• শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৪:১৭ পূর্বাহ্ন
Headline
জাতিসংঘে নিউ আরবান এজেন্ডা পর্যালোচনা বৈঠকে বক্তব্য রাখলেন পিরোজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আমরা সংবিধান সংশোধন করতে চাই, কখনোই সংস্কারের কথা বলিনি: মির্জা ফখরুল নতুন ভোটার হওয়ার সুযোগ, সময় ১৫ দিন এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চট্টগ্রামে বন্যায় ক্ষতি ১৫০ কোটি বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য ভেঙে ফেলছে কারা, প্রশাসন বলছে জানে না রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত ডুবুরি সাদিক হোসেন শুভর পদক বুকে নিয়ে আহাজারি করছেন মা যশোরের স্থানীয় পত্রিকার সাংবাদিকের আত্মহত্যা হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের উদ্যোগে কওমি ধারার ৭ ইসলামি দলের নতুন জোটের আভাস মির্জাপুরে নৌকা ভ্রমণ ও মাছ ধরতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ৩ জনের মৃত্যু, আহত ৪

এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা

Reporter Name / ৪১ Time View
Update : শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬
ছবি সংগৃহীত

প্রভাত রিপোর্ট: বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন একটি অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে ৬ থেকে ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন (৬০০ থেকে ৬৫০ কোটি) ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। সরকারের লক্ষ্য, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই নতুন ঋণচুক্তি সম্পন্ন করা। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতেই প্রথম কিস্তির অর্থ ছাড় হতে পারে।

তবে এবার শুধু ঋণ নয়, তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে অর্থনৈতিক সংস্কার। পাঁচ দিনের ঢাকা সফর শেষে আইএমএফ স্পষ্ট করে দিয়েছে— বাংলাদেশকে রাজস্ব আয় বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো এবং ব্যাংকিং খাতের দ্রুত সংস্কারের বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে।

অন্যদিকে সরকারও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, নির্বাচিত সরকার হিসেবে জনস্বার্থ ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় একসঙ্গে কঠোর সব শর্ত বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই সংস্কার হবে ধাপে ধাপে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আইএমএফের সঙ্গে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন সরকার আগের কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে নতুন বাস্তবতায় একটি নতুন ঋণ কর্মসূচির প্রস্তাব দেয়।

এই ঋণের অর্থ শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতেই নয়, বরং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা পুনরুদ্ধার এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন সহজ করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

১২ থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত আইএমএফের বাংলাদেশ মিশনের প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে। এসব বৈঠকে সংস্থাটি পাঁচটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। সেগুলো হলো– রাজস্ব আয় বৃদ্ধি; মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ; বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা; সরকারি ব্যয় বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং খাতের দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার।

আইএমএফের মতে, প্রবাসী আয় ইতিবাচক থাকলেও বৈদেশিক খাতের ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। একইসঙ্গে খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থাপনা এবং কম রাজস্ব আহরণ বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে।

ঢাকা সফর শেষে দেওয়া বিবৃতিতে আইএমএফ চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩ দশমকি ৫ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।

এটি সরকারের নির্ধারিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেক।

সংস্থাটি আরও সতর্ক করেছে, প্রয়োজনীয় রাজস্ব ও ব্যাংকিং সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশেরও নিচে নেমে যেতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কোনও দেশের প্রবৃদ্ধি দীর্ঘ সময় ৩ শতাংশের নিচে থাকলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। শিল্পে বিনিয়োগ হ্রাস পায়, মানুষের আয় বাড়ার গতি কমে এবং ভোগ ব্যয়ও সংকুচিত হয়। ফলে পুরো অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম নিম্ন। সরকারের উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতেই রাজস্ব বৃদ্ধি এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আইএমএফের মতে, শুধু করের হার বাড়ালেই হবে না। কর প্রশাসন আধুনিক করা, করের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি কমানো এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় ডিজিটাল সংস্কার জরুরি।

ঢাকার বৈঠকগুলোতে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে ব্যাংকিং খাত নিয়ে।

খেলাপি ঋণের উচ্চমাত্রা, দুর্বল ব্যাংক পরিচালনা, মূলধন ঘাটতি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সুশাসনের অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইএমএফ।

সংস্থাটি বলেছে, ব্যাংক পুনর্গঠনের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য, সমন্বিত ও সময়ভিত্তিক কৌশল প্রয়োজন। শুধু দুর্বল ব্যাংক চিহ্নিত করলেই হবে না, সেগুলো পুনর্গঠন কিংবা প্রয়োজন হলে একীভূত করার মতো কার্যকর সিদ্ধান্তও নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে না পারলে বেসরকারি বিনিয়োগও প্রত্যাশিত হারে বাড়বে না।

আইএমএফ মনে করছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়েছে। এতে আমদানি ব্যয় বাড়ছে, ভর্তুকির চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখা এবং একইসঙ্গে বিচক্ষণ রাজস্বনীতি অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

ডলারের বিনিময় হার আরও বাজারভিত্তিক করতে ২০২৫ সালে চালু হওয়া ‘ক্রলিং পেগ’ ব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নেরও সুপারিশ করেছে আইএমএফ।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, নতুন কর্মসূচির ভিত্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে সংস্কার বাস্তবায়ন হবে নির্বাচিত সরকারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী কোনও দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপে পরিবর্তন আনা হবে।

সরকারের মতে, একসঙ্গে কঠোর শর্ত বাস্তবায়ন করলে অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। তাই বাস্তবসম্মত সময়সূচি অনুযায়ী সংস্কার এগিয়ে নেওয়াই হবে কৌশল।

সূত্র জানায়, জুলাইয়ের এই সফরের পর আগামী কয়েক মাসে আইএমএফের সঙ্গে একাধিক ভার্চ্যুয়াল বৈঠক হবে।

এরপর অক্টোবর মাসে ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। নভেম্বরে আইএমএফের আরেকটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসতে পারে।

সবকিছু ঠিক থাকলে ডিসেম্বরের মধ্যেই নতুন ঋণ কর্মসূচির চুক্তি সই হতে পারে এবং ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম কিস্তির অর্থ ছাড়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদের মতে, নতুন ঋণ পাওয়ার চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার বাস্তবায়ন। রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ কমানো এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করতে না পারলে শুধু ঋণ নিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমানও মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন আইএমএফ কর্মসূচি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে সংস্কারের বাস্তবায়নের ওপর। রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন, ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহি, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ এবং কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ছাড়া ঋণের অর্থ দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবে না।

আইএমএফের এবারের বার্তায় একটি বিষয় স্পষ্ট, তাদের প্রধান উদ্বেগ ঋণের পরিমাণ নয়, বরং সংস্কারের গতি ও বিশ্বাসযোগ্যতা। আগের কর্মসূচির অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার তারা বাস্তবায়নযোগ্য রোডম্যাপ দেখতে চাইছে।

অন্যদিকে সরকারও আগের মতো কঠোর শর্ত একবারে মেনে নেওয়ার পথে হাঁটছে না। জনস্বার্থ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় ধাপে ধাপে সংস্কারের কৌশল নিয়েছে।

ফলে আগামী কয়েক মাস শুধু নতুন ঋণচুক্তির জন্যই নয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে যাচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category