• বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৫:২৭ অপরাহ্ন
Headline
২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে বিক্রি হয়ে গেলো একটি প্যাকেজ টিকিট, যার মূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা স্পিডের কারণেই পেনাল্টি মিস করেছেন মেসি! আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচে বিতর্কিত রেফারিং, আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দিলো ফিফা বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়ে নতুন কোচ রাফায়েল মার্কেজকে নিয়োগ দিল মেক্সিকো মেসির কাছ থেকে উপহারও পাবেন ক্লোসা আর্জেন্টাইন তারকাসহ বিশ্বকাপে নিষেধাজ্ঞার শঙ্কায় ১৮ ফুটবলার জয়াকে ঘিরেই ফিরছে ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’ শপথ নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করল বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নতুন কমিটি ‘কিং’-এর বাজেট ৪৫০ কোটি? নির্মাতার ভিন্ন ইঙ্গিত ‘রামায়ণ’-এর রেকর্ড, এলো ট্রেলার মুক্তির খবরও

ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণে ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ অনুমোদন দিল সরকার

Reporter Name / ৯ Time View
Update : বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬

প্রভাত অর্থনীতি: ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে অর্থায়নের জন্য ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইএসডিবি) থেকে ১ দশমিক ০০৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদন দিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এই ঋণকে অত্যন্ত ‘হাইলি নন-কনসেশনাল’ (কঠোর) শর্তের অর্থায়ন হিসেবে অভিহিত করেছেন।
প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের এই ঋণের অনুমোদন মঙ্গলবার শেরে বাংলা নগরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত স্ট্যান্ডিং কমিটি অন নন-কনসেশনাল লোন (এসসিএনসিএল)-এর সভায় দেয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন অর্থমন্ত্রী নিজেই।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)-এর কর্মকর্তারা বলেন, অর্থায়নের শর্ত তুলনামূলক ব্যয়বহুল হলেও বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য রিফাইনারি সম্প্রসারণ প্রকল্পটি বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সভায় উপস্থাপিত নথি অনুযায়ী, আইএসডিবির অর্থায়ন দুটি প্যাকেজে বিভক্ত। এর মধ্যে ‘ফরওয়ার্ড লিজ-১’-এর আওতায় ৫২০ দশমিক ৫৯ মিলিয়ন ডলার এবং ‘ফরওয়ার্ড লিজ-২’-এর আওতায় ৪৮৩ দশমিক ১০ মিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়া হবে। এছাড়া, প্রথম প্যাকেজের অধীনে ০ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলারের একটি কারিগরি সহায়তা অনুদানও দেয়া হবে।
ইআরডির কার্যপত্র অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচলিত সুদের হারের তুলনায় এই ঋণের অর্থায়ন ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি।
ইআরডির কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের ৫ জুলাইয়ের ছয় মাস মেয়াদি টার্ম সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট (এসওএফআর) ৩ দশমিক ৮৪৬২৭ শতাংশ বিবেচনায় এই ঋণের মোট মার্ক-আপ হার দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৪৪৬২৭ শতাংশ। এর মধ্যে ১ দশমিক ৬০ শতাংশ স্প্রেড ও ঝুঁকি প্রিমিয়াম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ঋণের মেয়াদ ২০ বছর। এর মধ্যে প্রথম পাঁচ বছর রেয়াতকাল এবং বাকি ১৫ বছর প্রতি ছয় মাস অন্তর কিস্তি পরিশোধ করতে হবে।
ইআরডি ‘ফরওয়ার্ড লিজ-১’ ও ‘ফরওয়ার্ড লিজ-২’—উভয় অর্থায়ন প্যাকেজকেই ‘হাইলি নন-কনসেশনাল’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। ‘ফরওয়ার্ড লিজ-১’-এর গ্র্যান্ট এলিমেন্ট ঋণাত্মক ৩ দশমিক ১২ শতাংশ এবং ‘ফরওয়ার্ড লিজ-২’-এর ক্ষেত্রে ঋণাত্মক ৩ দশমিক ২৪ শতাংশ।
কর্মকর্তারা জানান, অনুমোদনের সুপারিশ করার আগে ইআরডি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে। যেহেতু প্রতি ছয় মাস অন্তর ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে, তাই এসওএফআর বেঞ্চমার্কের পাশাপাশি প্রযোজ্য স্প্রেড ও ঝুঁকি প্রিমিয়াম সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হবে। ফলে ঋণ পরিশোধের পুরো সময়জুড়ে ‘গ্র্যান্ট এলিমেন্ট’ এবং ‘কনসেশনালিটির’ মাত্রাও পরিবর্তিত হতে থাকবে।
ইআরডি আরও সুপারিশ করেছে, সরকার বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বা ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) কাছে ‘অন-লেন্ডিংয়ের’ মাধ্যমে এই ঋণের অর্থ হস্তান্তরের আগে অর্থ বিভাগ যেন বিপিসির আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়ন করে। এর উদ্দেশ্য হলো, রিফাইনারিটি যেন সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা সৃষ্টি না করে নিজস্ব সক্ষমতায় ঋণ পরিশোধ করতে পারে, তা নিশ্চিত করা।
ইআরডি আরও নির্দেশ দিয়েছে, ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের আগে প্রকল্প প্রস্তুতি-সংক্রান্ত ইআরডির নির্ধারিত সব শর্ত পূরণ করতে হবে। ঋণের কিস্তি প্রতি বছর ৩০ জুন এবং ৩১ ডিসেম্বর পরিশোধ হওয়ার কথা রয়েছে।
ইআরডির কার্যপত্র অনুযায়ী, বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক অপরিশোধিত জ্বালানি তেল শোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ টন। দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে আরও ৩০ লাখ টন সক্ষমতা যুক্ত হবে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির মোট বার্ষিক পরিশোধন সক্ষমতা তিন গুণ বেড়ে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে। এর মাধ্যমে আমদানি করা পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
কর্মকর্তারা জানান, ২০২৬ সালের ৮ থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি পরিকল্পনা প্রতুতির কাজ সম্পন্ন হয়। এরপর ৮ থেকে ১২ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় প্রকল্প মূল্যায়ন কার্যক্রম।
২৮ এপ্রিল আইএসডিবির প্রতিনিধিদের সঙ্গে ঋণসংক্রান্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ১৪ মে ইআরডি সচিবের সভাপতিত্বে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরে ২০ মে আলোচনার কার্যবিবরণীতে সই করা হয়।
৩ জুন আইএসডিবির ঢাকা আঞ্চলিক হাব থেকে ঋণচুক্তির খসড়া পাঠানোর পর প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য এসসিএনসিএলের ৪৫তম সভায় উপস্থাপন করা হয়।
ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, আইএসডিবির প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মদ সুলাইমান আল জাসেরের বাংলাদেশ সফরের সময় আগামী আগস্টের মাঝামাঝি ঋণচুক্তি সই হতে পারে।
সভায় উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানান, অর্থমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রকল্পটি এত দিনেও বাস্তবায়ন না হওয়ায় তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। ওই কর্মকর্তা জানান, অর্থমন্ত্রীর মতে, প্রকল্পটি আগে বাস্তবায়িত হলে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে যে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে, তা মোকাবিলায় বাংলাদেশ আরও ভালো অবস্থানে থাকতে পারত।
চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের ব্যয় এখন ধরা হয়েছে ৩১ হাজার ০০০ দশমিক ৫৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দেবে ১৮ হাজার ৫৬৬ দশমিক ৭৪ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নিজস্ব তহবিল থেকে দেবে ১২ হাজার ৪৩৩ দশমিক ৮৩ কোটি টাকা। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত। গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) শর্তসাপেক্ষে ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির নীতিগত অনুমোদন দেয়। পরবর্তী যাচাই-বাছাই শেষে প্রকল্প ব্যয় ৪ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা কমানো হয়।
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারি দেশের মোট পেট্রোলিয়াম পণ্যের চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ পূরণ করে। বাকি চাহিদা বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে আমদানির মাধ্যমে মেটাতে হয়।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, নতুন রিফাইনারিতে ইউরো-৫ মানের গ্যাসোলিন ও ডিজেল উৎপাদন করা হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান রিফাইনারিতে উৎপাদিত ডিজেল, মোটর স্পিরিট (এমএস) এবং অকটেনকে ইউরো-৫ মানে উন্নীত করা হবে। কর্মকর্তারা আরও জানান, বিপিসি ইতোমধ্যে ‘ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) উইথ ডাবল পাইপলাইন’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এর মাধ্যমে বছরে সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিবহন করা সম্ভব হবে।
সম্প্রসারিত রিফাইনারিটি চালু হলে প্রতি বছর প্রায় ৪ লাখ টন ফার্নেস অয়েল, ৬০ হাজার টন এলপিজি, ৬ লাখ টন ইউরো-৫ মানের গ্যাসোলিন, ১১ লাখ টন ইউরো-৫ মানের ডিজেল, ২ লাখ টন লুব বেস অয়েল এবং ৫ লাখ টন জেট ফুয়েল উৎপাদন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং সরকারের ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তাও হ্রাস পাবে।
বাংলাদেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রামে ফ্রান্সের টেকনিপ-এর তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় পরিশোধন ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা প্রথম ঘোষণা করা হয় ২০১০ সালে। পরে ২০১৩ সালে তৎকালীন সরকার ১৩ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দেয়। তবে বারবার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা এবং অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার কারণে নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। ২০২২ সালে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয়। ততদিনে এর ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালের শুরুতে এস আলম গ্রুপ ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ইআরএল-২ নির্মাণের প্রস্তাব দেয় এবং ৯ জুলাই জ্বালানি বিভাগ সেই প্রস্তাব অনুমোদন করে পরে আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রকল্পটি স্থগিত হয়ে যায়।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রকল্পটি আবার চালু করে এবং প্রথমে বিদেশি অর্থায়নের উদ্যোগ নেয়। সে সময় প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৬ হাজার ৪১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৫ হাজার ৫০০ দশমিক ৭৭ কোটি টাকা বৈদেশিক অর্থায়ন এবং ১০ হাজার ৯০৯ দশমিক ৩২ কোটি টাকা বিপিসির নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
বৈদেশিক অর্থায়ন নিশ্চিত না হওয়ায় সরকার বিপিসির নিজস্ব অর্থায়নের পাশাপাশি সরকারি তহবিল থেকে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। পরে সংশোধিত ব্যয় প্রাথমিকভাবে বেড়ে দাঁড়ায় ৪২ হাজার ৯৭৩ দশমিক ৭০ কোটি টাকা। তবে পরিকল্পনা কমিশনের আরও যাচাই-বাছাই শেষে প্রকল্প ব্যয় কমিয়ে আনা হয়।
ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড ১৯৬০ সালে অনুমোদন পায় এবং ১৯৬৮ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। সে সময় কোম্পানিটির ৩৫ শতাংশ মালিকানা ছিল তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের (ইপিআইডিসি), আরও ৩৫ শতাংশ মালিকানা ছিল তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের সাবেক বাণিজ্যসচিব ও আইসিএস কর্মকর্তা আব্বাস খালিলির নেতৃত্বাধীন বেসরকারি ব্যবসায়ীদের হাতে। বাকি ৩০ শতাংশ মালিকানা ছিল যুক্তরাজ্যের বার্মাহ অয়েল কোম্পানির।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category