প্রভাত অর্থনীতি: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এটি তারল্য সংকট নয়; বরং নতুন নোট ছাপানোর ঘাটতির কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে ব্যাংকাররা সতর্ক করে বলেছেন, এমন পরিস্থিতি আমানতকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে। নতুন নোটের সংকটের কারণে গত এক সপ্তাহ ধরে কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী নগদ অর্থ পাচ্ছে না। এতে ঈদুল আজহার আগে ব্যাংকগুলোতে চাপ তৈরি হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এটি তারল্য সংকট নয়; বরং নতুন নোট ছাপানোর ঘাটতির কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে ব্যাংকাররা সতর্ক করে বলেছেন, এমন পরিস্থিতি আমানতকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার একটি ব্যাংক ৫৮০ কোটি টাকার চাহিদার বিপরীতে পেয়েছে মাত্র ১২০ কোটি টাকা। একইভাবে কোনো ব্যাংক ১২০ কোটির বিপরীতে ৪০ কোটি, ১০০ কোটির বিপরীতে ৩৫ কোটি এবং ১১৫ কোটির বিপরীতে ৪৫ কোটি টাকা পেয়েছে।
একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর চাহিদার মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ নগদ অর্থ সরবরাহ করছে। গত সাত-আট দিন ধরে এ পরিস্থিতি চলছে। ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ নগদ টাকার চাহিদা দিচ্ছে, তার তুলনায় অনেক কম অর্থ পাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নগদ টাকার পরিবর্তে গ্রাহকদের ইলেকট্রনিক লেনদেন ব্যবহারে উৎসাহিত করতে বলছে।
আরেকটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, “ঈদের আগে গ্রাহকদের টাকা তোলার চাহিদা বেড়ে যায়। শাখা ও এটিএম বুথ—দুই জায়গাতেই নগদ টাকার চাহিদা কয়েক গুণ বাড়ে। বিশেষ করে গরুর হাটের আশপাশের এটিএম বুথগুলোতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি টাকা তোলা হয়। তিনি বলেন, ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের বোনাস ও ভাতা দেওয়া হয়। ফলে এ সময় ব্যাংকের শাখাগুলোতে নগদ টাকার চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, রোববার বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে ৪ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট সরবরাহ করা হবে। কর্মকর্তারা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পর্যাপ্ত তারল্য রয়েছে, কোনো ধরনের তারল্য সংকট নেই। তবে নতুন ছাপানো নোটের ঘাটতি রয়েছে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ও পুরোনো নোট তুলে নিচ্ছে। ছোট নোটের বদলে বড় নোট সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে, কারণ কোরবানির সময় বড় নোটের চাহিদা বেশি থাকে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, ঈদের আগে টাকশাল থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট চেয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে কাগজ ও কালি সংকটের কারণে এর অর্ধেক, অর্থাৎ প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিযুক্ত পুরোনো নকশার প্রায় ১৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকার নোট মজুত রয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এসব নোট বাজারে ছাড়তে চাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোট মুদ্রা মজুত রয়েছে প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকা। অন্যদিকে ছাপানো টাকার চাহিদা ৩ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি। পুরোনো নকশার নোট দীর্ঘদিন বাজারে না ছাড়ায় চাহিদা ও জোগানের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছাপানো টাকার সংকট এবং তারল্য সংকট এক বিষয় নয়। বর্তমানে নতুন ছাপানো নোটের ঘাটতি তৈরি হলেও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্যের কোনো সংকট নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, “ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ টাকার চাহিদা জানাবে, তা পূরণের চেষ্টা করা হবে। নতুন ছাপানো নোটগুলো পর্যায়ক্রমে বিতরণ করা হবে। চাহিদা অনুযায়ী কোনো ব্যাংক কম টাকা পেলেও পরবর্তী সময়ে আবার চাহিদা দিলে সেই অর্থ দেওয়া হবে। তিনি বলেন, “আশা করি টাকার কোনো সংকট তৈরি হবে না। তবে আমাদের লক্ষ্য শুধু নগদ লেনদেন নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক চায় দেশে একটি ক্যাশলেস সমাজ গড়ে উঠুক।
এদিকে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, যদি কোনো গ্রাহককে বলা হয় ব্যাংকে নগদ অর্থ কম রয়েছে, তাহলে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। তখন গ্রাহকরা মনে করতে পারেন ব্যাংকে হয়তো টাকা নেই। এতে এক ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি হতে পারে। তিনি আরও বলেন, এমনিতেই ব্যাংক খাত নিয়ে এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। আমরা জানতে পেরেছি, শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিযুক্ত নোট বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ছাড়তে চাচ্ছে না। সেগুলো ছাড়া বর্তমান চাহিদা কীভাবে সামাল দেয়া হবে, সেটিও স্পষ্ট নয়।