন্তু এখন দেশটি আধুনিকায়নের পথে। ফলে শ্রমবাজারে চাহিদাও পরিবর্তিত হচ্ছে। এখন ইংরেজি ও আরবি ভাষাজ্ঞান, আন্তর্জাতিক মানের সফট স্কিল এবং উন্নত কারিগরি দক্ষতা অপরিহার্য, যেখানে বাংলাদেশ অনেকটাই পিছিয়ে।
বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা)-এর সাবেক সহ-সভাপতি ও চার দশক ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলে শ্রমশক্তি প্রেরণের সঙ্গে যুক্ত নোমান চৌধুরী বলেন, “সৌদি আরব এখন উচ্চদক্ষতা সম্পন্ন শ্রমিক চায়। ইতিমধ্যেই তথ্য প্রযুক্তি ও উচ্চ বেতনের পেশার জায়গা দখল করছে অটোমেশন। এমনকি ক্লিনিং ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজও নিকট ভবিষ্যতে মেশিন দিয়ে করা হতে পারে।”
চাকরির বাজারে বাংলাদেশিদের জন্য নতুন এক উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে সৌদি আরবের জাতীয়করণ প্রকল্পসমূহ। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত “নীতাকাত” কর্মসূচি, যা শ্রমবাজারে বড় ধরনের রূপান্তর আনছে। এর আওতায় ইলেকট্রনিক্স থেকে শুরু করে স্বর্ণালঙ্কারের দোকান পর্যন্ত অনেক খাতে এখন শতভাগ সৌদি নাগরিক নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এমনকি হেলপার বা সহকারীর মতো অদক্ষ পদের ক্ষেত্রেও প্রতি ১০ জন বিদেশি শ্রমিকের বিপরীতে অন্তত একজন সৌদি নাগরিক নিয়োগ দেওয়া কোম্পানিগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই কড়াকড়ির ফলে ধীরে ধীরে অদক্ষ বিদেশি শ্রমিকদের স্থান সংকুচিত হচ্ছে।
নোমান চৌধুরী বলেন, “বহু বাংলাদেশি শ্রমিক ‘তাকামুল’ স্কিল সার্টিফিকেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারছে না, যা এখন অনেক সেক্টরে ভিসা পাওয়ার পূর্বশর্ত। যদি এটি সব খাতে প্রযোজ্য হয়, তবে প্রতিবছর সৌদিতে যাওয়া ৫-৬ লাখ বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা কমে ৫০ হাজারে নেমে আসতে পারে।”
সৌদি শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ হ্রাস পেতে পারে, বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে এমন শঙ্কা উঠলেও জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিষয়টিকে দেখছেন অনেক বেশি আশাবাদের চোখে। তিনি বলেন, “আমি মনে করি না সৌদি আরব আমাদের কর্মীদের জন্য কাজের সুযোগ কমিয়ে দেবে। তারা বাংলাদেশিদের ওপর আস্থা রাখে। আমাদের সঙ্গে সৌদি আরবের একটি গভীর সাংস্কৃতিক বন্ধন আছে, এবং তাদের নিয়োগকারীরাও আমাদের কর্মীদের নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।” তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ এখন প্রো-অ্যাকটিভ (আগাম) পদক্ষেপ নিচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে নতুন দক্ষতা যাচাইকরণ কর্মসূচি চালুÍযা সৌদি আরবের পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর লক্ষ্যে নেয়া হয়েছে। তবে, বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যদি সৌদি বাজারের চাহিদা অনুযায়ী কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নের, ভাষা শিক্ষা ও শ্রমবাজার বৈচিত্র্যকরণসহ জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত এবং দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশ সেই ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা হারাতে পারে, যেখানে একসময় অনেকটাই আধিপত্য বজায় করতো।
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের প্রধান বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাজার হিসেবে পরিচিত, আর তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে পরিসংখ্যানেই।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছেন ৫.২৬ লাখ বাংলাদেশি কর্মী। আগের বছরগুলোতেও এই সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্যÍ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪ লাখ ৫২ হাজার এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬ লাখ ৫৩ হাজার । বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে মোট ৪৫ লাখ প্রবাসী কর্মীর প্রায় ৫৭ শতাংশ-ই গেছেন সৌদি আরবে। তবে এই বিপুল সংখ্যক কর্মীপ্রেরণ মূলত স্বল্প দক্ষ কাজ বা লো-স্কিলড জব-কেন্দ্রিক। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সৌদিতে প্রেরিত শ্রমিকদের ৮০ শতাংশের বেশি স্বল্প দক্ষতার পেশায় নিয়োজিত। অনানুষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ৩০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি সৌদি আরবে কর্মরত রয়েছেন, যা বাংলাদেশের জন্য এখনো একক বৃহত্তম বৈদেশিক শ্রমবাজার।
কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হলো, এত বিপুল বাংলাদেশি কর্মী থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরব থেকে প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে, যা এই ইঙ্গিত দেয় যে স্বল্প দক্ষ কর্মীদের বিষয়ে সৌদি সরকারের কড়াকড়ি বাংলাদেশি কর্মীদের ওপর চাপ ফেলছে।
অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক অভিযোগ করছেন, তাদের ‘ইকামা’ (বসবাস ও কাজের অনুমতিপত্র) নবায়ন করা হচ্ছে না, কিংবা নবায়নের জন্য উচ্চ হারে ফি চাওয়া হচ্ছে, যা অনেকের পক্ষে বহন করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এভাবে আরও বেশিদিন অবস্থানের চেষ্টাকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।