সাইফুর রহমান: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার ঘোষণা করেছেন যে বিদেশে তৈরি কম্পিউটার চিপ ও সেমিকন্ডাক্টরের ওপর প্রায় ১০০% আমদানি শুল্ক আরোপ করা হবে। তবে যে কোম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন কার্যক্রম চালাচ্ছে বা কারখানা স্থাপনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তাদের জন্য এই শুল্ক প্রযোজ্য হবে না বলে ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন। ওভাল অফিসে অ্যাপল প্রধান টিম কুক-এর উপস্থিতিতে ট্রাম্প বলেন, “যদি তোমরা যুক্তরাষ্ট্রে নির্মাণ করো, তাহলে কোনো চার্জ নেই।” অর্থাৎ, যারা মার্কিন মাটিতে চিপ তৈরি করবে, তারা ১০০% শুল্কের হাত থেকে রেহাই পাবে। এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য দেশের ভেতরে উৎপাদন বাড়ানো এবং গুরুত্বপূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে দেশে ফিরিয়ে আনা। একই দিনে অ্যাপল যুক্তরাষ্ট্রে অতিরিক্ত ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে, যার ফলে অ্যাপলের মোট প্রতিশ্রুত বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৬০০ বিলিয়ন ডলার। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন ‘লাঠি’র মাধ্যমে (শুল্ক আরোপ করে) কোম্পানিগুলোকে দেশে কারখানা খুলতে বাধ্য করতে চাইছে, যা আগের প্রশাসনের প্রণোদনা-ভিত্তিক কৌশল থেকে ভিন্ন পদক্ষেপ। তবে এত উচ্চ শুল্ক আরোপের ঘোষণায় বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ ছড়িয়েছে এবং তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন দেশ ও শিল্পমহল থেকে প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করেছে।
বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ শৃঙ্খলে সম্ভাব্য প্রভাব
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে ১০০% শুল্কের ফলে বিশ্বের ইলেকট্রনিক পণ্য, গাড়ি থেকে শুরু করে গৃহস্থালী সরঞ্জামের দাম বৃদ্ধির চাপ আসবে। কারণ চিপের দাম দ্বিগুণ হলে সেটি এসব পণ্যের উৎপাদন খরচেও প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে যেসব দেশ বহু বছর ধরে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের অংশ হিসেবে মার্কিন প্রযুক্তি শিল্পের জন্য চিপ বা ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে আসছে, তারা বড় সংকটে পড়তে পারে। ফিলিপাইনের সেমিকন্ডাক্টর শিল্প সংগঠনের প্রধান ড্যান লাখিকা ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে তার দেশের জন্য “ধ্বংসাত্মক” বলে বর্ণনা করেছেন। ফিলিপাইনে রপ্তানির প্রায় ৭০% হচ্ছে সেমিকন্ডাক্টর পণ্য, তাই যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিতে বাধা এলে অর্থনীতিতে বড় আঘাত আসবে বলে তার আশঙ্কা। একইভাবে মালয়েশিয়ার বৈদেশিক বাণিজ্যমন্ত্রী সংসদে সতর্ক করে বলেছেন, এই শুল্কের কারণে তাদের ইলেকট্রনিক পণ্য দামি হয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাজারটি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। চিপ সংযোজন ও প্যাকেজিংয়ে বিশ্বনেতৃস্থানীয় মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোর জন্য এটি বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াবে।
বিশ্বের অন্যান্য প্রধান অর্থনীতি বিষয়টি সামলাতে সমঝোতার পথ নিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমঝোতা করে তাদের অধিকাংশ পণ্যের উপর একক ১৫% শুল্কহার মেনে নিতে সম্মত হয়েছে, যার আওতায় চিপসহ যানবাহন ও ওষুধপত্রও রয়েছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াও পৃথক চুক্তিতে আশ্বাস পেয়েছে যে তাদের চিপ রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্র কোনো দেশ থেকে বেশি শুল্ক নেবে না – ধারণা করা হচ্ছে তারাও প্রায় ১৫% হারে শুল্কের মাঝে থাকবে। তবে যেসব দেশের সাথে এ ধরনের চুক্তি হয়নি কিংবা যারা যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করছে না, তাদের জন্য পরিস্থিতি অনিশ্চিত। বিশেষত চীনা সেমিকন্ডাক্টর নির্মাতারা যেমন SMIC এবং হুয়াওয়ে, যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন না থাকায় কোনো ছাড় পাবে না বলে মনে করা হচ্ছে। চীনে নির্মিত এসব কোম্পানির চিপ মূলত চীনা কারখানায় বানানো ডিভাইসের ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রে যায়; তাই আলাদা করে চিপের উপর ১০০% শুল্ক বসালে সেগুলোর বিপণন কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিশ্লেষকদের মতে, কোনো ‘কম্পোনেন্ট ট্যারিফ’ (অর্থাৎ যন্ত্রে সংযোজিত চিপের ওপর আলাদা শুল্ক) ছাড়া যদি শুধু খোলা চিপের উপর শুল্ক আরোপ করা হয়, তবে তা আংশিক কার্যকর হবে; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র আলাদাভাবে স্মার্টফোন, গাড়ির মতো চিপযুক্ত পণ্যেও কর আরোপের ইঙ্গিত দিয়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে বলা যায়, এই পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন পুনর্গঠনে বাধ্য করবে, যার প্রভাব উন্নত-উদীয়মান সব অর্থনীতির উপরই পড়বে।
টিএসএমসি, স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের কৌশলে পরিবর্তন
ট্রাম্পের ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। যারা যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের মাধ্যমে কারখানা গড়েছে, সেই এশীয় চিপ নির্মাতাদের শেয়ারমূল্য বেড়ে যায় – তাইওয়ানের TSMC-এর শেয়ারের দাম ৪.৪% এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাংয়ের ২% পর্যন্ত উত্থান হয় খবর প্রকাশের পরের দিনই। বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন, এসব কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন রাখায় তারা বাজারে বাড়তি সুবিধা পাবে। বাস্তবেও তাই: তাইওয়ানের সবচেয়ে বড় চিপ প্রস্তুতকারক TSMC ইতিমধ্যে অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যে দুইটি আধুনিক চিপ ফ্যাক্টরি নির্মাণে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে এবং তারা ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে মোট বিনিয়োগ ১৬৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়াবে। দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং টেক্সাসে এবং এসকে হাইনিক্স যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানায় চিপ কারখানা ও গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা শুরু করেছে। সিউলের শীর্ষ বাণিজ্য দূত ইয়েও হান-কু নিশ্চিত করেছেন যে Samsung ও SK Hynix উভয়েই ১০০% শুল্কের আওতার বাইরে থাকবে এবং ওয়াশিংটনের সাথে সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির ফলে দক্ষিণ কোরিয়া সবচেয়ে অনুকূল শুল্কহার পাবে। তাইওয়ান সরকারও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ থাকার কারণে TSMC কার্যত এই শুল্ক থেকে ছাড় পেয়ে যাচ্ছে। ফলে এনভিডিয়া’র মতো মার্কিন গ্রাহকরা TSMC-তে তৈরি চিপ যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহার করলে বাড়তি খরচ বহন করতে হবে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে বাজারে বড় কোম্পানিগুলোর অবস্থান আরো শক্তিশালী হবে। অর্থবহ বিনিয়োগের সক্ষমতা যাদের আছে তারাই এই নতুন ব্যবস্থায় টিকে থাকবে – এক কথায়, “survival of the biggest”, অর্থাৎ বৃহত্তমরাই টিকে থাকার লড়াইয়ে জয়ী হবে। তবে এই শুল্ক হুমকির ফলে TSMC, স্যামসাং-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কৌশলে কিছু মিশ্র পরিবর্তন আনতে পারে। একদিকে তারা যুক্তরাষ্ট্রে আরও বিনিয়োগ ও উৎপাদন সম্প্রসারণে উৎসাহী হবে, যাতে মার্কিন বাজার নিশ্চিন্তে ধরে রাখা যায়। অন্যদিকে নিজ নিজ দেশে এবং বিশ্বের অন্যান্য স্থানে তাদের চলমান উৎপাদনও চালিয়ে যেতে হবে, কারণ বৈশ্বিক চাহিদার বেশিরভাগই এখনো এশিয়াভিত্তিক সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে পূর্ব এশিয়ার বাইরে এত বিপুল পরিমাণ উন্নত চিপ উৎপাদনের সক্ষমতা নেই যা বিশ্ব চাহিদা পূরণে যথেষ্ট হয়। উদাহরণ হিসেবে, মার্কিন কোম্পানি এনভিডিয়া ও এএমডি ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে যে তারা TSMC-এর অ্যারিজোনা ফ্যাব থেকে চিপ সংগ্রহের চেষ্টা করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগও বাড়াবে। তারপরও তাদের চিপের বড় অংশ এখনো তাইওয়ান-দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে উৎপাদিত হচ্ছে এবং জটিল বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল সহজে ভেঙে ফেলে পুরোটাই আমেরিকায় স্থানান্তর করা সম্ভব নয়। ফলে সম্ভাবনা হচ্ছে, এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো দ্বিমুখী কৌশল নেবে – যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা করে মার্কিন বাজার রক্ষা করবে, একইসঙ্গে এশিয়ায় তাদের প্রধান উৎপাদন ঘাঁটিগুলোও সক্রিয় রাখবে যাতে বিশ্ব বাজারে সরবরাহ বজায় থাকে। চিপ শিল্পে দীর্ঘমেয়াদে হয়তো একটি বিভাজন দেখা দেবে, যেখানে “আমেরিকায় তৈরি” চিপ যুক্তরাষ্ট্রে যাবে, আর বাকি চিপ উৎপাদন এশিয়া থেকে অন্য অঞ্চলে সরবরাহ চলবে।
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের প্রধান উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন বাড়ানো। গত এক দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চিপ উৎপাদনের অংশ বিশ্বব্যাপী মাত্র ১২%-এ নেমে এসেছে, যেখানে ১৯৯০ সালে বিশ্ব চিপের ৪০%ই তৈরি হতো আমেরিকায়। এই পতন ঠেকাতে ২০২২ সালে কংগ্রেস $৫২.৭ বিলিয়ন বাজেটের CHIPS এবং Science Act পাস করে, যা চিপ কারখানা তৈরিতে ভর্তুকি ও করছাড় দেয়। এর ফল স্বরূপ ইন্টেল, টিএসএমসি, স্যামসাং সহ পাঁচটি শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রে অত্যাধুনিক চিপ ফ্যাব্রিকেশন প্ল্যান্ট স্থাপনে সম্মত হয়েছিল। বাইডেন প্রশাসনের ওই ‘গাজর’ নীতির বিপরীতে ট্রাম্প এখন ‘লাঠি’ নিয়ে নেমেছেন – শুল্কের ভীতি দেখিয়ে আরো দ্রুত ও ব্যাপক হারে কোম্পানিগুলোকে দেশেই উৎপাদনে আনতে চাচ্ছেন। তিনি মনে করছেন, ১০০% শুল্কের ঝুঁকিতে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা খুলতে বাধ্য হবে, যদিও এতে কোম্পানির লাভ কমে যেতে পারে এবং স্মার্টফোন, টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটরের মতো পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। কোভিড পরবর্তী সময়ে চিপ সংকট যেভাবে গাড়ি থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়েছিল, বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন এত বড় শুল্ক আরোপের ফলে স্বল্পমেয়াদে মার্কিন ভোক্তাদেরও হয়তো বেশি মূল্য দিতে হবে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে এতে মার্কিন প্রযুক্তি খাতের কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়তে পারে। ইতোমধ্যে অ্যাপল যুক্তরাষ্ট্রে অতিরিক্ত ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে যা আগামী চার বছরে ২০,০০০ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে বলে কোম্পানিটি জানিয়েছে। অ্যাপল কর্তৃপক্ষ ওভাল অফিসে প্রেসিডেন্টকে জানিয়েছে যে শীঘ্রই বিশ্বজুড়ে সব আইফোন ও অ্যাপল ওয়াচের জন্য প্রয়োজনীয় গ্লাস যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকি থেকে সরবরাহ করা হবে এবং “অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হওয়া আইফোনও যুক্তরাষ্ট্রেই তৈরি হবে” বলে ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন। অ্যাপলের এই উদ্যোগকে বাজার বিশ্লেষকরা ট্রাম্পের প্রতি একপ্রকার ‘olive branch’ (শীতল সম্পর্ক উষ্ণ করার অঙ্গভঙ্গি) হিসেবে দেখে কোম্পানিটির শেয়ারমূল্য ৬% পর্যন্ত বেড়েছে। অন্যান্য মার্কিন চিপ নির্মাতারাও (যেমন ইন্টেল, গ্লোবালফাউন্ড্রিজ, টেক্সাস ইন্সট্রুমেন্টস) সরকারী প্রণোদনা পেয়ে আগেই দেশীয় উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। তাই নতুন শুল্ক ব্যবস্থার ফলে তারা প্রতিযোগিতায় বাড়তি সুবিধা পাবে এবং দেশে উচ্চ বেতনের কারিগরি চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি পেতে পারে। গবেষণা ও পরামর্শ প্রতিষ্ঠান পিটারসন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো মার্টিন চরজেম্পা মন্তব্য করেছেন, চিপ খাতে ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে এত “গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ” শুরু হয়েছে যে সেক্টরের বড় অংশই শুল্কের বাইরে থেকে যাবে। অর্থাৎ, যে সব কোম্পানি আগে থেকেই মার্কিন মাটিতে কারখানা তৈরিতে billions ডলার ব্যয় করছে, তাদের জন্য তেমন পরিবর্তন আসবে না। বরং যারা এখনো বিশ্ব সরবরাহ শৃঙ্খলের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল (বিশেষত চীনা উৎপাদকরা) তারাই নতুন ব্যবস্থায় কোণঠাসা হবে। সামগ্রিকভাবে, এইশুল্ক হুমকির কারণে চিপ শিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের আত্মনির্ভরতা বাড়ানোর উদ্যোগ আরও বেগ পাবে এবং দেশে অত্যাধুনিক মাইক্রোচিপ উৎপাদন কেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট কর্মসংস্থানের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন পর্যবেক্ষকরা। যদিও এই রূপান্তর সহজ নয়, তবু যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে চিপ সরবরাহে আর বাইরের দেশের মুখাপেক্ষী থাকতে চাইছে না।
দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের ঢেউ দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতেও লেগেছে। বিশেষ করে ভারতের ক্ষেত্রে একই দিনে বড় ধাক্কা এসেছে – রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার কারণে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ট্রাম্প ভারত থেকে আমদানি হওয়া পণ্যের উপর অতিরিক্ত ২৫% শুল্ক আরোপের নির্দেশ দিয়েছেন, যার ফলে চলতি মাসের শেষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় রপ্তানি পণ্যে মোট শুল্কহার দাঁড়াবে ৫০%। এটি মূলত জ্বালানি ক্রয় নিয়ে নেওয়া পদক্ষেপ, কিন্তু সামগ্রিকভাবে ভারতের অর্থনীতিতে এর প্রভাব গুরুতর হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান ভারতকে কিছুটা হতবাক করেছে। কারণ চীন থেকে সরবরাহ শৃঙ্খল সরিয়ে নেওয়ার কৌশলে ভারত নিজেকে বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে; এমনকি অ্যাপল সম্প্রতি কিছু আইফোনের উৎপাদন চীন থেকে ভারতে স্থানান্তরও করেছে। কিন্তু ট্রাম্প সরাসরি টিম কুককে বলেছিলেন, “আমি চাই না আপনি ভারতে উৎপাদন করেন”– যা থেকে বোঝা যায় যে যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব পণ্য ভারতে বানিয়ে আনার চেষ্টা পছন্দ করছে না। এতে ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, তারা হয়তো স্বল্পমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তাদের নবগঠিত ইলেকট্রনিকস উৎপাদন সুবিধার সুফল নিতে পারবে না। বরং ভারতে উৎপাদিত পণ্যের ওপরও যদি মার্কিন শুল্ক বাড়ে, তবে সেই পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাবে। অবশ্য ভারত সরকারও দীর্ঘমেয়াদে চিপসহ প্রযুক্তিখাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ইসরায়েলের টাওয়ার সেমিকন্ডাক্টর ও ভারতের আদানি গ্রুপ মিলে গুজরাটে প্রায় $১০ বিলিয়ন ব্যয়ে একটি সেমিকন্ডাক্টর ফ্যাব স্থাপনের ঘোষণাও দিয়েছে, যা দেশটির প্রথম বড় চিপ কারখানা হতে পারে। এ ধরনেরপ্রকল্প সফল হলে ভারতের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারেও (মার্কিন বাজার ব্যতীত) তারা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চিপ তৈরি করে রপ্তানি করতে গেলে সেই পণ্যও শুল্কের মুখে পড়বে, যদি না যুক্তরাষ্ট্র-ভারত কোনো সমঝোতায় পৌঁছে। সেজন্য নয়াদিল্লি কূটনৈতিক উপায়ে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করবে, নতুবা তাদের প্রযুক্তি রপ্তানিকারকদের অন্য বাজার খুঁজতে হবে।
দক্ষিণ এশিয়ার আরেক গুরুত্বপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ, যে সরাসরি সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি করে না, তবু এই বাণিজ্য যুদ্ধের বড় আঁচ এসে পড়েছে সেখানে। যদিও বাংলাদেশ এখনো সরাসরি চিপ উৎপাদক দেশ নয়, তবে এই পরিস্থিতি একটি নতুন উইন্ডো খুলে দিচ্ছে – মাধ্যমিক সেমিকন্ডাক্টর সাপ্লাই চেইনে প্রবেশের।
বিশ্বজুড়ে বড় চিপ কোম্পানিগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রে তাদের প্রধান কারখানা (ফ্যাব) স্থাপন করছে, কিন্তু নিম্ন ব্যয়ের অ্যাসেম্বলি ও প্যাকেজিং কার্যক্রম সাধারণত আউটসোর্স করে থাকে। মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো এ খাতে ইতিমধ্যে সাফল্য দেখিয়েছে।
বাংলাদেশও চাইলে এই খাতে প্রবেশ করতে পারে – বিশেষ করে যদি সরকার ও শিল্প উদ্যোক্তারা একযোগে“OSAT” (Outsourced Semiconductor Assembly and Testing)সার্ভিস অফার করার উদ্যোগ নেয়।
• স্বল্প খরচের শ্রম
• বিদ্যমান গার্মেন্টস-আধিপত্য নির্ভর অর্থনীতিকে বহুমুখীকরণ
• যুবকেন্দ্রিক প্রযুক্তিশিক্ষা উন্নয়ন
– এই তিনটি দিক বাংলাদেশের বড় সম্পদ হতে পারে।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি বছর ইলেকট্রিক্যাল ও কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পাস করছে। কিন্তু তাদের অনেকেই সফটওয়্যার বা নন-টেক ফিল্ডে চলে যাচ্ছেন দক্ষতার অভাবে।
এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে এখনই দরকার:
• ভিএলএসআই ডিজাইন, ইডিএ সফটওয়্যার, আইপি কোর, এফপিজিএ প্রোগ্রামিং ইত্যাদি বিষয়ে স্পেশাল ট্রেনিং।
• পলিটেকনিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে “চিপ ডিজাইন অ্যান্ড প্যাকেজিং” বিষয় সংযোজন।
• সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে“সেমিকন্ডাক্টর ইনোভেশন হাব”প্রতিষ্ঠা।
চীন-মার্কিন দ্বন্দ্বের কারণে বহু পশ্চিমা প্রতিষ্ঠান এখন চায়“চীন-প্লাস-ওয়ান”নীতি অনুসরণ করতে – অর্থাৎ চীনের বাইরে একটি বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজতে। ভারত ইতিমধ্যে এই দৌড়ে এগিয়ে গেছে।বাংলাদেশেরও উচিত, জাপান, কোরিয়া, ইউরোপিয়ান ইলেকট্রনিক্স কোম্পানির সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চার বা প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে OSAT সুবিধা গড়ে তোলা।চিপের খালি ফ্যাব গড়া যেখানে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ দরকার, সেখানে প্যাকেজিং/টেস্টিং সুবিধা তুলনামূলকভাবে স্বল্প মূল্যে করা সম্ভব। এবং এখানেই বাংলাদেশের প্রথম পদক্ষেপ শুরু হতে পারে।