……………….মো.নজরুল ইসলাম……………….
বাংলাদেশের চা শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার প্রধান অবলম্বন প্রভিডেন্ট ফান্ড (পিএফ) এখন চরম সংকটে। ১৬৭টি চা বাগানের মধ্যে ৫৮টি বাগানে শ্রমিকদের সঞ্চিত পিএফ-এর বিপুল পরিমাণ অর্থ বকেয়া পড়ে আছে। ফলে অবসরের পর বা জরুরি প্রয়োজনে নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ পাওয়া নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন হাজার – হাজার শ্রমিক।
নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি মাসে চা শ্রমিকদের মূল বেতনের ৭.৫% টাকা প্রভিডেন্ট ফান্ডের জন্য কেটে নেয়া হয়। বাগান কর্তৃপক্ষ সমপরিমাণ অর্থাৎ আরও ৭.৫% অর্থ যোগ করে মোট ১৫% টাকা এই তহবিলে জমা দেয়ার কথা। এছাড়া প্রশাসনিক ব্যয় বাবদ এই মোট অর্থের ওপর আরও ১৫% অর্থ বাগান কর্তৃপক্ষকে জমা দিতে হয়। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, শ্রমিকদের অংশ ঠিকই বেতন কেটে নেয়া হচ্ছে, অথচ মালিকপক্ষ সেই টাকা সময়মতো তহবিলে জমা দিচ্ছে না।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি ক্ষোভ প্রকাশ করে গণমাধ্যম কে বলেন, শ্রমিকের টাকা কেটে নিয়ে বাগান কর্তৃপক্ষ তা দিয়ে ব্যবসা করছে। সময়মতো টাকা জমা না হওয়ায় শ্রমিকরা কেবল দুশ্চিন্তায় নেই, বরং তাদের প্রাপ্য সুদের অংকও কমছে।
ভবিষ্যত তহবিল নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের ২৮শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী ৫৮টি চা বাগানে পিএফ-এর টাকা বকেয়া রয়েছে। বকেয়ার মেয়াদ বাগানভেদে ৩ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত। শ্রমিক নেতাদের মতে, বকেয়া অর্থের পরিমাণ শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
তবে সাম্প্রতিক তৎপরতায় প্রায় ১০ কোটি টাকা আদায় সম্ভব হয়েছে।
সিলেটের কমলগঞ্জ উপজেলার আলীনগর চা বাগানের শ্রমিক সত্য নারায়ন জানান, নিয়ম অনুযায়ী অবসরের ৩ মাসের মধ্যে টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও তাকে ১ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি পঙ্কজ কন্দ বলেন, স্বল্প আয়ের শ্রমিকদের জন্য এই সঞ্চয়টুকুই শেষ ভরসা। সেটিও অনিশ্চিত হয়ে পড়লে বড় ধরনের জীবন সংকট তৈরি হবে চা শ্রমিকদের।
বাগান মালিকদের পক্ষ থেকে সাতগাঁও চা বাগানের ব্যবস্থাপক মোঃ সিদ্দিকুর রহমান মতে, দীর্ঘদিনের লোকসান এবং উৎপাদন খরচের তুলনায় চায়ের দাম কম হওয়ায় এই জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে দ্রুত বকেয়া পরিশোধের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে, তিনি দাবি করেন।
বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের উপ-পরিচালক (নিয়ন্ত্রক প্রভিডেন্ট) মোঃ মহব্বত হোসাইন জানান, বকেয়া আদায়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে প্রশাসন। তিনি বলেন, আমরা ইতিমধ্যে ৬টি বাগানের বিরুদ্ধে শ্রম আইনে মামলা করেছি এবং ৫৮টি বাগানকে বকেয়া পরিশোধের জন্য চিঠি দিয়েছি । ট্রাস্টি বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকি করা হচ্ছে ।
শ্রম অধিদপ্তরের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত একটি ট্রাস্টি বোর্ড এই তহবিল পরিচালনা করেন। শ্রমিকদের দাবি, তদারকি আরও জোরদার করে প্রতি মাসের টাকা প্রতি মাসেই জমা নিশ্চিত করা হোক, যাতে তাদের কর্ম শেষে আর্থিক ভাবে একটু রক্ষা পায়।
বাংলাদেশের চা বাগানের সূচনা
বাংলাদেশে চা চাষের শুরু হয় ব্রিটিশ শাসনামলে। ১৮৪০-এর দশকে ব্রিটিশরা প্রথম চা চাষের সম্ভাবনা খুঁজতে শুরু করে। ১৮৫৪ সালে সিলেট অঞ্চলের মালনিছড়া চা বাগান-এ বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদন শুরু হয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম এবং উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন চা বাগান হিসেবে পরিচিত।
ব্রিটিশ আমলে চা শিল্পের বিস্তার সিলেট, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার ও চট্টগ্রাম পার্বত্য এলাকায় ব্যাপকভাবে চা বাগান গড়ে ওঠে। ব্রিটিশরা মূলত রপ্তানির জন্য চা উৎপাদন করত। ওই সময়ে ভারতের আসাম অঞ্চল থেকেও শ্রমিক এনে চা বাগানে কাজ করানো হতো।
শ্রমিক ও সামাজিক ইতিহাস
চা বাগানের শ্রমিকরা মূলত আদিবাসী ও বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে আনা হয়েছিল। তাদের জীবনযাত্রা ছিল কঠিন এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা স্থায়ীভাবে বাগান এলাকায় বসবাস শুরু করে। এই শ্রমিক সম্প্রদায় আজও বাংলাদেশের চা শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
স্বাধীনতার পর চা শিল্প
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার চা শিল্পকে পুনর্গঠন করে। বাংলাদেশ চা বোর্ড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ করে। যা ধীরে- ধীরে দেশীয় চাহিদাও বৃদ্ধি পায়।
বর্তমান সময়ে চা শিল্প
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম চা উৎপাদনকারী দেশ। সিলেট অঞ্চল এখনও চা উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র। পঞ্চগড় অঞ্চলেও সাম্প্রতিক সময়ে নতুন চা বাগান গড়ে উঠেছে।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব
চা বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য, লক্ষাধিক শ্রমিক এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল, পর্যটনের ক্ষেত্রেও চা বাগান আকর্ষণীয় স্থান।
চ্যালেঞ্জ
শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের প্রয়োজন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, বাংলাদেশে চা বাগানের ইতিহাস শুধু একটি কৃষি শিল্পের গল্প নয়; এটি একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস। ব্রিটিশ আমলে শুরু হওয়া এই শিল্প আজও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
(এই বিভাগের প্রতিটি লেখা লেখকের বাক স্বাধীনতার প্রতিফলন। এ লেখার দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব। এর জন্য পত্রিকা কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়। )