প্রভাত সংবাদদাতা, দিনাজপুর: দিনাজপুরে ইরি-বোরো ধান কাটার মৌসুমে তীব্র শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, বৃষ্টি ও হারভেস্টার মেশিনের সংকট থাকায় ধান কাটতে হচ্ছে অতিরিক্ত খরচ দিয়ে। এতে ধান কাটায় খরচও বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতায় চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা।
কৃষি দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (১৩ মে) পর্যন্ত জেলায় ২৩ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। বৃষ্টির কারণে ধান কাটাই মাড়াই ব্যাহত হচ্ছে।
কৃষকরা জানিয়েছেন, চলতি মৌসুমে বোরো ধানে পোকার আক্রমণ কম, বৃষ্টির কারণে সেচ কম দিতে হয়েছে। তবে এবার ধানের ওজন কম। আবার অসময়ে বৃষ্টি আর বাতাসের কারণে ধান পড়ে যাওয়ায় ফলন কম হয়েছে। পাশাপাশি ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। যাদের পাওয়া যাচ্ছে তাদের মজুরি বেশি। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ও জমিতে পানি থাকায় হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটাই মাড়াই করাতে দ্বিগুণ খরচ গুনতে হচ্ছে।
এছাড়া শ্রমিক দিয়ে ধান কাটলে বিঘায় একবস্তা ধান বেশি ও খড় শতভাগ পাওয়া যায়। অপরদিকে হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটার কারণে একবস্তা ধান কম পাওয়া যায় ও খড় নষ্ট হয়ে যায় বলেও জানান তারা।
দিনাজপুর সদর উপজেলার সুন্দরবন গ্রামের কৃষক দবিরুল ইসলাম বলেন, এবার ৫ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছি। সংকটের মধ্যে খুব কষ্ট করে শ্রমিক সংগ্রহ করলেও একর প্রতি ১৬ হাজার টাকায় বাধ্য হয়ে ধান কাটতে দেওয়া হয়েছে। না হলে পাকা ধান ঝরে পড়ছে। হারভেস্টারেও একই খরচ।
ফুলবাড়ী উপজেলার জামগ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, গতবার হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধানকাটতে নিয়েছিল একর প্রতি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। এবার তা দিতে হচ্ছে ১৬ হাজার টাকা। কৃষি শ্রমিক ও হারভেস্টারের চরম সংকট দেখা দিয়েছে।
সদর উপজেলার কমলপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, গতবারের চেয়ে এবার শ্রমিক বা হারভেস্টার মেশিন- দুটির জন্যই দ্বিগুণ দাম গুনতে হচ্ছে। তবে শ্রমিক দিয়ে ধান কাটলে বিঘায় একবস্তা (সাড়ে ৭৭ কেজি) ধান বেশি ও খড় শতভাগ পাওয়া যায়। অপরদিকে হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটার কারণে একবস্তা (সাড়ে ৭৭ কেজি) ধান কম পাওয়া যায় ও খড় নষ্ট হয়ে যায় বলে কৃষকেরা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমার এলাকায় ৫টি হারভেস্টার রয়েছে। যার মধ্যে ৩টি হারভেস্টার নষ্ট।
সদর উপজেলার উমরপাইল গ্রামের কৃষক আনিসুর রহমান বলেন, খরচ বেড়েছে। ধানও ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে। তবে এই খরচ বেড়ে যাওয়ায় জমি চুক্তি নিয়ে যারা ধান চাষ করেছেন, তারা লোকসানে পড়েছেন। প্রকৃত জমির মালিকরা লাভবান হচ্ছেন। তাছাড়া যারা ব্রি -৯০জাতের ধান আবাদ করেছেন তারা এবার প্রচুর লাভবান হয়েছে। এবার এই ধানের বাজার দর ভালো। সদর উপজেলার ১০ নম্বর কমলপুর ইউনিয়নে হারভেস্টার মেশিন নিয়ে এসেছেন নাটোরের একতারুল ইসলাম এবং সিলেটের কাশেম আলী। তারা জানান, সরকার নতুন করে ভর্তুকি দিয়ে হারভেস্টার মেশিন দিচ্ছে না। মেশিনগুলো পুরাতন হয়ে যাওয়ায় প্রায় সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এর যন্ত্রাংশ পাওয়া যাচ্ছে না। পাওয়া গেলেও দাম বেশি। তেলের দাম বেড়েছে। মেশিনর সঙ্গে থাকা শ্রমিকের দাম বেশি, আবার পানি থাকায় চালক ছাড়াও একজনের জায়গায় দুইজন শ্রমিক নিতে হচ্ছে। বৃষ্টি হলে বজ্রপাতের ভয়ে জমিতে কেউ হারভেস্টার চালাতে রাজি হয় না। এমন বিভিন্ন কারণে খরচ বেড়েছে।
দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, দিনাজপুরে বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। চলতি মৌসুমে দিনাজপুরে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৮৪০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৭০ হাজার ৫০ টন। এখন পর্যন্ত ২৩ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। তিনি বলেন, দিনাজপুর জেলায় সরকারি ভর্তুকির হারভেস্টার মেশিন রয়েছে ৫৯৪টি। হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শ্রমিক সংকট কিছুটা থাকলেও আমরা কৃষকদের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে বলেছি।