• বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ০১:২৩ পূর্বাহ্ন
Headline
জুলাই হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হলে সাবেক সচিব জিয়াউল আলমকে এইচএসসি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে দেশে বিশৃঙ্খলার অপচেষ্টা চলছে এস কে সুরের দুর্নীতির মামলার যুক্তিতর্ক শেষ, রায় ২৮ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট ও প্রধান বিচারপতির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করায় সহকারী রেজিস্ট্রার বরখাস্ত গৃহায়ন খাতে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম-স্বজনপ্রীতি হলে ব্যবস্থা: ত্রাণমন্ত্রী ‘শিক্ষিত তরুণরা খামার ব্যবস্থাপনায় এলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা মজবুত হবে’ বেসরকারি হাসপাতালেও কম খরচে ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে হবে: সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দক্ষতার ঘাটতিতে দেশে উচ্চশিক্ষিত ৯ লাখ যুবক বেকার আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে ভারত-ভিয়েতনাম, চাপে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি

ওয়াশিংটনের কূটনীতিতে ক্ষয় ধরাচ্ছে ট্রাম্পের আমেরিকা

Reporter Name / ৫০ Time View
Update : শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬
ছবি সংগৃহীত

প্রভাত ডেস্ক: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রমাগত হুমকি, ব্যক্তিনির্ভর কূটনীতি ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দুর্বল হয়ে পড়া মার্কিন দূতাবাস আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ওয়াশিংটনের উপস্থিতির ধরন বদলে দিচ্ছে। ইউরোপ থেকে এশিয়া পর্যন্ত মিত্র দেশগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগের নতুন কৌশল খুঁজছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা ট্রাম্পের বক্তব্যকে উপেক্ষা করে বিকল্প কূটনৈতিক পথ তৈরির চেষ্টা করছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ক্রমশ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তি ও ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ বৃত্তকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে।
‘আজ রাতেই একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।’—গত এপ্রিলে ইরানকে নিয়ে এমন হুমকি দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর এই বক্তব্যের পর ইউরোপের বিভিন্ন রাজধানীতে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
ওয়াশিংটনে কর্মরত এক ইউরোপীয় কূটনীতিক জানান, ট্রাম্পের সেই হুমকির পর তাঁদের দেশের সরকার তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিল, ট্রাম্প কি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ইঙ্গিত দিচ্ছেন?
উদ্বেগ শুধু ইরানকে ঘিরেই ছিল, বিষয়টি এমন নয়। ইউরোপের দেশগুলো আশঙ্কা করছিল, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়াও ট্রাম্পের মতো একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করতে পারে। ফলে দুই অঞ্চলে একসঙ্গে পারমাণবিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল।
ইরানকে নিয়ে ট্রাম্পের হুমকির পর যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি একটি কঠোর যৌথ বিবৃতি তৈরি করেছিল। কিন্তু পরে তারা সেটি প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের কিছু দেশ মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিন্তু কূটনীতিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রকৃত অর্থ কী বা তিনি আসলে কী করতে চান— তা পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারাও নিশ্চিত করে বলতে পারেননি। ইরান নিয়ে যা ঘটেছে এবং ঘটে চলছে, তা আসলে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। বরং এতে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ব্যবস্থার গভীর সংকট ফুটে উঠেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন বলা হয়েছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত কূটনৈতিক কাঠামো দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে বিশ্বের অন্তত অর্ধেক মার্কিন দূতাবাসে রাষ্ট্রদূত নেই। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে অনেক দূতাবাসের কাজ চালানো হচ্ছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের শিক্ষক মার্গারেট ম্যাকমিলান বলেন, এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক বোঝার ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এতে দেশটির ভবিষ্যতে সংঘাত ঠেকানো ও সমঝোতা তৈরির সক্ষমতা কমে যেতে পারে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এ ধরনের দুর্বলতার কথা অস্বীকার করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগটের ভাষ্যমতে, প্রশাসনের নানা পরিবর্তন কূটনীতিকে আরও কার্যকর ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ করেছে।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে রয়টার্স ৫০টির বেশি কূটনীতিক, সাবেক রাষ্ট্রদূত, হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তা এবং ইউরোপ ও এশিয়ার সরকারি ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁদের অনেকে বলেছেন, ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণ এখন প্রতিষ্ঠান নয়, অনেকাংশে প্রেসিডেন্টের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল।
বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের সময় এই দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের সময় ইরান-সংলগ্ন অনেক দেশে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রদূত ছিল না। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক বারবারা লিফ বলেন, যুদ্ধের সময় এসব মিশনে রাষ্ট্রদূত না থাকা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
পররাষ্ট্র দপ্তর পুনর্গঠন ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম বড় কাজ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ২০২৫ সালে দপ্তরটিকে ‘অতিরিক্ত বড়’ ও ‘আদর্শগতভাবে পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে উল্লেখ করেন। এরপর প্রায় তিন হাজার কর্মী চাকরি হারান বা স্বেচ্ছায় বিদায় নেন। পরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৩০ জন রাষ্ট্রদূতকে হঠাৎ ফিরিয়ে আনা হয়। অনেক অভিজ্ঞ কূটনীতিক এটিকে ‘স্যাটারডে নাইট ম্যাসাকার’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁদের মতে, এতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের পেশাদার কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ১৯৭৩ সালে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির সময় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন বিশেষ কৌঁসুলি আর্চিবাল্ড কক্সকে বরখাস্ত করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু বিচার বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা এতে আপত্তি জানিয়ে একে একে পদত্যাগ করেন। শেষ পর্যন্ত কক্সকে বরখাস্ত করা হয়। ঘটনাটি ঘটেছিল শনিবার রাতে। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার অপব্যবহার বা হঠাৎ ব্যাপক ছাঁটাই বোঝাতে স্যাটারডে নাইট ম্যাসাকার শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হয়।
ইরান নিয়ে যা ঘটেছে এবং ঘটছে, তা আসলে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। বরং এতে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ব্যবস্থার গভীর সংকট ফুটে উঠেছে।
সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রিজেট ব্রিঙ্ক বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন হঠাৎ করে ইউক্রেনের জন্য সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দেয়। এতে শুধু ইউক্রেন নয়, দেশটিতে অবস্থানরত মার্কিন কূটনীতিকেরাও নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়েন।
ব্রিঙ্ক জানান, কেন সহায়তা বন্ধ করা হয়েছে, সে বিষয়ে হোয়াইট হাউস, প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন ও পররাষ্ট্র দপ্তর—কোথাও থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তাঁর ভাষায়, ট্রাম্প প্রশাসনে নীতিনির্ধারণ এতটাই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে যে কর্মকর্তাদের অনেক সময় প্রেসিডেন্টের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দেখে সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত বুঝতে হচ্ছে।
ইউক্রেন নীতিতে ট্রাম্পের অবস্থানের প্রতিবাদ জানিয়ে ব্রিজেট ব্রিঙ্ক শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনে ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনার ও ব্যবসায়ী বন্ধু স্টিভ উইটকফ আন্তর্জাতিক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন।
গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিন যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা জেনেভায় বৈঠক করেন। এতে কুশনার ও উইটকফের পাশাপাশি ইউরোপীয় কর্মকর্তারাও নানা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ছিলেন।
ইউরোপীয় কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেওয়া মার্কিন প্রতিনিধিদলের অনেকের পারমাণবিক প্রযুক্তি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ছিল না। ফলে অনেক মৌলিক বিষয় তাঁদের কাছে ব্যাখ্যা করতে হয়েছে ইউরোপীয় কূটনীতিকদেরই।
অস্ত্র নিয়ন্ত্রণবিষয়ক বিশ্লেষক কেলসি ড্যাভেনপোর্ট বলেন, আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধিদলের প্রযুক্তিগত দুর্বলতা লক্ষ করা গেছে।
পরিবর্তিত পরিস্থিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নতুন কৌশল নিচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া ট্রাম্প প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য প্রতিনিধিদের পাশ কাটিয়ে সরাসরি হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। ট্রাম্পের কাছে বার্তা পৌঁছাতে প্রযুক্তি উদ্যোক্তা মাসায়োশি সনকে ব্যবহার করেছে জাপান।
জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইশিবা শিগেরু রয়টার্সকে বলেন, ট্রাম্পের আশপাশের লোকেরা তাঁর কথার বাইরে যান না। তাই সবাই সরাসরি প্রেসিডেন্টের কাছে পৌঁছাতে চেষ্টা করত। এটাই সবচেয়ে কার্যকর পথ হয়ে উঠেছিল।
ট্রাম্পের আচরণের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্রদেশ এখন প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া দেখানো এড়িয়ে চলছে। ইরানকে নিয়ে তাঁর হুমকির পর যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি একটি কঠোর যৌথ বিবৃতি তৈরি করেছিল। কিন্তু পরে তারা সেটি প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এক ইউরোপীয় কূটনীতিকের ভাষায়, তাঁদের ধারণা ছিল ট্রাম্প প্রায়ই ‘চিৎকার করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কামড় দেন না’। তাই প্রকাশ্যে সমালোচনা করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারত। এই পদ্ধতিকে অনেক ইউরোপীয় কূটনীতিক ‘মেরকেল পদ্ধতি’ বলে উল্লেখ করেন। সাবেক জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেল ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে প্রকাশ্যে উসকানিমূলক বক্তব্যের বদলে নীরবে কূটনৈতিক তৎপরতার কৌশল নিয়েছিলেন। এখন অনেক দেশ সেই পথই অনুসরণ করছে।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category