প্রভাত বিনোদন : সমালোচকেরা পাত্তা না দিলেও মুক্তির প্রথম দিনেই বক্স অফিসে ঝড় তুলেছে মাইকেল জ্যাকসনের বায়োপিক ‘মাইকেল’। ২৪ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির প্রথম দিনেই প্রায় ৩৯ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার আয় করে ছবিটি। সপ্তাহান্তে সেই অঙ্ক দাঁড়ায় ৯৫ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে, যা সংগীতভিত্তিক জীবনীচিত্রের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়ার পথে। এর আগে ‘বোহেমিয়ান র্যাপসোডি’ বা ‘স্ট্রেইট আউটা কম্পটন’ যে মানদণ্ড তৈরি করেছিল, তা সহজেই ছাপিয়ে গেছে এই ছবি।
শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও ছবির দাপট সমান। ৮০টির বেশি দেশে মুক্তি পেয়ে প্রথম সপ্তাহেই বিশ্বব্যাপী আয় ২০০ মিলিয়ন ডলার ছুঁয়ে ফেলেছে। মহামারির পর প্রযোজনা সংস্থা লায়নসগেটের কোনো সিনেমার এটিই সবচেয়ে বড় ওপেনিং, যা স্টুডিওটির জন্য এক বিশাল স্বস্তির বার্তা।
মজার বিষয় হলো, সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া পুরোপুরি ইতিবাচক নয়। অনেকেই মনে করছেন, ছবিটি মাইকেল জ্যাকসনের জীবনের বিতর্কিত অধ্যায়গুলো এড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে ১৯৯০-এর দশকের অভিযোগগুলো নিয়ে ছবিতে খুব বেশি গভীরে যাওয়া হয়নি।
কিন্তু দর্শকের প্রতিক্রিয়া একেবারেই ভিন্ন। প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের নাচ–গানের সঙ্গে গলা মেলানো—সব মিলিয়ে যেন একধরনের উদ্যাপনের আবহ তৈরি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, এটি শুধু একটি সিনেমা নয়, বরং ‘একটি অভিজ্ঞতা’—একটি নস্টালজিক টাইম মেশিন, যা দর্শককে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ‘বিলি জিন’ কিংবা ‘থ্রিলার’-এর যুগে।
ছবিটি পরিচালনা করেছেন অ্যান্টনি ফুকোয়া, যিনি এর আগে ‘দ্য ইকুয়ালাইজার’–এর মতো অ্যাকশন চলচ্চিত্রে সফলতা পেয়েছেন। প্রযোজনায় ছিলেন ‘বোহেমিয়ান র্যাপসোডি’র গ্রাহাম কিং। আগেরটির মতো এবারও তিনি আরেকটি সফল সংগীত বায়োপিক উপহার দিতে চলেছেন।সবচেয়ে বড় চমক, ছবিতে মাইকেল জ্যাকসনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তাঁরই ভাতিজা জাফর জ্যাকসন। তাঁর পারফরম্যান্স ইতিমধ্যেই প্রশংসা কুড়িয়েছে—বিশেষ করে মাইকেলের নাচ, ভঙ্গি ও কণ্ঠস্বর অনুকরণের নিখুঁততার জন্য।
এই ছবির পথ মোটেও সহজ ছিল না। নির্মাণের মাঝপথে আইনি জটিলতা, তৃতীয় অঙ্ক পুনর্নির্মাণ—সব মিলিয়ে বাজেট বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৫৫ মিলিয়ন ডলারে। এমনকি ছবির একটি বড় অংশ পুনরায় শুট করতে হয়। কারণ, বাস্তব জীবনের একটি মামলার প্রসঙ্গ দেখানোর ক্ষেত্রে আইনি বাধা ছিল।
মাইকেল জ্যাকসনের জীবনের বিতর্কিত অধ্যায়—বিশেষ করে ১৯৯৩ সালের অভিযোগ—প্রথমে গল্পে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও পরে আইনি জটিলতার কারণে তা বাদ দিতে হয়েছে। ফলে নির্মাতাদের গল্পের ফোকাস সরিয়ে আনতে হয়েছে তাঁর পরিবার, বিশেষ করে বাবা জো জ্যাকসনের সঙ্গে সম্পর্কের দিকে, যা ছবির আবেগঘন স্তরকে আরও গভীর করেছে।
সিনেমাটির নির্মাণপ্রক্রিয়াও ছিল জটিল ও বিতর্কে ঘেরা। এই ছবিতে সংগীতের স্বত্ব, বিশাল কনসার্টের দৃশ্য এবং পুনরায় শুটিং—সব মিলিয়ে খরচ বেড়েছে কয়েক ধাপে। বিশেষ করে ছবির তৃতীয় অংশ নিয়ে বড় পরিবর্তন আনতে হয়েছে।
এ জায়গাই ছবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কারণ, মাইকেল জ্যাকসনের জীবনের আলো-অন্ধকার বুঝতে গেলে তাঁর পারিবারিক সম্পর্ককে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কঠোর ও নিয়ন্ত্রণমূলক বাবার ছায়া তাঁর শৈশব ও ক্যারিয়ারের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ছবিটি সেই দিককেই নতুনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।
এই সাফল্যের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ কাজ করেছে—প্রথমত, মাইকেল জ্যাকসনের বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা। তাঁর গান, নাচ, স্টেজ পারফরম্যান্স—সবকিছুই এখনো বহু প্রজন্মকে আকর্ষণ করে। দ্বিতীয়ত, ছবিটি তৈরি হয়েছে একধরনের ‘ফ্যান সার্ভিস’ হিসেবে, যেখানে দর্শক তাদের প্রিয় তারকার উজ্জ্বল দিকগুলোই বেশি দেখতে পায়। তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবির প্রচারণা ছিল ব্যাপক। মুক্তির আগেই ট্রেলার ও গানগুলো কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
বক্স অফিসের দিকে তাকালে বোঝা যায়, এই ছবির প্রতি দর্শকদের আগ্রহ কতটা প্রবল। ‘দ্য সুপার মারিও গ্যালাক্সি মুভি’ বা ‘প্রজেক্ট হেল মেরি’ ছবি দুটি ভালো ব্যবসা করলেও ‘মাইকেল’–এর তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে। এটি প্রমাণ করে, শক্তিশালী একটি ব্যক্তিত্বকেন্দ্রিক গল্প এখনো দর্শকদের হলে টানতে পারে।
এই সাফল্যের আরেকটি দিকও আছে। সাম্প্রতিক সময়ে হলিউডে বায়োপিকের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। ফ্রেডি মার্কারি থেকে শুরু করে হিপহপ গ্রুপ—বিভিন্ন শিল্পীর জীবন নিয়ে নির্মিত ছবি দর্শকপ্রিয় হয়েছে। তবে ‘মাইকেল’ সেই ধারার এক উচ্চতর উদাহরণ, যেখানে শুধু একজন শিল্পীর জীবন নয়, বরং পুরো একটি যুগকে পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে।
এই ছবির সাফল্য কি শুধু নস্টালজিয়ার ফল, নাকি এটি সত্যিই এক শক্তিশালী চলচ্চিত্র? তার উত্তর সময়ই দেবে। তবে আপাতত নিশ্চিত করে বলা যায়, ‘কিং অব পপ’ রাজত্ব হারাননি। ভ্যারাইটি ও ডেডলাইন অবলম্বনে