• বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ০১:৪১ পূর্বাহ্ন

নওগাঁর রাণীনগর রক্তদহ বিলের বুকে যেভাবে নাম হলো কোচমড়ি দরগা

Reporter Name / ৫৮ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬

মো. চন্দন, রাণীনগর : নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার রক্তদহ বিলের বিস্তীর্ণ জলরাশির মাঝে জেগে থাকা এক টুকরো পুণ্যভূমি কোচমড়ি দরগা শত শত বছর ধরে এই দরগাহটি বহন করে চলেছে এক অনন্য মানবিক আধ্যাত্মিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ইতিহাস। স্থানীয় লোকমুখে এটি ‘সুলতান সাহেব’বা ‘দয়াল সুলতান-এর বিশ্রামের স্মৃতিবিজড়িত স্থান হিসেবে পরিচিত হলেও এর নামকরণের পেছনে রয়েছে এক নব্য মুসলিম কোচ’ ভক্তের প্রতি ভালোবাসার দারুণ এক উপাখ্যান।
অনেকের ধারণা ছিল এটি হয়তো কোনো পীরের মাজার। তবে মাজারের খাদেম রফিকুল ইসলাম বাবুর দীর্ঘ ২৭ বছরের অভিজ্ঞতা ও তথ্যমতে, এটি আসলে সুলতান সাহেবের এক প্রিয় নব্য মুসলিম ‘কোচ’ ভক্তের মাজার শরীফ।
লোককথা ও ইতিহাস অনুযায়ী বরেন্দ্র অঞ্চলের ইসলাম প্রচারের অন্যতম মহান সাধক ‘সুলতান সাহেব’ (ধারণা করা হয় তিনি হযরত সুলতান শাহ বোরহান উদ্দিন (র) অথবা হযরত শাহ সুলতান বলখী (র:)) নিয়মিত এই পথ দিয়ে যাতায়াত করতেন। যাতায়াতের সময় বিলের মাঝখানের এই উঁচু স্থানটিতে তিনি বিশ্রাম নিতেন।
সে সময় সেখানে এক অমুসলিম ব্যক্তি নিয়মিত কোচ দিয়ে ক্যাঠা বা দুরা (মাছ) শিকার করতেন। সুলতান সাহেব যখন সেখানে বিশ্রাম নিতেন, তখন তাঁর কথাবার্তা আচরণ ও নূরানী ব্যক্তিত্ব ওই কোচের মনে গভীর দাগ কাটে। সুলতান সাহেবের আদর্শে মুগ্ধ হয়ে তিনি নিজের ধর্ম ত্যাগ করে তাঁর হাতে হাত রেখে বায়াত নেন এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি সুলতান সাহেবের সবচেয়ে প্রিয় অনুসারীতে পরিণত হন। তাঁর মৃত্যুর পর বিলের এই উঁচু স্থানেই তাঁকে দাফন করা হয় এবং সেই প্রিয় কোচ ভক্তের নামানুসারেই এই পবিত্র স্থানের নাম হয় কোচমড়ি দরগা।
কোচমড়ি দরগাকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মাঝে রয়েছে গভীর এক আধ্যাত্মিক বিশ্বাস। বিস্তীর্ণ বিলের মাঝখানে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও বর্ষায় বা বন্যার পানিতে এই মাজারটি কখনো ডুবে যেতে দেখেনি কেউ। স্থানীয়দের দাবি বন্যার পানি যতই বৃদ্ধি হয় মাজারটি অলৌকিকভাবে পানির উপর ততই জেগে ওঠে।
নদী ও স্থলপথের সংযোগস্থল রাণীনগর ও আত্রাই অঞ্চলে প্রাচীনকালে সুফি-সাধকেরা যাতায়াতের সময় নদী তীরবর্তী বা বিলের উঁচু স্থানে আস্তানা তৈরি করতেন। কোচমড়ি দরগাটি ঠিক তেমনই এক ঐতিহাসিক বিশ্রামের স্মৃতি বহন করছে।
এই মাজারটির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো এর অসাম্প্রদায়িক চেতনা। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের এক মিলনমেলা এই দরগাহ। শত শত বছর ধরে সব ধর্মের মানুষ এখানে আসেন এবং নিজেদের বিপদে-আপদে কিংবা মনের ইচ্ছা পূরণের আশায় মানত বা মানোসা করেন।
প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এই মাজারে আসেন জিয়ারত করেন এবং সময় কাটান। এছাড়া বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ের মেলার সাথে মিল রেখে প্রতি বছর বৈশাখ মাসের শেষ বৃহস্পতিবার এখানে ২ দিনব্যাপী এক বিশাল মেলা বসে। মেলা ও ওরসকে কেন্দ্র করে এখানে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ঐতিহাসিক এই দরগাহটি কেবল একটি ধর্মীয় স্থানই নয় বরং বরেন্দ্র অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সুফি সাধকদের উদার মানবিকতার এক জীবন্ত দলিল হিসেবে যুগ যুগ ধরে টিকে রয়েছে
স্থানীয় পারইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ জাহিদ হোসেন জানান কোচমড়ি দরগাটি আমার পারইল ইউনিয়নের মধ্যে অবস্থিত। তবে দরগায় যাওয়ার খানকার রাস্তার ব্যাপারে মাননীয় সংসদ সদস্য যদি পদক্ষেপ নিয়ে রাস্তা সংস্কার বা নির্মাণের জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নিতো তাহলে মাজারে যাওয়া আসার জন্য জনদুর্ভোগ থাকত না।
রাণীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ রাকিবুল হাসান জানান রক্তদহ বিলের মাঝে অবস্থিত ঐতিহাসিক কোচমড়ি দরগাটি আমি নিজে পরিদর্শন করেছি। বর্তমানে সেখানে দর্শনার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত ও উন্নত শৌচাগারের (টয়লেট) ব্যবস্থা নেই। বিদ্যমান টয়লেটের বর্জ্য বাইরে ছড়িয়ে পড়ার কারণে চারপাশের পরিবেশ ও বাতাস দূষিত হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেখানে একটি আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার নির্মাণ করে দেব।
দরগার নিরাপত্তা প্রাচীর প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন দরগা শরীফের চারপাশে সীমানা প্রাচীর দেওয়ার ব্যাপারে কথা উঠেছে। আমরা জানতে পেরেছি যে,দরগার দানবাক্স থেকে প্রতি মাসে বেশ ভালো অংকের টাকা জমা হয়। আমার বিশ্বাস সেই অনুদানের টাকা সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে দরগা পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকেই চারদিকে বাউন্ডারি বা সীমানা প্রাচীর দেয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব বলছেন এই কর্মকর্তা।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category