প্রভাত স্পোর্টস : হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে পড়ে মৌসুম শেষ হয়ে গেছে লামিনে ইয়ামালের। বার্সেলোনার হয়ে এ মৌসুমে তাঁকে আর মাঠে দেখা যাবে না। তাঁর বিশ্বকাপে খেলা নিয়ে আপাতত শঙ্কা নেই। কিন্তু ইয়ামাল যদি নির্ধারিত সময়ে সেরে উঠতে না পারেন কিংবা নতুন করে চোটে পড়েন তাহলে বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্নও হুমকিতে পড়তে পারে। আর চোট সারিয়ে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে ফিরলেও ইয়ামাল কতটা ছন্দে থাকবেন, সেই প্রশ্নও আছে।
১৮ বছর বয়সী ইয়ামাল গত বুধবার সেল্তা ভিগোর বিপক্ষে বার্সার ঘরের মাঠে ১–০ গোলে জয়ের ম্যাচে ৪০ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করেন। গোলের পর অবশ্য চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন। গত বৃহস্পতিবারের স্ক্যানে চোটের গুরুতর অবস্থা ধরা পড়ায় লিগ শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে ইয়ামালকে ছাড়াই খেলতে হবে বার্সাকে।
স্পেন দলের জন্য স্বস্তির খবর, ছয় থেকে সাত সপ্তাহের মধ্যেই ইয়ামাল সেরে উঠতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তেমনটা হলে আগামী ১৫ জুন বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের বিপক্ষে ‘এইচ’ গ্রুপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই হয়তো তাঁকে পাবে স্পেন। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় বিশ্বকাপ শুরু হবে আগামী ১১ জুন।
ইয়ামাল ইতিমধ্যেই তাঁর ক্লাব ও জাতীয় দলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। মাত্র ১৫ বছর বয়সে ২০২৩ সালের ২৯ এপ্রিল বার্সেলোনার সিনিয়র দলে অভিষেকের পর এই তিন বছরেই বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলারের কাতারে তাঁর নামটা উঠে এসেছে। লিওনেল মেসির বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সিও তিনি ক্যাম্প ন্যুতে নিজের করে নিয়েছেন। তাই ইয়ামালের অনুপস্থিতি বিশ্বকাপের জন্য অনেক বড় ধাক্কা হতে পারত।
চোট নিয়ে ইনস্টাগ্রামে গতকাল ইয়ামাল লেখেন, ‘ঠিক যখন সবচেয়ে বেশি মাঠে থাকতে চেয়েছিলাম, তখনই এই চোট আমাকে ছিটকে দিল। সতীর্থদের সঙ্গে লড়তে না পারা, দলের প্রয়োজনের সময় সাহায্য করতে না পারা, সবই কষ্ট দিচ্ছে। তবে এটা শেষ নয়, শুধু সাময়িক বিরতি। আমি আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরব, আর আগামী মৌসুম আরও ভালো হবে।’
প্রশ্ন উঠছে, সুস্থ হওয়ার পর ইয়ামাল কি দ্রুত নিজের সেরা ছন্দে ফিরতে পারবেন? অতিরিক্ত খেলার চাপই কি তাঁর এ চোটের কারণ? আর কেন–ই বা বার্সেলোনার খেলোয়াড়েরা এত বেশি হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে ভুগছেন?
ইয়ামালকে এ মৌসুমে অতিরিক্ত ব্যবহার করা হয়েছে কি না—এ প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই ‘হ্যাঁ’-এর দিকে যায়। চলতি মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে সবচেয়ে বেশি সময় মাঠে ছিলেন ইয়ামাল। ট্রান্সফারমার্কেটের তথ্য অনুযায়ী, ৪৫ ম্যাচে তিনি খেলেছেন ৩,৭০২ মিনিট। তাঁর ঠিক পরেই আছেন গোলরক্ষক জোয়ান গার্সিয়া। তিনি মাঠে ছিলেন ৪১ ম্যাচে ৩,৬৮২ মিনিট।
দলের সেরা খেলোয়াড়ই সবচেয়ে বেশি সময় বা ম্যাচ খেলবে সেটাও স্বাভাবিক। ইয়ামাল এই মৌসুমে ২৪টি গোল করেছেন এবং ১৮টি গোল করিয়েছেন। দুই কাজেই তিনি বার্সায় বাকি সতীর্থদের চেয়ে ওপরে। অথচ এখনো তাঁর বয়স ১৯ বছরও হয়নি (জুলাইয়ে হবে), তবু এ মুহূর্তে ইয়ামালই বার্সার সবচেয়ে বড় তারকা।
খেলোয়াড় বড় মাপের হোক বা না হোক, প্রত্যেক খেলোয়াড়েরই যত্ন নেওয়া দরকার। বিশেষ করে যাঁরা তরুণ এবং এখনো শারীরিকভাবে বিকাশের মধ্যে আছেন। এ বিষয়ে ইয়ামালকে ঘিরে আলোচনা শুরু হয়েছিল প্রায় সাত মাস আগেই।
২০২৫–২৬ মৌসুমে চোটের কারণে ইয়ামাল বার্সার হয়ে মাত্র পাঁচ ম্যাচে খেলতে পারেননি। এই ম্যাচগুলো হয়েছে গত সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের মধ্যে। তখন কুঁচকির সমস্যায় ভুগছিলেন, যা মৌসুমের শুরু থেকেই ধীরে ধীরে বাড়ছিল।
এই বিষয়টি নিয়ে বার্সেলোনা এবং রয়্যাল স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। কারণ, স্পেনের হয়ে বুলগেরিয়া ও তুরস্কের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে খেলতে নামার আগে ইয়ামাল ব্যথানাশক ওষুধ নিয়েছিলেন। ওই দুই ম্যাচে স্পেন যথাক্রমে ৩–০ ও ৬–০ গোলে জেতে, যেখানে বুলগেরিয়ার বিপক্ষে ৭৯ মিনিট ও তুরস্কের বিপক্ষে ৭৩ মিনিট খেলেন ইয়ামাল।
ইয়ামাল বার্সেলোনায় ফেরার পর টানা চার ম্যাচে তাঁকে দলে রাখা হয়নি। তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তিনি ‘পিউবালজিয়া’ সমস্যায় ভুগছেন। এটি কুঁচকির একধরনের চোট, যা সাধারণত তরুণ ফুটবলারদের বেশি হয়, বিশেষ করে যাঁরা ঘন ঘন ছোট ছোট ড্রিবল করেন বা হঠাৎ গতি বাড়ানোর ওপর নির্ভর করেন। পরের ম্যাচে বদলি হিসেবে ৩২ মিনিট খেলার পর আবারও তাঁকে এক ম্যাচ বিশ্রামে থাকতে হয়।
ফ্লিক এ ঘটনায় হতাশা প্রকাশ করে বলেন, স্পেনের হয়ে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ইয়ামালকে খেলানোয় তিনি ‘খুবই হতাশ’। তাঁর ভাষায়, ‘এভাবে খেলোয়াড়দের যত্ন নেওয়া যায় না।’ তবে রয়্যাল স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের সূত্রগুলো তখন বলেছিল, ইয়ামাল জাতীয় দলে যোগ দেওয়ার আগে তাঁর কোনো সমস্যা আছে কি না, তা বার্সেলোনা জানায়নি। সে কারণেই তাঁকে আন্তর্জাতিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি।
এরপর ফিটনেস সমস্যার কারণে ইয়ামাল পরবর্তী দুটি আন্তর্জাতিক বিরতিতে খেলতে পারেননি। তবে গত মাসে তিনি সার্বিয়া ও মিসরের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে খেলেন। ফ্লিক সব সময় জোর দিয়ে বলেন, খেলোয়াড়দের নিজেদের শারীরিক অবস্থার ব্যাপারে খোলামেলা থাকতে হবে, ইয়ামালের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। চোট বা অস্বস্তি সামলাতে বার্সার নীতি হচ্ছে ‘শূন্য ঝুঁকি’ নেওয়া।
ইয়ামাল এই মৌসুমে ২৪টি গোল করেছেন এবং ১৮টি গোল করিয়েছেন।
তবে ইয়ামাল নিজেও অন্য সব খেলোয়াড়ের মতো প্রতিটি ম্যাচ খেলতে চান। এই মৌসুমে বদলি করে তুলে নেওয়ায় একাধিকবার তাঁকে অসন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। এ নিয়ে কোনো বিরোধ আছে, এমন ধারণা বারবারই নাকচ করতে হয়েছে বার্সার জার্মান কোচকে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি এ নিয়ে ফ্লিক বলেছিলেন, ‘আমি যখন খেলতাম এবং কোচ আমাকে বদলি করতেন, আমিও খুশি হতাম না। এটা স্বাভাবিক।’
এই মৌসুমে ফ্লিক খুব কমই ইয়ামালকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খেলিয়েছেন। অন্য সতীর্থদের তুলনায় তাঁকে তুলনামূলকভাবে বেশি খেলানো হয়। ৪৫ ম্যাচের মধ্যে ৪২টি ম্যাচে বার্সার শুরুর একাদশে ছিলেন ইয়ামাল। অর্থাৎ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেই তাঁকে প্রথম একাদশে রাখা হয়। এর ফলে তাঁর ওপর শারীরিক চাপও অনেক বেড়েছে।
বার্সার পক্ষ থেকে ব্যাখ্যায় বলা হয়, চোটের মূল কারণ হলো ব্যস্ত ম্যাচ সূচি এবং ফুটবলারদের বিশ্রামের সময় ক্রমেই কমে যাওয়া। তবে বাস্তবতা হলো, চলতি মৌসুমে বার্সেলোনাতে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির স্পষ্ট ধারা দেখা যাচ্ছে। রাফিনিয়া, পেদ্রি, ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং, আলেহান্দ্রো বালদে, এরিক গার্সিয়া, রবার্ট লেভানডফস্কি এবং ফেরান তোরেস—তাঁদের সবাই ২০২৫–২৬ মৌসুমে হ্যামস্ট্রিং চোটে পড়েছেন।
গত নভেম্বরে ‘দ্য অ্যাথলেটিক’–এর প্রতিবেদনে বলা হয়, বার্সার মেডিক্যাল ও ফিটনেস বিভাগে এ বিষয়টি নিয়ে উত্তেজনা ও মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। খেলোয়াড় ও স্টাফদের মধ্যে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধ, এমনকি জিম ওয়ার্কআউট নিয়েও মতবিরোধের অভিযোগ উঠেছিল। এই উত্তেজনা চরমে পৌঁছায় মৌসুমের প্রথম এল ক্লাসিকোর (২৬ অক্টোবর) আগে, যখন রাফিনিয়ার হ্যামস্ট্রিং চোট আবারও ফিরে আসে। এরপর ফ্লিক কিছু দায়িত্বে পরিবর্তন আনেন, তবে তারপরও একাধিক হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির ঘটনা ঘটতে থাকে। এর মধ্যে শুধু রাফিনিয়াই চলতি মৌসুমে তৃতীয়বারের মতো চোট পান।
বার্সেলোনার সামনে এখন বড় একটি বিষয় হলো আগামী প্রাক্–মৌসুমের আগে দলের শারীরিক প্রস্তুতি ও ইনজুরি সমস্যা সমাধান করা। কারণ, খেলোয়াড়দের মধ্যে যেমন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তেমনি ফ্লিকও এ নিয়ে হতাশ।
চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে হারের পর সংবাদ সম্মেলনে ফ্লিককে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, দলে তিনি কীসের অভাব দেখেন? ফ্লিক সরাসরি ইঙ্গিত করেন চলতি মৌসুমে বার্সার বড় সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একের পর এক চোট। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ফ্লিকের খেলার ধরনও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাঁর কৌশল মূলত হাই–প্রেসিং এবং আক্রমণাত্মক অফসাইড ট্র্যাপের ওপর নির্ভরশীল। এই স্টাইল খেলোয়াড়দের বারবার দ্রুত দৌড়, দিক পরিবর্তন এবং তীব্র শারীরিক পরিশ্রম করতে বাধ্য করে। ফলে এমন কৌশল ফলদায়ক হলেও তা হ্যামস্ট্রিংসহ পেশির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে, যা বার্সেলোনার চলতি মৌসুমের ইনজুরি সমস্যার সঙ্গে অনেকটা মিলে যায়।
ইয়ামালের ক্ষেত্রে আপাতত সবচেয়ে স্বস্তির খবর হলো, তিনি বিশ্বকাপ মিস করবেন না। তবু প্রশ্ন থেকে যায়, কতটা ফিট হয়ে তিনি টুর্নামেন্টে পা রাখবেন? আশা করা হচ্ছে, তাঁর এই চোট থেকে সেরে উঠতে ছয়–সাত সপ্তাহ লাগবে। তাই শারীরিক অবস্থার উন্নতি ঠিকভাবে হলে ইয়ামাল সময়মতোই স্পেন জাতীয় দলের ক্যাম্পে যোগ দিতে পারবেন। সেখানে কোচিং স্টাফ শুরু থেকেই তাঁর ফিটনেস নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে স্পেন দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলবে। ৪ জুন করুনাতে ইরাকের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ, এরপর ৮ জুন পুয়েবলাতে পেরুর বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচ। যদি ইয়ামালের সুস্থ হতে সাত সপ্তাহ লাগে, তাহলে এই প্রস্তুতি ম্যাচগুলোতে তাঁকে নাও দেখা যেতে পারে।
আটলান্টাতে কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে স্পেনের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হবে ১৫ জুন। এরপর গ্রুপ পর্বে ২১ জুন সৌদি আরব এবং ২৬ জুন উরুগুয়ের বিপক্ষে মাঠে নামবে স্পেন। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলকে অন্যতম ফেবারিট হিসেবে ধরা হচ্ছে, তাই গ্রুপ পর্ব পার হওয়া তাদের জন্য তুলনামূলকভাবে সহজ হওয়াটাই প্রত্যাশিত। ফলে প্রয়োজন হলে ইয়ামালের খেলার সময় ধীরে ধীরে বাড়ানোর সুযোগও থাকবে। বিশ্বকাপ শুরু হবে আগামী ১১ জুন। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি হয়তো আদর্শ নয়, তবে বড় ধরনের ক্ষতি থেকেও স্পেন রক্ষা পেয়েছে। আর আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ায় স্পেনও এখন ইয়ামালসহ অন্য খেলোয়াড়দের ফিটনেসের দিকে কড়া নজর রাখার সুযোগ পাবে।