• সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৩০ অপরাহ্ন
শিরোনাম
এবার দায়িত্ব ছাড়লেন ইতালির রেফারি–প্রধান আইপিএলের ভেন্যুতে নাশকতা, ২৪০টির বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা অচল বিশ্বকাপ প্রাইজমানি বাড়ানোর ঘোষণা ফিফার সপ্তাহে ১৫০ মাইল ট্রেনিং: কেনিয়ান সাওয়ের বিশ্ব রেকর্ডের রহস্য বিশ্বকাপের আগে নেদারল্যান্ডসে চোটের ধাক্কা সাদিয়া আয়মানের নান্দনিক সাজ দেখে চমকে গেছেন ভক্তরা দক্ষিণী অভিনেত্রী আশু রেড্ডির বিরুদ্ধে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেয়ার পর থেকে হুমকি অভিনেত্রী রূপাঞ্জনা মিত্রকে বক্স অফিসে ঝড় তুলেছে মাইকেল জ্যাকসনের বায়োপিক, আয় ২০০ মিলিয়ন ডলার ‘ভূত বাংলা’র পারিশ্রমিক নিয়ে জোর চর্চা, অক্ষয় নিয়েছেন ৫০ কোটি

বন্ধ হচ্ছে শিল্প প্রতিষ্ঠান, ঝুঁকিতে কর্মসংস্থান

প্রভাত রিপোর্ট / ৬৬ বার
আপডেট : শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬

প্রভাত রিপোর্ট: ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে দেশের তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতেই কয়েকশ’ শিল্প প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর পেছনে বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক চাপ যেমন রয়েছে, তেমনই ব্যাংক খাতের কঠোর নীতিও একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার প্রভাব শুধু উদ্যোক্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর বড় প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থানের ওপর। গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল খাতে প্রতিটি কারখানায় কয়েকশত থেকে কয়েক হাজার শ্রমিক কাজ করেন। ফলে একটি কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক চাকরি হারান।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত কয়েক বছরে বন্ধ হয়ে যাওয়া শত শত কারখানার কারণে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এর ফলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপও বাড়ছে।
একজন শিল্প উদ্যোক্তা বলেন, একটি বড় কারখানা বন্ধ মানে শুধু মালিকের ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে জড়িত থাকে হাজারো শ্রমিক, সরবরাহকারী, পরিবহন খাতসহ আরও অনেক ব্যবসা।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেলের দাবি, ইতিমধ্যে প্রায় ৩৫০টি গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং ৫০টির বেশি টেক্সটাইল মিল উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে তিনি বলেন, “এই টেক্সটাইলগুলো একেকটা হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ। শুধু একটি কারখানার সমস্যা নয়, এটা পুরো শিল্প খাতের জন্য উদ্বেগজনক।”
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো সমস্যাগ্রস্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজে বের করার পরিবর্তে শুধু ঋণ পুনঃতফসিলের মতো সাময়িক ব্যবস্থা নেয়। শওকত আজিজ রাসেল বলেন, “আমরা সব সময় ঋণ পুনঃতফসিলকে সহজ সমাধান হিসেবে দেখি। ব্যাংক তার হিসাব পরিষ্কার করার জন্য পুনঃতফসিল করে, কিন্তু এতে সমস্যার প্রকৃত সমাধান হয় না।” তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক ছয় মাস বা এক বছরের জন্য ঋণ পুনঃতফসিল করলেও শিল্প প্রতিষ্ঠানকে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল বা পুনঃঅর্থায়ন দেয় না। ফলে সাময়িকভাবে সময় পাওয়া গেলেও মূল সমস্যা থেকে যায়। তিনি বলেন, “শুধু রিশিডিউল করলেই হবে না। রিশিডিউলের পাশাপাশি রিফাইন্যান্সও করতে হবে। না হলে শিল্প প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।”
শিল্প উদ্যোক্তাদের অনেকেই বলছেন, শিল্পকারখানা পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যাংকের সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নিয়মিত ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ও ব্যাংকিং সুবিধা প্রয়োজন হয়।
দেশের ব্যাংকিং খাতের আগ্রাসী ঋণনীতি, ঋণ পুনর্গঠনে অনীহা এবং পর্যাপ্ত পুনঃঅর্থায়নের অভাবে একের পর এক শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, একদিকে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলো চাপে রয়েছে, অপরদিকে, কোভিড মহামারির সময় থেকে সৃষ্ট ধারাবাহিক নানা সংকট এবং উচ্চ সুদ হারের কারণে অনেক প্রকৃত ব্যবসাও চরম সংকটে পড়েছে। সরকার খণ্ডিত নীতিমালার মাধ্যমে কিছু স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করলেও এর বাস্তবায়ন একেক ব্যাংকে একে রকম। এ ব্যবস্থায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ‘লাইফ সাপোর্টে’ টিকে থাকছে। তারা ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে না।
একজন টেক্সটাইল উদ্যোক্তা বলেন, “ধরুন একটি কারখানায় হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। ব্যাংকের ঋণ হয়তো ১৫০ বা ২০০ কোটি টাকা। কোনও কারণে সেই ঋণ খেলাপি হয়ে গেলে ব্যাংক সব সুবিধা বন্ধ করে দেয়। তখন কারখানা চালু রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।” তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে ব্যাংকও তাদের পুরো টাকা ফেরত পায় না। বরং কারখানা সচল থাকলে ঋণ ধীরে ধীরে পরিশোধ হওয়ার সুযোগ থাকতো। যদিও উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও দেশের ব্যাংকগুলো সামষ্টিকভাবে বড় মুনাফা করেছে। এক অভিজ্ঞ গার্মেন্টস ব্যবসায়ী জানান, গত ২০ বছরে তার কারখানা থেকে ব্যাংকগুলো চার্জ আকারে অন্তত ২০ কোটি টাকার মুনাফা আদায় করেছে। তবে বিপদে পড়ে শ্রমিকদের বেতন ও ভাতার জন্য তিনি মাত্র ৩ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে পাননি।
এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “বাংলাদেশের হাজার হাজার তৈরি পোশাক কারখানাকে কেন্দ্র করেই দেশে ব্যাংক ও বিমা খাতের বিস্তার ঘটেছে। গার্মেন্টস খাতের লেনদেন থেকেই ব্যাংকগুলো প্রতিনিয়ত কমিশন আয় করছে— এলসি খোলা, বিভিন্ন ধরনের লেনদেন কিংবা ঋণ বিতরণ— প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যাংক কমিশন নিচ্ছে। ঋণের ক্ষেত্রে উচ্চ সুদের পাশাপাশি অতিরিক্ত কমিশনের চাপও রয়েছে, যা অনেকটা ‘শাঁখের করাতের’ মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে।” তিনি বলেন, “প্রায় প্রতিটি গার্মেন্ট কোম্পানিরই কোনও না কোনও ব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারত্বমূলক সম্পর্ক রয়েছে। গার্মেন্ট কারখানা থেকে ব্যাংকগুলো নিয়মিত মুনাফা পেলেও, কারখানা সংকটে পড়লে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাংকের সহায়তা পাওয়া যায় না। এমনও উদাহরণ রয়েছে, মাত্র পাঁচ কোটি টাকার দেনার কারণে ২০০ কোটি টাকার কারখানাও বন্ধ হয়ে গেছে।” তিনি দাবি করেন, অনেক সময় বলা হয় ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে ঋণ পুনঃতফসিল বা নবায়ন করা হয়। কিন্তু বাস্তবে ব্যাংকগুলো নিজেদের খেলাপি ঋণের হার কম দেখাতেই এ ধরনের পুনঃতফসিল করে থাকে।
ব্যাংকাররা অবশ্য বলছেন, ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। কোনও প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ঋণ পরিশোধ না করলে সেটিকে খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণ করা ছাড়া উপায় থাকে না।
একজন ব্যাংকার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ব্যাংকেরও দায়বদ্ধতা আছে। আমানতকারীদের টাকা দিয়ে ঋণ দেওয়া হয়। তাই ঋণ পরিশোধ না হলে ব্যাংককে ব্যবস্থা নিতে হয়।” তবে তিনি স্বীকার করেন, শিল্প প্রতিষ্ঠান সচল থাকলে অনেক ক্ষেত্রে ঋণ আদায়ের সম্ভাবনাও বেশি থাকে।
একজন অর্থনীতিবিদ বলেন, “যদি একটি বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান সাময়িক সমস্যায় পড়ে, তাহলে সেটিকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা উচিত। কারণ সেটি বন্ধ হয়ে গেলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন— সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।” তার মতে, শুধু ঋণ পুনঃতফসিল নয়, অনেক ক্ষেত্রে পুনঃঅর্থায়ন, সুদ পুনর্গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনা প্রয়োজন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার প্রকৃত ব্যবসাগুলোর জন্য আরও সাহসী ও পুনরুদ্ধারমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হতো, তাহলে তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারতো এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকগুলোরও লাভ হতো। কারণ সুস্থ ব্যবসা মানেই সুস্থ ঋণগ্রহীতা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বন্ধ হওয়া দেশের সব শিল্প-কারখানা ফের চালু হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, “৫ আগস্টের পর যেসব শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়েছে, তা চালু করা হবে।”
এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, “কিছু কারখানা আগেই বন্ধ হয়েছিল। ৫ আগস্টের পর আরও কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সেই কারখানাগুলোকে কীভাবে আবার উৎপাদনে নিয়ে আসা যায়, সেটা আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি। ব্যাংকগুলোকে আমরা সহায়তা করার কথা বলছি, যাতে তারা উৎপাদনে ফিরে এসে ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করে প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যথায় কারখানার সম্পদ দিন দিন নষ্ট হয়ে যাবে এবং ব্যাংক টাকা ফেরত পাবে না।”


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও